বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

বাবলা গাছ না থাকায় চাকা শিল্পের কারিগররা পেশা ছাড়ছে

পোড়াদহের একটি কারখানায় চাকা তৈরি করছে এক মিস্ত্রী -সংগ্রাম

গরুর গাড়ি এবং তা তৈরির অন্যতম উপাদান চাকা নিয়ে জনপ্রিয় গান, নাটক ইত্যাদি রচিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এক সময় ৬৮ হাজার গ্রাম বাংলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম বাহন ছিল চাকা দিয়ে তৈরি গরুর বা ঘোড়ার গাড়ি। সময়ের বিবর্তনে যান্ত্রিক যুগে সেসব এখন আর চোখে পড়ে না তেমন একটা। তবুও সেই গাড়ি তৈরির অন্যতম উপাদান চাকার কারিগর, মিস্ত্রি বা এ কুটির শিল্পের মানুষেরা ব্রিটিশ আমল থেকে এখনো চাকার ওপরই নির্ভরশীল। চাকা ঘুরলে ঘোরে তাদের ভাগ্যের চাকাও।
কুষ্টিয়া ৬ উপজেলায় রয়েছে চাকা তৈরির শত শত মিস্ত্রি। চাকা তৈরি ও বিক্রির জন্য সারা বাংলাদেশের মধ্যে এ এলাকাটি বিখ্যাত বলে জানান কর্মরত মিস্ত্রিরা। ব্রিটিশ আমল থেকে বংশানুক্রমে এ পেশাটিকেই আঁকড়ে ধরে রয়েছেন তারা। বাজারের চাকা তৈরির মহাজন ও মিস্ত্রিরা জানান, এখানে অনেক পরিবার গরুর গাড়ির চাকা তৈরিতে অত্যান্ত পারদর্শী। তারা বলেন, তার বাপ-দাদার পেশা ছিল চাকা তৈরি। তিনিও এ পেশা ছাড়তে পারেননি।
একদিনে একটা অর্থাৎ মাসে ১৫ জোড়া চাকা তৈরি করা যায়। এক জোড়া চাকা তৈরি করতে কমপক্ষে ২ হাজার  টাকা খরচ হয়। আর বাজারে বিক্রি হয় ৩ হাজার টাকার মত। বাবলা গাছের কাঠই এ চাকা তৈরির একমাত্র উপাদান। কোনো যান্ত্রিক মেশিনে নয়, হাতুড়-বাটাল করাত দিয়ে হাতের কাজের মাধ্যমেই তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন এই চাকা।  বাবলা গাছ ছোট অবস্থাতেই মজবুত ও সারিযুক্ত হয়। দুই আড়াই হাজার টাকায় ছোট সাইজের একটা গাছ থেকে এক জোড়া চাকা তৈরি করা যায়। তবে পাঁচ বা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার একটি বড় বাবলা গাছ থেকে দুই জোড়া চাকা তৈরি করা যায়।পোড়াদহের চাকা তৈরির মিস্ত্রি ইনতাজ আলী জানান, স মিল থেকে বাবলা গাছের কাঠ চেরাই করে একমাস রোদে শুকাতে হয়। এরপর নিজেদের তৈরি ফর্মা বা মেশিনে করাত দিয়ে চিরে কাজ শুরু করা হয়। চাকার মাঝের গোল অংশ (বেলন), ভেতরের লম্বা লাঠি (পাকে) ও মূল কাঠের বৃত্ত (কৈঠা) লাগিয়ে একদিনের মধ্যেই চাকা সেট হয়ে যায়। এর পর ফিনিশিং করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। একজন মিস্ত্রিকে দিনে ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এক জোড়া চাকা ৭ থেকে ১০ বছর গাড়িতে চলার জন্য উপযুক্ত থাকে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মিরপুরে এসে চাকা নিয়ে যান। বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে কৃষকরা চাকার জন্য এখানে ছুটে আসেন।
মিস্ত্রি ও মহাজনরা জানান, চাকা তৈরির বাবলা গাছ এক সময় ছিল সহজলভ্য। কিন্তু এখন আর সারিবদ্ধভাবে মেঠো রাস্তা, ক্যানেলের ধারে বা আশপাশে তা আর দেখতে পাওয়া যায় না। চাকা তৈরির কাজ বারো মাস ধরেই চলে। গরু, মহিষ বা ঘোড়ার গাড়ির জন্য এ চাকা ব্যবহৃত হলেও ঘোড়ার গাড়ি প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রামাঞ্চলে কাদাযুক্ত মেঠো রাস্তা ও মাঠ থেকে ফসল আনা নেয়ার জন্য এখনো গরু ও মহিষের গাড়ি ব্যবহৃত হয়। চাকা তৈরিতে ব্যস্ত কুটির শিল্পের কারিগররাও জানান, অনেক সময় পুঁজির অভাবে বেশি মূল্যে বাকিতে গাছ কিনতে হয়। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা, ব্যাংক ঋণ ইত্যাদির সুবিধা পেলে চাষাবাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এ চাকা শিল্প তথা গরু ও মহিষের গাড়ি টিকে থাকবে, ভাগ্যের চাকা ঘুরবে এ শিল্পের শত শত কারিগর বা পেশার সঙ্গে জড়িতদের এমনটি জানান সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ