শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

খুলনার সরকারি বিএল কলেজ

আব্দুর রাজ্জাক রানা : খুলনা মহানগরীর দৌলতপুরে অবস্থিত সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজ। বিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৩ হাজারের বেশি। এর মধ্যে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ৫৭৭ জনের। সে হিসাবে ২ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্যও আবাসন সুবিধা নেই শতবর্ষী এ কলেজে, যদিও প্রতিষ্ঠাকালে সব শিক্ষার্থীর জন্যই আবাসন সুবিধা ছিল এ বিদ্যাপীঠে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি বিএল কলেজে ছাত্রদের পাঁচটি ও ছাত্রীদের জন্য দু’টি হোস্টেল আছে। ছাত্রদের পাঁচটি হোস্টেলে আসন রয়েছে ৩৮৯টি। এর মধ্যে সুবোধ চন্দ্র ছাত্রাবাসে ৬৮, হাজী মুহম্মদ মুহসীন ছাত্রাবাসে ৯৭, শহীদ তিতুমীর ছাত্রাবাসে ১২৬, ড. জোহা ছাত্রাবাসে ৫০ ও কাজী নজরুল ইসলাম ছাত্রাবাসে ৪৮টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রীদের দু’টি ছাত্রীনিবাসে আসন আছে মাত্র ১৮৮টি। এর মধ্যে মন্নুজান ছাত্রীনিবাসে ৮০ ও খালেদা জিয়া ছাত্রীনিবাসে ১০৮ জনের আবাসন সুবিধা আছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এ কলেজে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা যেমন অপ্রতুল, তেমনি যেটুকু আছে, তাও মানসম্মত নয়। হোস্টেলের পুরনো ভবনগুলো এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ। খসে পড়েছে পলেস্তারা। নোংরা পরিবেশ, ছাদ দিয়ে পানি পড়া আর পানীয়জলের অভাবসহ রয়েছে নানা সমস্যা। সরেজমিন সুবোধ চন্দ্র ছাত্রাবাসে গিয়ে দেখা যায়, বহু পুরনো ভবনটির পরিবেশ খুবই অস্বাস্থ্যকর। ভেঙে গেছে জানালা-দরজা। বাথরুমের অবস্থাও খুব নাজুক। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৃষ্টি হলে ছাত্রাবাসের টিনের ছিদ্র চাল দিয়ে পানি পড়ে বই, খাতা, বিছানাপত্র ভিজে যায়। আর ভবনের সামনের অংশটা বৃষ্টির পানি জমে হয় মশার প্রজননক্ষেত্র। ছাত্রাবাসের পুরনো চৌকি, চেয়ার ও টেবিলে ঘুণ ধরেছে অনেক আগে, অনেকগুলো আবার ভাঙা। আর ভবনের দেয়ালের বাইরের অংশে জন্মেছে বিভিন্ন আগাছা। খালেদা জিয়া ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থী উম্মে সালমা জানান, কক্ষগুলো খুবই ছোট, তার পরও একই কক্ষে তিন-চারজন করে থাকতে হয়। এতে করে অনেক সময় পড়ার পরিবেশ থাকে না। এছাড়া রয়েছে সুপেয় পানির অভাব। এদিকে ছাত্রাবাসে আসন সংকটের ফলে দূর থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকতে হয় মেস, আত্মীয়র বাসা কিংবা লজিং মাস্টার হয়ে। 

খুলনার দৌলতপুরে ভৈরব নদের তীরে ১৯০২ সালে হিন্দু একাডেমি নামে যাত্রা করা এ বিদ্যাপীঠের ১৯৪৪ সালে নামকরণ হয় ব্রজলাল হিন্দু একাডেমি। ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই এটি সরকারি কলেজে পরিণত হয়। ১৯৯৩ সালে এটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা হয়। কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়াও ২১টি বিষয়ে স্নাতক ও ১৬টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৩ হাজার পেরোলেও সে অনুপাতে শিক্ষক নেই বিএল কলেজে। 

কলেজ সূত্রে জানা যায়, বিএল কলেজে ১৯৮৪ সালে সর্বশেষ জনবল কাঠামো তৈরি হয়েছিল। সেখানে শিক্ষকদের পদ রয়েছে ১৯৮টি। এনাম কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী মাস্টার্স কোর্স চালু থাকা প্রতিটি বিষয়ের জন্য ১২ জন শিক্ষক থাকার কথা। সে হিসাবে বিএল কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা হওয়া উচিত ২৬৪ জন। কিন্তু অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কলেজটিতে শিক্ষকের পদ রয়েছে ১৯৮টি। এর মধ্যে ১৮টিই শূন্য। সে হিসাবে শতবর্ষী কলেজটিতে প্রতি ১৮৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক আছেন। স্বল্প সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে কলেজে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর কোর্স ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে শ্রেণীকক্ষ সংকটও প্রকট। ২২টি বিভাগের জন্য পাঁচটি একাডেমিক ভবনে শ্রেণীকক্ষ রয়েছে ৮১টি। 

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, শ্রেণীকক্ষ সংকটে আমাদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষা চলাকালে ক্লাসের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে গেলেও মাঝে মধ্যে ক্লাস না করেই ফিরে আসতে হয়। কলেজটিতে রয়েছে পরিবহন সংকটও। বাস রয়েছে মাত্র চারটি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে যাতায়াতে শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দু’টো বাস কেনার অনুমোদন থাকলেও তা এখনো কেনা হয়নি।

বিভিন্ন সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বিএল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সৈয়দ সাদিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, হোস্টেলগুলো বহু পুরনো। কয়েকটি ভবন বসবাসের অনুপযোগী। তবে নতুন হোস্টেল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ‘ডেভেলপমেন্ট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজেস’ প্রকল্পের আওতায় বিএল কলেজে চারটি একাডেমিক ভবন ও ১০০ আসনবিশিষ্ট একটি ছাত্রী হল নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি আরো বলেন, শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতার কারণে তাদের প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ক্যাম্পাসে অনেক জায়গা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। কলেজে শিক্ষার্থী ও বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও ভবন বাড়েনি। শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেও সুফল মিলছে না।

শতবর্ষী সরকারি বিএল কলেজে খুলনার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক এ কলেজে পড়েছেন অনেক গুণীজন। 

তাদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফায়েক উজ্জামান, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, রাজনীতিবিদ জহির উদ্দিন স্বপন, আসাদুজ্জামান রিপন, আব্দুল মজিদ, আসাদুজ্জামান মিয়া, হাফিজুর রহমান, অধ্যক্ষ জাফর ইমাম, সৈয়দ দিদার বখত, কাজী জাফর আহমেদ, রুমি রিজভি করিম, সাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিন, শেখ দিদারুল আলম, রফিকুল ইসলাম দুলাল, অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, শেখ ইউসুফ হারুন, শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন, মো. মহাসিন, আনিস উদ্দিন মঞ্জুর, আশরাফুল মকবুলসহ অনেকে। মুনীর চৌধুরীসহ অনেক খ্যাতিমান মানুষ এ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ