রবিবার ২৬ জুন ২০২২
Online Edition

উৎসবমুখর নয়াপল্টন রণক্ষেত্র

# বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ টিয়ারসেল গুলী ॥ আহত ৭০
# পুলিশের গাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে হেলমেটধারীরা
স্টাফ রিপোর্টার: তৃতীয় দিনও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার আমেজে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনছিলেন ধানের শীষ প্রতীক প্রত্যাশীরা। সময় প্রায় দুপুর ১টা। সব কিছু ঠিক-ঠাকই চলছিল। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত। নেতাকর্মীদের হাতে শোভা পাচ্ছিল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন এবং ধানের ছড়া। কিন্তু হঠাৎ করেই দৃশ্যপট পরির্বতন হতে শুরু করে। বিএনপি অফিসের সামনে সড়কে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের সরাতে যায় পুলিশ। সরতে না চাইলে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের গাড়ি নেতাকর্মীদের দিকে ধেয়ে আসে। এতে বাধা দেয় নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরাও পুলিশকে ধাওয়া দেয়। শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। থেমে থেমে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলে এই সংঘর্ষ। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। হঠাৎ করেই মুহুর্মুহু গুলীর আওয়াজে মুহূর্তেই পুরো নয়া পল্টনে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। এদিক-সেদিক ছুটতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। ঠিক এই অবস্থায় রাস্তায় শুয়ে-বসে হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে বিএনপি কর্মীরা। যা প্রমাণ করে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষায় তারা কতটা নিবেদিত। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলাকালে কে বা কারা পুলিশের দুটি গাড়িতে আগুন দেয়। বেশ কিছু মোটরসাইকেলও ভাংচুর করা হয়। বিএনপি জানায়, পুলিশের গাড়িতে আগুন ও তাদের ওপর হামলাকারীরা সরকারি দলেরই এজেন্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো অপু গুলশান থানা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক। অন্যরা হেলমেট পরিহিত থাকায় তাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পুলিশের হামলা ও গুলীবর্ষণে বিএনপির অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুলীবিদ্ধ বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়ছে বলেও তিনি জানান। পুলিশ জানায়, বিএনপি কর্মীদের হামলায় তাদের ১৫ পুলিশ আহত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর একটার দিকে সংঘর্ষ শুরু হলে একপর্যায়ে পুলিশ নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে সরে গিয়ে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে, বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নেন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে স্কাউট ভবন পর্যন্ত মিছিল করেন। সংঘর্ষের পর তিন ঘন্টা মনোনয়ন ফরম কেনা ও জমা দেয়া বন্ধ থাকে।
গত সোম ও মঙ্গলবার এই দুইদিন উৎসাহের আমেজ নিয়েই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মাঝে ফরম বিক্রি করে দলটি। গতকাল তৃতীয় দিনেও কিনতে এসেছিল দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। কিন্তু হঠাৎ করেই উৎসবে যোগ হয় গুলীর আওয়াজ। মুহূর্তেই পুরো নয়া পল্টনে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। তবে এতে বিএনপি নেতাকর্মীরা ভয়ে পালিয়ে যায়নি। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে শরীরের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা। বলেছে আমরা সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাতে এখানে আসিনি।
এই ঘটনাকে চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অভিযোগ করেন, এই সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। মির্জা ফখরুল বলেন, এটা একটি চক্রান্ত। আমরা নির্বাচন করতে যাচ্ছি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে নমিনেশন নেয়ার জন্য তাদের লোকজন ভিড় করেছে, তখন কিছু করেনি। উস্কানি দিয়ে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, কালকে (মঙ্গলবার) হঠাৎ করে চিঠি দিল। এই চিঠি দিয়ে আজকে পুলিশের অ্যাকশন। প্রভোকেশন (উস্কানি) করে নির্বাচনকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ভিড় ছিল। পুলিশ রাস্তায় তাদের দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। বেলা পৌনে একটার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বড় একটি মিছিল নিয়ে ঢাকা-৮ আসনের জন্য মনোনয়ন ফরম কিনতে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আসেন। এ সময় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী আরও কয়েকটি মিছিল দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়। তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় কার্যালয়ের সামনে থেকে তার মিছিল সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। তবে কর্মীসমর্থকেরা সরে না যাওয়ায় একপর্যায়ে পুলিশের গাড়ি মিছিলের ওপর উঠে যায়।
মহিলা দলের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক আহত মুকুল আক্তার কনা বলেন, আমরা কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিনা উস্কানিতে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে পুলিশ।
পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলে দুপুর ২টায় বিএনপি অফিসের নিচে দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, বিনা উস্কানিতে সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী অতর্কিতভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আপনারা মৌচাকে ঢিল মেরেছেন কেন? পুলিশ বাহিনীর কাছে এমন প্রশ্ন রেখে রিজভী বলেন, আপনারা ভেবেছেন আমাদের শান্তিপূর্ণ এই মনোনয়ন ফরম বিক্রি করার সময় হামলা চালিয়ে আমাদের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করবেন, সেটি আর হবে না। কোনো রক্ত চক্ষুকে শহীদ জিয়ার সৈনিকেরা ভয় করে না। আপনারা মনে করেছেন যে, আপনাদের গুলীর ভয়ে জাতীয়বাদী শক্তি মাটির নিচে ঢুকে যাবে। ঢুকে যাবে না। প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে মাটির ভেতর থেকে লাখ লাখ জাতীয়তাবাদী শক্তি বেরুবে। আপনি লাঠিচার্জ করে, টিয়ারগ্যাস মেরে দমন করতে পারবেন না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানাবো আপনারা কারো অন্যায় নির্দেশে কাজ করবেন না। আপনারা এদেশের সন্তান, আমাদেরই আত্মীয়-স্বজন আপনারা। কারো স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এমন কোনো কাজ করবেন না যেটা শান্তি বিঘিœত হয়, গণতন্ত্রের বিপক্ষে যায়।
রিজভী নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সরকারের নির্দেশেই আমাদের নেতাকর্মীদের রক্তাক্ত করেছে লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী। তিনি বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের গুলী করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন গুলীবিদ্ধ। এ সময় তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্দেশে নেতাকর্মীদেরকে ফুটপাতে শান্তিপূর্ণ অবস্থান করার আহ্বান জানান। রিজভী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের আমি অনুরোধ করবো, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে ফুটপাতে অবস্থান গ্রহণ করুন। রাস্তায় গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দিন। আমি মনে করি, এই আক্রমণ সরকারের নির্দেশেই হয়েছে, সরকার প্রধানের নির্দেশে হয়েছে। এই আক্রমণের বিনিময়ে আমরা শান্তি নষ্ট করবো না। আমি বিনা উস্কানিতে পুলিশের এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি, ধিক্কার জানাচ্ছি।
তবে বিনা উস্কানিতে পুলিশের ওপর বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে জানিয়েছেন মতিঝিল বিভাগের ডিসি আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, পুলিশ শুধু তাদের রাস্তা থেকে সরে যেতে বলেছে যেন যান চলাচল স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু তারা এ কথা না শুনে হঠাৎ করে বিনা উস্কানিতে পুলিশের ওপর হামলা করে। পরে তারা আমাদের দুটা গাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আমাদের কয়েকজন সদস্যও এ ঘটনায় আহত হয়। আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, এখন পর্যন্ত পুলিশ ধৈর্য্য সহকারে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় কাউকেই এখন পর্যন্ত আটক করা হয়নি। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
পল্টন থানার ওসি মাহমুদ হোসেন জানান, নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনের সড়কে নেতাকর্মীরা বিশৃঙ্খলভাবে অবস্থান করছিল। পুলিশ তাদের সুশৃঙ্খলভাবে থাকতে অনুরোধ করে। কিন্তু বিনা উসকানিতে তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
বিএনপি কর্মীরা নির্বাচন সামনে রেখে ‘ইস্যু তৈরির লক্ষ্যে’ বিনা উসকানিতে নয়া পল্টনে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এক ঘণ্টার বেশি সময় পুলিশের সঙ্গে দলটির কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর কাউন্টার টেররিজমের প্রধান মনিরুলের এ মন্তব্য আসে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসিসহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা তা মানেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দুজন রাজনৈতিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী পার্টি অফিসের সামনে আসে। এ সময় রাস্তা বন্ধ হয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের দুটি সেডান গাড়ি ও একটি ভ্যানে বিএনপিকর্মীরা হামলা করে এবং পরে দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানান তিনি। বিএনপি নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার অনুরোধ জানিয়ে মনিরুল বলেন, পুলিশ রাষ্ট্রের কর্মচারী। পুলিশকে প্রতিপক্ষ ভাববেন না।
যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গিয়াস উদ্দিন মামুন দাবি করেন, মিজানুর রহমান ও ফিরোজা বেগম নামে এক নারী বন্দুকের গুলীর ছররার আঘাতে রক্তাক্ত হন। এছাড়া আরও ১৫ নেতাকর্মী আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, পুলিশের গুলীতে আহতরা হলেন, পিরোজপুরের নেছারাবাদের মো. শামসুল হক, রাজধানীর মুগদার মেহেদি হাসান মিরাজ, অরিন, পল্টনের মো. কাদির, হৃদয় শেখ, মতিঝিলের মকবুল হোসেন, সবুজবাগের মনির হোসেন, খিলগাঁওয়ের মোস্তাক, কলাবাগানের সুমন, বিমানবন্দর থানা এলাকার মহিউদ্দিন রতন, মাদারীপুরের সাখাওয়াত হোসেন এবং পিরোজপুরের আসাদুজ্জামান। তাদের গলা, মাথা ও পিঠে গুলীর আঘাত লেগেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি-না তা নিয়ে শুরু থেকে নানা মত ছিল। এর মধ্যে ১১ নবেম্বর রোববার ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেয়। একইদিন বিকেলে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনে যাবে বলে জানায়। এর পরদিন মনোনয়ন ফরমও বিক্রি শুরু করে বিএনপি। মনোনয়ন ফরম বিক্রির শুরুর দিন থেকেই বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময় শোডাউন করা নির্বাচনী আচরণ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে এমনটি না করতে সতর্ক করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির আদেশে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা জমা দেয়ার সময় মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনসহকারে মিছিল ও শোডাউন করা হচ্ছে, যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী আচরণ বিধিমালা ২০০৮-এর ৮ নম্বর বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইসির এ আদেশ আসার পরদিনই পুলিশ বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর হামলা চালায়। যদিও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনা ও জমা দেয়ার সময় হাজার হাজার নেতাকর্মী রাস্তা অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করেছে। তখন নির্বাচন কমিশন তাদের কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। এমনকি পুলিশও রাস্তা বন্ধ করে মিছিল বা শোডাউনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এদিকে গতকাল বিকেলে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী বলেছেন, আজকের (বুধবার) এই হামলার জন্য সিইসি এবং ইসি সচিবরাই দায়ী। তাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা পরিকল্পিত। এছাড়া পুলিশের কতিপয় সদস্য এ হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল বলেও দাবি করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা এ নেতা। তিনি জানান, আজকের এই হামলার ঘটনায় পুলিশের গুলীতে বিএনপির ৫০ নেতাকর্মী আহত এবং গুলীবিদ্ধ হয়েছেন। রিজভী আরও জানান, বুধবার বিকাল চারটা পর্যন্ত ফরম বিক্রি হয়েছে ২৭৭টি। জমা হয়েছে ৩৩৭টি। দুপুরে তিন ঘণ্টা ফরম বিক্রি বন্ধ ছিল।
পুলিশের গাড়িতে আগুনের বিষয়ে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। আমি আপনাদের সামনে সেই পুরনো ঘটনার কথা বলতে চাই। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলন আপনারা দেখেছেন। ওই আন্দোলন দমন করতে যায় হেলমেটধারীরা। আজকেও তাদের এখানকার তৎপরতা। এই হেলমেটধারীরা কারা? এটা আপনাদেরকে আমি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেই এরাই হচ্ছে এজেন্ট প্রভোগেটিয়ার। এই এজেন্টদেরকে দিয়ে সেই ব্লেইম গেইম নিজেরা পুড়িয়ে আগুন লাগিয়ে বিরোধী দলের ওপর চাপানো। যেভাবে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত আন্দোলনের সময়ে করেছে।
তিনি বলেন, দেশবাসী দেখেছেন চার-পাঁচ দিন আওয়ামী লীগের অফিসের পাশে- পাশের রাস্তা-ঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন সংঘর্ষ লেগে থেকেছে। এটির জের হিসেবে আদাবরে দুইজন মারাও গেছে। এক্ষেত্রে সিইসি ও কমিশনারগণ কোনো বিধি-নিষেধ জারি করলেন না, আইজিকে বললেন না, এসব নির্বাচন বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। কিন্তু নয়া পল্টনে গতকাল নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি দেখে ওদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে- এটা কী কা-, নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতেই এই অবস্থা। তাই সরকারের প্রতিভু হয়ে সিইসির নেতৃত্বে কমিশনের কিছু ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারাই আজকে দায়ী বিএনপির নেতা-কর্মীদের রক্তাক্ত করা, আজকে সহিংস ঘটনার জন্য তারা দায়ী। এই ঘটনায় ৫০ জনের অধিক নেতা-কর্মী গুলীবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন দাবি করেছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব।
তিনি বলেন, পুলিশ সকাল থেকে নানাভাবে আমাদের নেতা-কর্মীদের বাধা দিচ্ছিল, হেনস্তা করছিলো। তখনই মনে হচ্ছিল যে, পুলিশের কোনো একটা অশুভ উদ্দেশ্য আছে আজকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জমায়েতের ওপর। এর আলামত গতকাল নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে আমরা আশঙ্কা করেছিলাম। তারই আজকে প্রতিফলন দেখা গেলো।
নয়া পল্টনের ঘটনা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রিজভী বলেন, নির্বাচন বানচালের জন্য আমরা নই, গণবিচ্ছিন্ন সরকারই বিনাভোটে অথবা ভোটবিহীন নির্বাচন করার ষড়যন্ত্র করছে। এটা ওবায়দুল কাদেরদের চক্রান্ত এতো নির্যাতন করলাম তার পরেও কেনো এতো লোক এখানে আসছে। তারাই নির্বাচন বানচাল করতে চায় কারণ তারা গণবিচ্ছিন্ন।
 ঐক্যফ্রন্টের প্রতিবাদ: বিএনপির কার্যালয়ে মনোনয়ন ফরম তোলার প্রত্যাশী শান্তিপূর্ণ সমর্থকদের উপর উস্কানিমূলকভাবে পুলিশী হামলা, বেপরোয়া লাঠিচার্জ- টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। তারা অভিযোগ করে বলেন, এ হামলা নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা। গতকাল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সমন্বয় কমিটির সভায় এসব কথা বলেন নেতৃবৃন্দ। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অস্থায়ী কার্যালয়, ইডেন কমপ্লেক্স, ২/১-এ, আরামবাগ, মতিঝিলে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কারী বরকতউল্লাহ বুলু। সভায় উপস্থিত ছিলেন আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, জগলুল হায়দার আফ্রিক, আ.ও.ম শফিক উল্লাহ, মোশতাক আহমেদ, মমিনুল ইসলাম, শহীদউদ্দিন মাহমুদ স্বপন, শাহ মোঃ বাদল, মোঃ নূরুল হুদা মিলু চৌধুরী, হাবিবুর রহমান, গোলাম মাওলা চৌধুরী। এদিকে অপর এক প্রস্তাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দফতর ও প্রচার কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ