বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিদেশিদের আগ্রাসন এবং জাতীয় পুঁজি ও শিল্পের সর্বনাশ

আশিকুল হামিদ : খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। রাজধানী ঢাকার যানজট প্রসঙ্গে প্রথমবারের মতো গবেষণাভিত্তিক কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল বিশ্বব্যাংক। রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা : এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত ওই গবেষণা রিপোর্টে বিশ্বব্যাংকের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, তীব্র যানজটের কারণে বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষের ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর অর্থের দিক থেকে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৪ কোটি টাকা।
ওই রিপোর্টে বিশ্বব্যাংক আরো জানিয়েছিল, যানজটের ফলে রাজধানী ঢাকায় গাড়ির গতি অনেক কমে গেছে। ১০ বছর আগেও ঢাকায় একটি যানবাহন ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো। এখন সে একই যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ছয় দশমিক দুই কিলোমিটারে এসে নেমেছে। অথচ একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে পারে। সেদিক থেকে যানবাহনের গতি মানুষের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছে। এটাই অবশ্য শেষ কথা নয়। কারণ, বিশ্বব্যাংকের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, অবস্থায় পরিবর্তন না ঘটানো গেলে ২০২৫ সালে যানবাহনের গতি আরো কমে ঘণ্টায় মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। তখন মানুষ হেঁটেই যে কোনো যানবাহনের চাইতে কম সময়ে বেশি দূরে যাতায়াত করতে পারবে।
হঠাৎ রাজধানীর যানজটের প্রসঙ্গ টেনে আনার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। একটি কারণ তো প্রতিদিনের প্রচ- যানজট। যারা ঢাকায় থাকেন এবং কাজের জন্য ঢাকায় যাতায়াত করেন, তাদের নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না। কোনো কোনো দিনের যানজটের দাপটে কতজনকে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হয় এবং অনেক রাত পর্যন্ত রাস্তায় কাটিয়ে দিতে হয় তার হিসাব কোনো দিনই জানা যাবে না।
এটাই অবশ্য যানজটের প্রসঙ্গ টেনে আনার একমাত্র কারণ নয়। আসল কারণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে গুরুতরও বটে। পাঠকদের সকলের বাসাবাড়িতেও নিশ্চয়ই আত্মীয়-স্বজনরা যাতায়াত করেন। খোঁজ নিলে দেখবেন, কেউই খুব দরকার ছাড়া আপনার বা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত করেন না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। ক’দিন আগে এক স্বজন এসে বললেন, এলিফ্যান্ট রোডে তিনি এসেছেন ‘সুদূর’ উত্তরা এলাকা থেকে। ‘সুদূর’ শব্দটা আমার সে নিকটজনই ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, উত্তরা থেকে ঢাকার যে কোনো এলাকার মার্কেট বা শপিং মলে বা কারো বাসাবাড়িতে যাতায়াত করার অর্থই হলো কয়েক ঘণ্টা সময়ের এবং বিপুল পরিমাণ টাকার অপচয় করা। এজন্যই কোনো কিছু কেনাকাটার দরকার পড়লেই তিনি ভারতের কলকাতায় চলে যান। কারণ, উত্তরা থেকে বিমান বন্দর হাঁটার দূরত্বে অবস্থিত। আর কোনোভাবে বিমান বন্দরে পৌঁছানো গেলেই এক ঘণ্টারও কম সময়ে কলকাতায় যাওয়া যায়। বাড়তি ব্যয় শুধু বিমান ভাড়া এবং কলকাতায় থাকা ও খাওয়ার খরচ।
কিন্তু ঢাকার দামের সঙ্গে কলকাতার দামের বিরাট পার্থক্য যোগ-বিয়োগ করলে দেখা যায়, কলকাতায় গিয়ে আসলে লাভই হয় বেশি। আমার ওই নিকটজনের যুক্তি, ভারতীয় ব্র্যান্ডের পণ্যই যদি কিনতে হয় তাহলে আর বেশি দাম দিয়ে ঢাকায় বা দেশের অন্য কোনো স্থানের মার্কেটে গিয়ে কেনা কেন, ভারতে গিয়ে কেনাটাই ভালো এবং লাভজনক। মাঝখান দিয়ে বিদেশ সফরের বাড়তি আনন্দটুকুও পাওয়া যায়। হোক না সেটা কলকাতা, অন্য দেশ ভারতেরই বড় একটা নগরী তো সেটা!
অন্য কিছু যুক্তিও দেখিয়েছেন আমার ওই নিকটজন। বলেছেন, ঢাকাসহ বাংলাদেশের সকল মার্কেটও ভারতের পণ্যসামগ্রীতেই ছেয়ে গেছে। সুতির শাড়ি ধরনের দু’-চারটি মাত্র পণ্য ছাড়া কোনো মার্কেটে বাংলাদেশি কোনো পণ্য পাওয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, কলকাতায় ঢাকা ও বাংলাদেশের যে কোনো মার্কেটের তুলনায় দামও অনেক কম। পাশাপাশি রয়েছে বৈচিত্র্য ও তুলনামূলক মান যাচাই করতে পারার সুযোগ। সেখানে কয়েকটি দোকানে একই পণ্য কয়েকবার পর্যন্ত নাড়াচাড়া করলেও ঢাকার ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মতো অসভ্য আচরণের সম্মুখীন হতে হয় না। তারা বরং ‘আরো কিছু দেখুন দাদা’ বলে ‘বিগলিত ব্যানার্জির’ মতো সাধাসাধি করে। এসব কারণেই ঢাকায় সময় ও অর্থের অপচয় করার পরিবর্তে অমার নিকটজন তার স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। ক’দিন আগেও গিয়েছিলেন। তাছাড়া কলকাতা তথা ভারত থেকে ভারতীয় ব্র্যা-ের স্টিকার লাগানো কোনো পণ্য কাউকে উপহার দেয়ার মধ্যেও রয়েছে আনন্দের বিশেষ উপাদান। যাদের দেয়া হয়, তাদের চেহারাও নাকি আনন্দে ঝলমল করে ওঠে!
বিষয়টি খুব উৎকটভাবে সামনে এসে যায় বিশেষ করে রমযান মাসে, ঈদের প্রাক্কালে। বাস্তবে প্রতিবারই ঈদের সময় হাজারের অংকে নয়, লাখের অংকে বাংলাদেশিরা ঈদের কেনাকাটা করতে ভারতের বিভিন্নস্থানে, বিশেষ করে কলকাতায় চলে যায়। গত ঈদেও ব্যতিক্রম হয়নি। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, কলকাতাসহ ভারতের মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে ভিড় জমেছিল লাখ লাখ বাংলাদেশি ক্রেতার। সেখানে ঈদের বাজার জমিয়েই তুলেছিল বাংলাদেশিরা। গণমাধ্যমের রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশিদের কলকাতা তথা ভারতে যাতায়াতের বিষয়টিকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও নানামুখী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২৪টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসায় প্রবেশ ও প্রস্থানে নিষেধাজ্ঞা অপসারণ করেছিল ভারত। দেশটির ভিসাপ্রাপ্তি সহজতর করার লক্ষ্যে ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি বড় শহরে ভিসা সেন্টার খোলা হয়েছে। রাজধানীতেও কয়েকটি ভিসা সেন্টার খুলেছে ভারত। এর ফলে ভারতের ভিসা পাওয়া আজকাল সময়ের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থার সুযোগও নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ।
ওদিকে বিশেষ করে কলকাতার মুসলিম প্রধান বিভিন্ন এলাকায় পুরনোগুলোর পাশাপাশি নতুন এবং অস্থায়ী অনেক মার্কেট ও শপিং মল গড়ে তোলা হয়েছে। এরই পাশাপাশি ভারতের বিখ্যাত ব্র্যা-গুলোর পক্ষ থেকে গত ঈদের সময় বন্ড ধরনের পণ্যের ওপর বিশেষ মূল্য ছাড়ও দেয়া হয়েছিল। এসব বিষয়ে নানা কৌশলে প্রচারণা চালিয়েছে ভারতীয়রা। জানা গেছে, সহজে ভিসাপ্রাপ্তির পাশাপাশি এই প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে রমযান মাসের শুরুতেই দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতের ভিসা নিয়েছিল। এর বাইরে ঈদের আগে পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভিসা গ্রহণকারীদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদরা কিন্তু এভাবে লাখের অংকে ঈদের কেনাকাটা করতে যাওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত আশংকাজনক মনে করেন। কারণ, এর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি জড়িত রয়েছে প্রত্যক্ষভাবে। ঈদের কেনাকাটার জন্য লাখ লাখ বাংলাদেশির ভারতে যাওয়ার অর্থই হলো, এই বিরাট সংখ্যক বাংলাদেশি বাংলাদেশের পণ্য কিনবে না। তারা কিনবে, বাস্তবে কিনেছেও, ভারতীয় পণ্য। টাকার পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনেছে বাংলাদেশিরা। সে কারণে একদিকে বাংলাদেশি পণ্যের বিক্রি হাজার হাজার কোটি টাকা কমেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই ভারতে চলে গেছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
উদ্বেগ ও আপত্তির কারণ হলো, এমন অবস্থা চলছে বহু বছর ধরে- প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই। ভারতীয় পণ্যে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশের সমগ্র পণ্যের বাজার। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই ভারতীয় পণ্যের এই আগ্রাসন ও একচেটিয়া রাজত্বের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কথা শুধু ভারতীয় পণ্য সম্পর্কে বলা হচ্ছে না। ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুনমিঙসহ চীনের বিভিন্ন শহরেও ঈদের কেনাকাটা করতে যাচ্ছে অনেক বাংলাদেশি। তাছাড়া, বাংলাদেশের খুব কম মার্কেটেই আজকাল বাংলাদেশি পণ্য দেখা যায়। ভারতীয় তো বটেই, বিশেষ করে চীনা পণ্যেও ছেয়ে গেছে দেশের বাজার। আছে অন্য অনেক দেশেরও বাহারী অনেক পণ্য। অথচ বিশ্বব্যাপি অর্থনীতির স্বীকৃত সাধারণ নিয়ম হলো, দেশিয় তথা জাতীয় পুঁজির বিকাশকে বাধামুক্ত করার জন্য সব দেশকেই তার শিল্প-কারখানার জন্য নিরাপত্তা তথা প্রটেকশনের ব্যবস্থা নিতে হয়। ভারতসহ সব দেশ অমন ব্যবস্থা নিয়েও থাকে, যাতে অন্য কোনো দেশের পণ্যের কারণে ওই দেশের পণ্যের বিক্রি কমে না যায়। যাতে সেদেশের পণ্য অন্য দেশের পণ্যের কাছে মার না খায়।
এক্ষেত্রেই বাংলাদেশে চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড-। চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য বাজার দখল করে নেয়ায় দেশি পণ্যের বিক্রি তো প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছেই, উৎপাদনের কারখানাগুলোও একের পর এক বন্ধ ও ধ্বংস হয়ে গেছে। একই কারণে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন লাখ লাখ বাংলাদেশি এমনকি ঈদের কেনাকাটা করতেও ভারতে এবং আশপাশের অন্য দেশগুলোতে ছুটে যাচ্ছে।
চীন ও ভারত কিন্তু আরো অনেক পন্থায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গার্মেন্ট শিল্পের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ বিরোধী সুচিন্তিত প্রচারণার মাধ্যমে ভারত শুধু ক্রেতা দেশগুলোকে বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত করার তৎপরতাই চালাচ্ছে না, দেশটি বাংলাদেশের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। গার্মেন্ট শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রে ও বিষয়ে চলছে ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের কর্মকাণ্ড।
বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের তাৎপর্যপূর্ণ উদাসিনতার পরিণতিতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প। গার্মেন্ট ব্যবসার লাভের অংশ হুন্ডি ও ভুয়া এলসির মাধ্যমে টাকাকে রুপি ও মার্কিন ডলারে পরিণত করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারতীয়রা নিজেদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার হারাচ্ছে হাজার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। গার্মেন্ট মালিকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিজিএমইএ’র এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ বায়িং হাউজের মালিকানাই চলে গেছে ভারতীয়দের দখলে। আর এটাই বাংলাদেশের গার্মেন্টের জন্য প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয়দের কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প বর্তমানে চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
অন্য কিছু কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে বর্তমানে অন্তত ২৫ হাজার ভারতীয় নিয়োজিত রয়েছে। এদের সবার আইনসম্মত ওয়ার্ক পারমিট নেই। অর্থাৎ তারা চাকরি করছে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায়। নিজেদের বেতনের টাকাও তারা --ির মতো অবৈধ পন্থায়ই দেশে পাঠাচ্ছে।
ভারতীয়দের গ্রুপিং তথা ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা- রয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ে। দেখা গেছে, ছোট বা বড় যে অবস্থানেই তারা নিয়োজিত থাকুক না কেন, প্রতিটি কারখানায় ভারতীয়রা গোপনে গ্রুপ তৈরি করে এবং বাংলাদেশি সকল মালিককেই তাদের ইচ্ছা মতো চলতে হয়। মালিকরা চাইলেও ভারতীয়দের ওপরে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বাংলাদেশিকে কোনো পদে বা অবস্থানে বসাতে বা চাকরি দিতে পারেন না। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা এমনভাবেই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে যে, উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী। বিক্রি ও রফতানির ব্যাপারেও ভারতীয়দের ইচ্ছার কাছেই মালিকদের নতিস্বীকার করতে হয়। ফলে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্যের অর্ডার এলেও বাংলাদেশি মালিকদের পক্ষে তা গ্রহণ বা সে অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। একই কারণে একদিকে বাংলাদেশ প্রচুর অর্ডার হারায়, অন্যদিকে সে অর্ডারগুলো চলে যায় ভারতে। বাংলাদেশি মালিকদের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হয় যথেষ্ট।
এভাবে লোকসান গুনতে গুনতে এক পর্যায়ে মালিকরা বিপন্ন হয়ে পড়েন, কারখানার অস্তিত্ব রক্ষা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর ঠিক তেমন অবস্থায়ই ভারতীয়রা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা আগে থেকেই ভারতের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে থাকে। কোনো কারখানা অস্তিত্বের সংকটে পড়লেই গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের গার্মেন্টে নিয়োজিত ভারতীয়রা স্বদেশি ব্যবসায়ীদের দিয়ে কারখানার মালিকানা কিনিয়ে নেয়। কাগজেপত্রে বাংলাদেশি হিসেবেই তাদের পরিচিতি লেখা থাকে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মূলত ভারতীয়দের ষড়যন্ত্র ও কার্যক্রমের পরিণতিতে বাংলাদেশের অনেক গার্মেন্ট কারখানা এরই মধ্যে হয় বন্ধ হয়ে গেছে নয় তো চলে গেছে ভারতীয়দের দখলে। অথচ বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৮০ শতাংশই গার্মেন্ট খাত থেকে এসে থাকে।
এভাবেই বাংলাদেশের শিল্প-কারখানাসহ জাতীয় পুঁজির সর্বনাশ ঘটছে। দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, জাতীয় পুঁজিসহ জাতীয় অর্থনীতির জন্য ধ্বংসাত্মক এমন অবস্থার অবসান ঘটানো দরকার। সরকারের উচিত সকল পন্থায় বিদেশি পণ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এজন্য জাতীয় পুঁজির বিকাশকে বাধামুক্ত করার এবং দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর লক্ষ্যে সুচিন্তিত ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতীয় পুঁজি ও শিল্পকে সর্বাত্মকভাবে নিরাপত্তা বা প্রটেকশন দিতে হবে। তেমন ব্যবস্থা নেয়া গেলেই ঈদের মতো উপলক্ষগুলাতে কেনাকাটার জন্য বাংলাদেশিদের বিদেশে যাওয়া কমানো এবং পর্যায়ক্রমে একেবারে বন্ধ করা সম্ভব। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সে লক্ষ্যেই অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
প্রসঙ্গক্রমে কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করলে আমাদের উদ্বেগের কারণ সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হবে। এরকম একটি তথ্য হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাণিজ্য ঘাটতিতে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে দেশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা ধরে হিসাব করলে টাকার অংকে এর পরিমাণ ৯৫ হাজার কোটিরও বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ পরিমাণের ঘাটতি। রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানির ব্যয়বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। এই সময়ে আমদানির জন্য ব্যয় বেড়েছে ২৫ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যদিকে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। ফলে চলতি হিসাবে ঘটিতি অনেক বেশি হয়েছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশকে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত রাখতে হয়।
ঘাটতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিপুল এই ঘাটতির পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে চীন ও ভারতের। দেশ দুটির দিক থেকে নানা ধরনের শুল্ক ও অশুল্কগত বাধার কারণেই বাংলাদেশ রফতানি বাড়াতে পারছে না। প্রকাশ্যে আমদানি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও দেশ দুটি সুকৌশলে এমন কিছু শুল্ক-অশুল্ক ও আধাশুল্কগত বাধার সৃষ্টি করে চলেছে, যার ফলে রফতানির সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে বন্ড পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ওদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাও কোটা ধরনের প্রতিবন্ধকতা চাপিয়ে বাংলাদেশের রফতানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদেরা তাগিদ দিয়ে বলেছেন, অর্থ পাচার বন্ধের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ও প্রবাহ বাড়ানো দরকার, যাতে শিল্পায়নের সঙ্গে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রফতানি বাড়ানো যায়। শুধু রফতানি আয় বাড়ালেও চলবে না, রেমিট্যান্স এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ তথা এফডিআই বাড়ানোর জন্যও সুচিন্তিতভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এফডিআই বাড়ানোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ী জমি বরাদ্দের পাশাপাশি স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগসহ সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।
এভাবে সব মিলিয়ে ইতিবাচক ব্যবস্থা নেয়া হলেই দেশকে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির কবল থেকে মুক্ত করা এবং সমৃদ্ধির সুষ্ঠু পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তখন আর কোনো উপলক্ষেই কেনাকাটার জন্য মানুষকে অন্য কোনো দেশে যেতে হবে না। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ