রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মুসলিম সভ্যতার বিপর্যয়ের কারণ

মনসুর আহমদ : বিশ্ব প্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনাই এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এখানে কোন স্থিতি ও বিরতির অবকাশ নেই। এখানে এক অবিশ্রাম গতি, পরিবর্তন ও আবর্তন বিদ্যমান। এটি কোন জিনিসকেই এক অবস্থায় টিকে থাকতে দেয় না। এখানে সৃষ্টির সাথে লয়, ভাঙ্গার সাথে গড়া, উত্থানের সাথে পতন হাত ধরাধরি করে চলছে। এমনিভাবে এর বিপরীত নিয়মও চালু রয়েছে। আজ একটি মাষা পরিমাণ বীজ যেখানে বাতাসের বেগে উড় উড়ে বেড়ায়, কাল তাই মাটিতে স্থিতি লাভ করে এক প্রকাণ্ড ডাল পালা যুক্ত বৃক্ষে পরিণত হয়। অবার পর দিন তা ই শুকিয়ে মাটিতে একাকার হয়ে যায়। অতঃপর প্রকৃতির সঞ্জীবনী শক্তি গুলো তাকে ত্যাগ করে অপর কোন বীজের লালন-পালনে নিয়োজিত হয়। এই হচ্ছে জীবনের ভাঙ্গা গড়া ও উত্থান পতনের নিয়ম। কিন্তু মানুষ এর কোন একটি অবস্থাকে একটু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে দেখলেই মনে করে যে, এ অবস্থা একেবারেই চিরস্থায়ী। সে অবস্থাটা যদি নিম্নগামী হয়, তবে মনে করে যে, চিরকাল এরূপ নিম্নগামী থাকবে। আবার যদি তা ঊর্ধ্বগামী হয় তো ধারণা করা হয় যে চিরদিন এমনি ঊর্ধ্বগামী থাকবে। কিন্ত এখানে পার্থক্য যা কিছু তা বিলম্ব আর অবিলম্বের, আসলে কোন অবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। ‘তিলকাল আইয়ামু নুদায়েলুহা বাইনান নাস’।
 গোটা পরিবেশই আবর্তিত হচ্ছে এক ধরনের গতিক্রমের মধ্যে। জন্ম- মৃত্যু, যৌবন-বার্ধক্য, শক্তি-দৌর্বল্য, শীত- বসন্ত, শুষ্কতা-সজীবতা এই আবর্তনের বিভিন্ন রূপ মাত্র। এই আবর্তন ধারায় পালাক্রমে প্রত্যেক জিনিসেরই একবার সুদিন আসে তখন শুরু হয় তার বিকাশ বৃদ্ধি, প্রকাশ পায় তার শৌর্য-বীর্য। পরাকাষ্ঠা দেখায় সে আপন রূপ ও সৌন্দর্যের। একদিন সে উন্নতি ও প্রগতির চরম প্রান্তে উপনীত হয়। এ সময় সে ক্ষীণখর্বকায়, দুর্বল ও অক্ষম হয়ে পড়ে এবং যে শক্তিগুলো বিকাশ-বৃদ্ধির সূচনা করেছিল, শেষ পর্যন্ত তাই তাকে ধ্বংস করে দেয়।
গোটা সৃষ্টি জগতে এই হচ্ছে আল্লাহর বিধিবদ্ধ নিয়ম। দুনিয়ার অন্য সব জিনিসের মতো মানুষের উপরেও রয়েছে এ নিয়ম পুরাপুরি কার্যকর।(১) হোক তা ব্যক্তি অথবা হোক তা জাতি, সবই একই নিয়মের অধীনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতি জগতের পরিবর্তন ও বিবর্তনের উপর মানুষের কোন কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু একটি জাতির ভাঙ্গা-গড়ার পিছনে রয়েছে মানবসৃষ্ট বহু কারণ। এসব কারণ সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা চলছে যুগ যুগ ধরে। বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে তার কারণ সমূহ ব্যাখ্যা করেছেন। মুসলিম দার্শনিক ইবনে খলদুন রাষ্ট্রের আয়ুষ্কাল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “জ্যোর্তিবিদ্যানুসারে আয়ুষ্কালের কিছুটা হেরফের হতে পারে। তবে সাধারণত এটাই স্বাভাবিক যে, কোন রাষ্ট্রই তিন যামানার বেশি টিকে না। তার অর্থ একটি যামানাকে ৪০ বৎসর ধরলে ১২০ বৎসরের বেশি একটি রাষ্ট্র তার সকল গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।
এই তিনটি পর্যায়ের প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্র সংগঠন কারীদের মধ্যে গোত্রীয় সংহতি এতই প্রবল থাকে যে, তারা তাদের সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য অপরের দ্বারা সম্মানিত ও স্বীকৃত হন। ফলে দিনকে দিন রাষ্ট্রও তাদের হাতে সংগঠনের পথে এগিয়ে চলে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থিতিশীল নগর জীবনে যদিও এই গোত্রীয় সম্বন্ধজনিত সংহতি ভোগ বিলাসের কারণে অনেকটা শ্লথ হয়ে পড়ে, তবুও তখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে তাদের পূর্ব পুরুষের বীর্যবত্তায় কিছুটা রেশ থাকে। ফলে, তাদের মধ্যে নিয়ত এমন একটা প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় যে, তারা তখনও নিজেদেরকে পূর্বপুরুষের সুযোগ্য ঐতিহ্যবাহী বলে জাহির করতে চায়।
কিন্তু সর্বশেষ তৃতীয় পর্যায়ে-এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীদের যে বংশধরেরা শাসন কার্য পরিচালনার ভার পায়, তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থায় দিনের পর দিন শাসনব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার পূর্বপুরুষের সাহসিকতা আর তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। সুখী জীবনের আরাম আয়েশ তাদের একেবারে নিম্নস্তরে নামিয়ে দেয়। তারা দুশ্চরিত্র, লম্পটও দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। এই স্তরে এসে শাসকরা দেশবাসীকে রক্ষা করবে কি, নিজেরাই অসহায় বালক- বালিকা ও বৃদ্ধাদের মতো আত্ম সংরক্ষণের পরমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে সামাজিক সংহতি এতই শিথিল হয়ে যায় যে, তারা তখন না পারে নিজেদের সংরক্ষণ করতে না পারে শত্রু পক্ষকে প্রতিরোধ করতে।(২)
ইবনে খলদুনের এই রাষ্ট্র দর্শন বিভিন্ন জাতির পতনের ইতিহাসের গভীর বীক্ষণের ফল মাত্র। বিভিন্ন জাতির পতনের কারণ থেকে মুসলমান জাতির পতনের কারণ কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে না। একই নিয়ম -বিধানের অধীনে মুসলিম জাতির বিপর্যয় ঘটেছে।”
মুসলমান জাতির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ঐতিহ্য। জাতি হিসেবে হজরত ইবরাহীম (আঃ) ই প্রথমে মুসলমানদেরকে জগতে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই উত্তম ও আদর্শবাহী জাতিটি কাল পরিক্রমায় বিভিন্ন রসুলদের মাধ্যমে সামনে এগুতে থাকে। অবশেষে হজরত মুহাম্মদ (সঃ)-এ হাতে এ জাতির পরিপূর্ণতা ঘটে। জাতির প্রতিষ্ঠাতা রসুল (সঃ) বিভিন্ন সময় জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। রসুলের উপযুক্ত সাথী হজরত ওমর (রাঃ) এ জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে কথা বলেছেন তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেললে মুসলিম জাতির পতনের কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একবার তিনি বলেন, “হে আবু ওবায়েদা! আমরা খুবই অপমাণিত জাতি ছিলাম। কিন্তু আল্লহ তাঁর দীনের বদৌলতে আমাদিগকে সম্মান দান করেছেন। তাই আমরা যখনই ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান পেতে চাইবো তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অপমানিত করবেন, সম্মান ও ক্ষমতা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হগবে, কুফর ও শিরকের গোলামী ও অধীনতা আমাদের ভাগ্যে এসে যাবে।”(৩)
হজরত ওমর (রাঃ) মাত্র একটি বাক্যে মুসলমান জাতির বিপর্যয়ের যে কারণ বর্ণনা করেছেন তা-ই বিপর্যয়ের সঠিক কারণ। দীন থেকে সরে যাওয়া, জাতীয় জীবন থেকে দীনের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলাই জাতির বিপর্যয়ের কারণ। জাতির পুনরুত্থান ও পুনর্গঠনের জন্য এ সব হারাণ বৈশিষ্ট্য আবার মুসলমানদেরকে অর্জন করতে হবে।
প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে দীনের বৈশিষ্ট্য পুরাপুরিভাবে বর্তমান ছিল। ধীরে ধীরে তাদেও মাঝ থেকে বৈশিষ্ট্যাবলী হারিয়ে যেতে থাকল, পরিণামে মুসলমান জাতির বিপর্য়য় ঘনিয়ে এলো। বিপর্যয় ঘটার কারণ সমূহের
মধ্যে তিনটি কারণ :
১) দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত থাকা
২) চিন্তার এক্যে ফাটল সৃষ্টি
৩) আলেম সমাজের অথর্বতা ও ইজতেহাদ থেকে বিরত থাকা।
এসব ঐতিহাসিক কারণ সমূহের প্রতি নজর দিলেই জাতি ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হতে সক্ষম হবে।
ইসলাম প্রকৃত পক্ষে একটি দাওয়াতী দীন। এক ব্যক্তি প্রথমে মানুষদেরকে আহ্বান জানালেন এ দীনকে গ্রহণ করার জন্য। তার পর তাঁর সাথীরা এ কাজ করলেন বহুদিন ধরে। দাওয়াতী কাজ এ জাতির বুনিয়াদী কাজ। পবিত্র কালামুল্লাহে দাওয়াতের উপর গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশ এসেছে- “আপনার পালন কর্তার পথের দিকে আহ্বান করুন। জ্ঞানের কথা দিয়ে বুঝিয়ে এবং উত্তম রূপে উপদেশ শুনিয়ে, এবং তাদের সাথে (প্রয়োজন হলে) তর্ক বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।”(৪)
অন্যত্র এরশাদ গচ্ছে- “এবং তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হল সফলকাম।”(৫)
প্রথম যুগের মুসলমানরা খোদার কলেমা প্রচারকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন। তারা দুনিয়ার বিভিন্ন কাজ কারবার সম্পাদন কালে এ লক্ষ্য সামনে রাখতেন। ফলে তাঁরা ব্যক্তিগত জীবন থেকে যতটা সময় ও ধন মাল বাঁচাতে পারতেন, তা তাঁরা ইসলামের সেবায় নিয়োজিত করতেন। যে কারণে তাঁরা জাতি হিসেবে কয়েকটি বছরের মধ্যে এমন শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হলেন যে, দেখতে না দেখতে গোটা আরব ভূমি তাদের শাসন ক্ষমতায় এসে গেল। পরবর্তী কয়েক বছরে তারা পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লেন।
মুসলমান জাতির অগ্রগতির আসল শক্তিই হল দাওয়াতী কাজ চালু রাখা। ইতিহাসের দিকে তাকালেই এ সত্য ফুটে ওঠে। এ ব্যাপারে অধ্যাপক ম্যাক্সমুলারের অভিমত হল: “ইসলাম মূলতঃ একটি প্রচার মূলক ধর্ম। তাবলীগ বা প্রচারের উপরেই এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। প্রচারের বলেই তার অগ্রগতি ও বিকাশ সাধিত হয়েছে এবং প্রচারের উপরেই তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল।”
মিশর বিজেতা আমর ইবনুল আস আরব মুসলমানদেরকে যে কথা বলেছিলেন তার মাঝে এ সত্যই প্রস্ফুটিত হয়েছে। তিনি বলেন, “তোমরা সদা সর্বদা একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ঘাটির পাহারায় নিয়োজিত আছ। তোমরা এটা মনে কর না যে, তোমরা কিবতী (মিশরের আদীম অধিবাসী কপট সম্প্রদায়)দেরকে পরাজিত করেছ এবং রোম সা¤্রাজ্যের সর্বোত্তম এলাকা তোমাদের কব্জায় এসে গেছে। জাযীরাতুল আরব একেবারে কাছে এবং এখানে সার্বিক ব্যবস্থাপনা তোমরা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছ। এ ব্যাপারে তোমরা যেন প্রতারিত না হও। আনতুম ফি রিবাতেন দায়েমেন - তোমরা এমন এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছ যে, চোখ বুজেছ কি মরেছ। এখানে তোমাদেরকে সব সময় সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তোমরা একটা পয়গামের বার্তাবাহী, তোমরা একটি দাওয়াত নিয়ে এসেছ ; তোমরা একটি সীরাত একটি জীবনাদর্শ ও জীবন- চরিত নিয়ে এসেছ। যদি দাওয়াতের ক্ষেত্রে তোমরা কোন রূপ অলসতা এবং গাফলতির আশ্রয় নাও তা হলে তোমরা মারা পড়বে। তোমরা যদি নিজেদের সীরাত ও জীবনাদর্শ হারিয়ে ফেল যা তোমরা আরব থেকে বয়ে নিয়ে এনেছিলে, যা তোমরা নবীর কোল থেকে এবং মারকায -ই- মদীনা মুনাওয়ারা থেকে নিয়ে এসে ছিলে তা হলে তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রধান্য বিলুপ্ত হবে। যদি কখনো তোমরা মনে কর যে, রুটি রুযী কামাই করার জন্য তোমরা এখানে এসেছ, তোমর এখানকার উর্বর ভূখ- থেকে, এখানকার শ্যামল সবুচজ সৌন্দর্যের সমারোহ থেকে লাভবান হতে এসেছ, তোমরা যদি এখানকার আরাম আয়েশ ও বিলাসিতার মধ্যে ডুবে যাও, আর তোমরা যদি এতটুকু অলসতার প্রাশ্রয় দাও তবে তোমাদেরকে কেউ করুণা দেখাবে না, তোমরা এখানে বাঁচতে পারবে না।(৬)
ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালু না থাকার কারণে মুসলমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শত শত বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও এক সময় সে সব দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ স্পেনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। যারা স্পেনের ইসলাম ও মুসলমানদের অবনতির কারণগুলো পর্যালোচনা করেছেন তারা বলেছেন যে, “এর বড় কারণ হ’ল, আদনান গোত্রের ও হেজাজী গোত্রের লোকেরা চাইত যে স্পেনের ক্ষমতার বাগডোর থাকবে তাদের হাতে। তারা কখনো ইসলামের তাবলীগ ও প্রচার প্রসারের দিকে এতটুকু মনোযোগ দেয়নি। তারা ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ দিকে সরে গেছে যেখান থেকে মুসলিম রাষ্ট্র দূরপ্রাচ্য (মরক্কো) ছিল নিকটবর্তী, উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা তারা করেনি। তারা নির্মাণ- শৈলী ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ও মেধা ব্যয় করেছে,——— কিন্তু ইসলামের দৃঢ়তা বিধানে এবং ইসলামকে সেখানকার অধিবাসীদের অন্তর রাজ্যে ঠাঁই করে দেবার এতটুকু প্রয়াস তারা নেয়নি। তারা আয্ যাহরা প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, তারা আল হামরা কেল্লা তৈরি করেছে, তারা কর্ডোভা মসজিদও বানিয়েছে, স্থাপত্য শিল্পে যার তুলনা মেলা ভার——-। কিন্তু এর পরিবর্তে তাদের আশে পশের লোকদেরকে ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ট ও পরিচিত করার দরকার ছিল, জাবালুত তারিক (জিব্রাল্টার)এর দিকে পিছু হটবার পরিবর্তে দরকার ছিল সম্মুখে অগ্রসর হবার এবং ইউরোপের দিকে অগ্রাভিযানের। কিন্তু তা না করে তারা সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নতি, সূক্ষ্ম শিল্প কলার পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্মাণ কর্মে লেগে গেল। কবিতা ও কাব্য চর্চায় লিপ্ত হয়ে পড়ল।”(৭) কিন্তু তারা ইউরোপে বিশুদ্ধ ও মৌলিক ইসলামের ইসলামের প্রসার ঘটাল না। তাদের এই মৌলিক কর্মের বিচ্যুতির কারণে আল্লাহ তাদের কাছ থেকে দেশটাই নিয়ে গেলেন।
এ অবস্থা শুধু স্পেনেই নয়, পাক ভারত উপমহাদেশেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটে। “এরপরে বাংলা -পাক-ভারতে মুসলমানদের বিজয় অভিযানের আসল ধারাক্রম শুরু হয়। কিন্তু তখন বিজেতাদের মধ্যে সোনালী যুগের মুসলমানদের মতো বৈশিষ্ট্য- বিশেষত্ব বর্তমান ছিল না। তারা এখানে ইসলাম প্রচারের পরিবর্তে রাজ্য বিস্তÍারের কাজেই নিজেদের সমগ্র শক্তি ব্যয় করেন এবং লোকদের কাছে খোদা ও রাসুলের আনুগত্যের বদলে নিজেদের আনুগত্য ও রাজস্ব দাবি করেন। এরই অনিবার্য ফলে কয়েক শ’ বছর রাজ্য শাসনের পরও এ উপমহাদেশের বেশির ভাগ অধিবাসীই অমুসলিম রয়ে গেল এবং ইসলামী কৃষ্টি ও সভ্যতা এখানে বদ্ধমূল হতে পারল না। —অবশেষে ঈসায়ী আঠার শতকে ভারতে ইসলামী সভ্যতার সব চেয়ে বড় সহায়ক সেই রাষ্ট্রশক্তিও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেল।(৮)
দ্বিতীয় কারণ- চিন্তার অনৈক্য।
ইসলাম হুকুম করেছে, “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত ভাবে আকড়িয়ে ধর। বিচ্ছিন্ন হয়েও না।” —- এ নীতিতে মুসলমান যত দিন অবিচল ছিল ততদিন মুসলিম জাতি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পৃথিবীতে আসন করে নিয়েছিল। কিন্তু যখনই মুসলমান কোরআন ছেড়ে দিল তখনই মুসলমানদের মধ্যে চিন্তার অনৈক্য দেখা দিল। মুসলিম সমাজে অসহিষ্ণুতা ও কর্মধারায় বিভিন্নতা দেখা দিল, ফলে মুসলিম, সমাজে বিপর্যয় নেমে এল। ইতিহাসের পৃষ্ঠার বিরাট স্থান জুড়ে আছে এ বেদনার ও লজ্জার ইতিকথা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, “ কোন জাতির নৈতিক অধঃপতন আগে শুরু হয়, আর রাজনৈতিক অধঃপতন হয় পরে। গ্রীক, রোম, সাসানী সাম্রাজ্য, প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্য এবং ইসলামী সালতানাত সমূহের ইতিহাস এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।”(৯)
মুসলমান জাতির বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ চিন্তা ও রাজনীতির মতপার্থক্য। স্পেনে মুসলমানদের অবনতির ইতিহাস ও তার কারণ খুঁজে দেখলে এ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে আরব গোত্রগুলির পারস্পরিক শত্রুতা, দ্বন্দ¦ -সংঘাত ও অনৈক্য অর্থাৎ রাবীয়া ও মুদার, আদনানী ও কাহতানী, হেজাজী ও ইয়ামেনীদের মতানৈক্য ছিল এর বড় কারণ।
ইসলামের বিপর্যয় তখনই ত্বরান্বিত হল যখন চিন্তার ক্ষেত্রে মতানৈক্য শুরু হল এবং তা পরিণতিতে দ্বন্দে¦ রূপ নিল। প্রথম যুগে মুসলমানরা সরাসরি কোরআন ও হাদিস থেকে জীবন সমস্যার সমাধান নিত। পরবর্তীতে “ আমাদের ধর্ম নেতারা খুঁটিনাটিতে এত দূর লিপ্ত হয়ে পড়েন যে,তার ফলে মূল ভিত্তিই তাদের হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছে। অতঃপর খুটিনাটিই মূলনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে এবং তার থেকে আরো অসংখ্য খুটিনাটি বেরিয়ে এসেছে আর এ গুলোই প্রকৃত ইসলাম বলে আখ্যা পেয়েছে। অথচ ইসলামে এগুলোর আদৌ কোন গুরুত্ব ছিল না। প্রকৃত পক্ষে ইসলামী জাতীয়তার প্রাসাদটি এই ধরাক্রমের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, প্রথমে কোরআনে মজীদ, তারপর সুন্নাতে রাসুল (সঃ) এবং সর্বশেষে জ্ঞানী ও মনীষীদের ইজতেহাদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই ধারাক্রমকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়া হয় এবং এইভাবে ধারাক্রম রচনা করা হয় যে, প্রথমে একটি বিশেষ যুগের মনীষীদের ইজতেহাদ, পরে সুন্নাতে রাসুল (সঃ) এবং সর্বশেষে কোরআন মজীদ। এই নয়া ধারাক্রমই হচ্ছে সমস্ত জড়তা ও ক্লীবতার জন্য দায়ী, যা ইসলামকে একটি অকেজো ও নিস্ক্রিয় বস্তুতে পরিণত করেছে।”(১০)
ইসলামের প্রারম্ভিক কালে মুসলমানেরা ধর্ম প্রচার ও ধর্ম পালনেই মশগুল ছিলেন। রসুল (সঃ) -এর ইন্তেকালের পর চলমান জীবনের ক্রমবর্ধমান সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম চিন্তাবিদগণ কোরআন ও হাদিসের মূলনীতি সমূহকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কোরআন ও হাদিসের এই ব্যাখ্যা ক্রিয়ায় চিন্তার বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এবং এই মতভেদকে কেদ্র করে বিভিন্ন চিন্তাগোষ্ঠী ও ফের্কার উদ্ভব ঘটে। যাদের এক দলকে বলা হয় ধর্মীয় রাজনৈতিক সম্প্রদায় (Religio political school), যাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সুন্নী মজহাব, শিয়া সম্প্রদায়; দ্বিতীয় দলকে বলা চলে ধর্মতাত্বিক সম্প্রদায় (Theological school), তৃতীয় দলকে বলা চলে দার্শনিক সম্প্রদায় (Philosophical school) যার মধ্যে রয়েছে মুতাজিলা, আশারিয়া ও সূফী সম্প্রদায়। 
ইসলামী চিন্তার জগতে সম্প্রদায় বা ফের্কা সৃষ্টি ইসলামী সভ্যতার বিপর্যয়ের একটি বিশেষ কারণ। চিন্তার বিভিন্নতাই তাদেরকে এক আপরের শত্রুতে পরিণত করেছে। আমরা দেখতে পাই পাশ্চাত্য দেশে “ শাফেয়ী’ বংশের প্রতিষ্ঠাতা শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং তজ্জন্যই তার সুন্নী প্রতিবেশী, পশ্চিমে উসমানীয়দের এবং পূর্বে উজবেগদের প্রতি স্বীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য ছল প্রদর্শন করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দী থেকে শিয়া সুন্নীদের সংগ্রাম এমন এক নির্মম পর্যায়ে উপনীত হল যে, মধ্য যুগর কোন সময়ই তেমনটির অস্তিত্ব ছিল না। শিয়া সুন্নীরা তখনই প্রথম বারের মত স্ব স্ব মতবাদের আলেমদের মতামতকে ভিত্তি করে পরস্পর পরস্পরকে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলো। সংগ্রামশীল শিয়াবাদ পারস্যের জন্য এক প্রকারের রাজনৈতিক রক্ষা কবচে পরিণত হল।”(১১)
চিন্তার বিভিন্নতা মুসলিম সভ্যতাকে কি ভাবে ধ্বংস সাধন করেছে তা আলোচনার জন্য বিস্তর সময়ের দাবি রাখে। সংক্ষেপে তাদের বিশ্বাস ও কার্যপদ্ধতি আলোচনা করলে দেখা যাবে কি ভাবে তারা ইসলামের ক্ষতি সাধন করেছে। খারেজীরা মনে করে যারা তাদের মতের সংগে এক্যমত পোষণ করে না তারা ধর্মদ্রোহী বা কাফের। খারেজীদের কর্তব্য তাদেরকে ধ্বংস করা। সাধারণ মুসলমানদের প্রতি খারেজীদের মনোভাব ছিল অত্যন্ত শত্রুতা মূলক এবং খারেজীদের এই শত্রুতা মুসলমানদের মধ্যে প্রচুর রক্তপাত ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে।
জাবারিয়া ও কাদেরিয়া সম্প্রদায় দুটির আবির্ভাব হয়েছিল যখন খেলাফত ধ্বংস হয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। জাবারিয়া চিন্তাবিদগণ অদৃষ্টবাদ প্রচার করতে থাকেন। উমাইয়া শাসকগণ মানুষের ইখতিয়ার ও স্বাধীনতার আকীদাকে বিলোপ করে জাবারিয়া মতবাদের প্রবক্তাদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। এ মতবাদ প্রচারের ফলে ইসলামী সালতানাতের দুর্দশা ও দুরাবস্থা ও সাধারণ মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার সব দায় দায়িত্ব ও অপকর্মের বোঝা শাসকগণণ তাদের মাথা থেকে সরিয়ে আল্লাহর কাধে ফেলে দিল। এ চিন্তাধারার ফলে মুসলমানগণ তাদের সামষ্টিক কর্মকা-ের মূল্যায়ন ত্যাগ করলো। ফলে মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধনের ও উন্নয়নের পথে পদচারণা বন্ধ হয়ে গেল।
খিলাফতে রাশেদার পর রাজনৈতিক টানা পোড়েন, ধর্মতাত্মিক বিচার বিশ্লেষণ ও বিতর্কের কোন্দল থেকে দূরে থাকার প্রবণতা থেকে জন্ম নেয় সূফী বাদ। “খিলাফতে রাশেদার পরই ইসলামী জীবনব্যবস্থায় নানারূপ বিশৃংখলার সৃষ্টি হলে আমাদের সূফী সম্প্রদায়ও এই প্রক্রিয়ার অনুকরণে বিভিন্ন জায়গায় খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ খানকার কথাটির এমনি অর্থ বিকৃতি ঘটেছে যে, শব্দটি শোনামাত্রই লোকদের মনে আলো হাওয়া বর্জিত একটি বিদঘুটে জায়গার চিত্রই ভেসে ওঠে। কিন্তু আসলে এই খানকাহ ছিল মদীনায় বিশ^নবী (সঃ) প্রতিষ্ঠিত আদর্শের একটি অনুকরণ মাত্র। যে সব লোকের মধ্যে কিছুটা প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যেত, শ্রদ্ধেয় সূফী সম্প্রদায় তাদেরকে বহির্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে কিছুদিনের জন্য খানকায় রেখে দিতেন এবং মহানবী (সঃ) ও সাহাবায়ে কিরামের অনুকরণে সেখানে তাদেরকে উন্নত মানের ট্রেনিং দান করতেন।(১২)
প্রথম দিকের সূফী সাধকগণ শরিয়তের বাহ্যিক আইন -কানুনের পাবন্দীর সাথে সাথে ইসলামের আধ্যত্মিক ও নৈতিক প্রাণ সত্তার এক সুন্দর সংমিশ্রণ সৃষ্টি করলেন। তাদের এ অবস্থা বেশি দিন টিকেনি। “যখন সূফী আন্দোলন আরব থেকে বের হয়ে সিরিয়া, তুর্কিস্তান ও হিন্দুস্তানে প্রবেশ করলো, তখন তার রূপ, উদ্দেশ্য, আকীদা ও চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। তখন একটি বাহ্যিকতার বিরুদ্ধে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার রক্ষাবুহ্য থাকেনি বরং জীবন থেকে পলায়ন,রাজনীতির প্রতি অমনোযোগিতা এবং জাগতিক পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার প্রতি বিমুখতার একটি দর্শনে পরিণত হল।”(১৩) যা পরিণতিতে মুসলমানদেরও ধর্মের মধ্যে সামাজিক লাভ -উন্নতি ও জনসেবার কোন স্থান রইল না। তখন তা শুধু আল্লাহ ও মানুষের সম্পর্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। এ ভাবে রাজনৈতিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক সমস্যা থেকে সম্পর্কহীনতা মুসলিম সভ্যতার বিপর্যয় ডেকে আনে। যখন তাসাউফের উপর প্রাচ্যবাদ ও দর্শনের উপর নিউপ্লাটোবাদের প্রভাব দৃঢ় হয়ে দাঁড়াল তখন সূফী সম্প্রদায় ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ ইসলামের প্রাথম যুগের সত্যিকার সূফীবাদ পরিহার করে বিভিন্ন মরমীবাদীদের অনুসরণ করে চলছিলো। যে কারণে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের উন্নতির ধারা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এল চিন্তা গবেষণায় বন্ধ্যাত্ব। তাই বলাচলে মুসলমানদের অধপতনের অন্যতম কারণ চিন্তার বিভিন্নতার ফসল সূফীবাদ।
চিন্তার অনৈক্য যে শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রেই মুসলমানদের জন্য অনগ্রসরতার কারণ ঘটিয়েছে তাই নয়, বরং বিজ্ঞান জগতেও মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে বাধা দিয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, “বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাদের অভিভাবক হয়ে সেলজুক সুলতানরা সুন্নী চিন্তা রীতি ও ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থা রক্ষা করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ধর্ম মত, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর যারা এই প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধী তারা আব্বাসীয়দেও প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া ইসমাইলী মতবাদের স্বপক্ষে বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য গোপন প্রচার ও জনমত সংগঠনে সচেষ্ট ছিল। এই প্রচারের ফলশ্রুতি হল দশ শতকের মাঝামাঝি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমী বংশের নেতৃত্বে ইসমাইলী খিলাফত প্রতিষ্ঠা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কায়রোতে ইসমাইলী ধর্মমতপ্রচারর পদ্ধতি শেখানোর জন্য আল -আজহার প্রতিষ্ঠা করা হয়। রাষ্টীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে ইসমাইলী ইডিওলজিকাল অনুপ্রবেশ থেকে আত্ম রক্ষা করতে তাই আব্বাসীয় সেলজুক নেতাদেরকেও প্রতিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হয়। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ