শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

নগদ অর্থসংকটে আর্থিক অবস্থার অবনতি

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : নগদ অর্থসংকট, মুনাফা ও সম্পদ কমে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে নগদ অর্থসংকটে পড়েছে ১৩টি। মুনাফা কমেছে ১৮টি ব্যাংকের। সম্পদ কমেছে ১০টির। একটি ব্যাংক লোকসানের মধ্যে রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি তিন মাস পরপর আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়। এরই আলোকে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংক চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত ওই আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, অর্থসংকটে পড়া ১৩টি ব্যাংকের মধ্যে নয়টি ২০১৭ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়েও সংকটের মধ্যে ছিল। চলতি বছরে নতুন করে অর্থসংকটে পড়েছে চারটি ব্যাংক। তবে গত বছর অর্থসংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংক সংকট থেকে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ব্যাংক খাতের সংকটের চিত্রই উঠে এসেছে। ঠিক মতো যাচাই-বাছাই না করে ঋণ দেয়ায় ব্যাংকগুলো এমন সংকটের মধ্যে পড়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে এবং কমছে আমানতের প্রবৃদ্ধি। যা সার্বিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। পুঁজিবাজারে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব।
তারা বলেন, ব্যাংকের ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। ব্যাংক খাতে সাংঘাতিক তারল্য সংকট চলছে। অনেক ব্যাংক এখন নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছে না, নতুন লোন দিচ্ছে না। ব্যাংক খাতের এ অবস্থার কারণে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। বেসরকারি খাতের লোকজন এখন ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছে না। এতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকের যদি ইনকাম কমে যায়, প্রভিশন বেশি করতে হয়, খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তা পুঁজিবাজারে খারাপ প্রভাব ফেলবে। কারণ ব্যাংক পুঁজিবাজারের একটি বিরাট খাত। বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের শেয়ারে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কোম্পানি যদি ভালো পারফরমেন্স করতে না পারে তাহলে কোনো প্রণোদনা কাজে আসবে না।
চলতি বছরের নয় মাসের ব্যবসায় নগদ অর্থসংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক ও ইউসিবি। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবি ব্যাংক চলতি বছরে নতুন করে নগদ অর্থসংকটে পড়েছে। বাকি ব্যাংকগুলো গত বছরের নয় মাসের হিসাবেও নগদ অর্থসংকটে ছিল। তবে গত বছর অর্থসংকটে থাকলেও ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন মাস শেষে ১৩টি ব্যাংকের পরিচালন নগদ প্রবাহ বা অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার অর্থ ওই প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থের সংকট সৃষ্টি হওয়া। যে প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ফ্লো যত বেশি ঋণাত্মক, ওই প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সংকট তত বেশি।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সবচেয়ে বেশি নগদ অর্থসংকটে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩২ টাকা ৯০ পয়সা। দ্বিতীয় স্থানে থাকা এবি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১১ টাকা ৭৯ পয়সা। এর পরেই রয়েছে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক। এই ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১১ টাকা ১৬ পয়সা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন নগদ প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডিকেটর। এতে প্রতিষ্ঠানের তারল্যের চিত্র ফুটে ওঠে। পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হলে সেই প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সংকট সৃষ্টি হয়। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠানের সংকট বাড়তে থাকে। যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন নগদ প্রবাহ যত বেশি ঋণাত্মক, ওই প্রতিষ্ঠানের সংকট তত বেশি।
এদিকে আগের বছরের তুলনায় মুনাফা কমেছে ১৮টি ব্যাংকের। এ তালিকায় রয়েছে- এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউসিবি ও উত্তরা ব্যাংক।
এর মধ্যে এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউসিবি নগদ অর্থসংকটেও রয়েছে। এছাড়া এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য কমেছে।
আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি মুনাফা কমেছে এক্সিম ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা কমে ১১ ভাগের এক ভাগে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে মাত্র ১১ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল এক টাকা ২৪ পয়সা। দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মুনাফা ৭০ পয়সা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ পয়সা। দুই টাকা ৫৪ পয়সা থেকে কমে ৭৮ পয়সা শেয়ারপ্রতি মুনাফা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ওয়ান ব্যাংক।
আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের নগদ অর্থসংকট ও লোকসানের পাশাপাশি সম্পদ মূল্যও ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক আছে ১৬ টাকা ২৮ পয়সা। আগের বছরে একই সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি সম্পদ ছিল ঋণাত্মক ১৫ টাকা ৫৪ পয়সা। অর্থাৎ সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের তুলনায় দায় বেড়েই চলেছে।
এছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে আগের বছরের তুলনায় শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে- এবি ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩২ টাকা ৭ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ টাকা ২৮ পয়সা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি সম্পদ মূল্য ১৯ টাকা ৮৮ পয়সা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ টাকা ৮৮ পয়সা। সিটি ব্যাংকের ২৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে কমে ২৪ টাকা ৮৯ পয়সা দাঁড়িয়েছে। এক্সিম ব্যাংকের ১৮ টাকা ৪৯ পয়সা থেকে কমে ১৮ টাকা ৪৪ পয়সা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২২ টাকা ৮ পয়সা থেকে কমে ২২ টাকা ৭ পয়সা, ওয়ান ব্যাংকের ১৮ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে কমে ১৭ টাকা ৮৮ পয়সা, পূবালী ব্যাংকের ২৯ টাকা ৯১ পয়সা থেকে কমে ২৬ টাকা ৩০ পয়সা, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ২৯ টাকা ৩৫ পয়সা থেকে কমে ২৬ টাকা ৮০ পয়সা, ট্রাস্ট ব্যাংকের ২২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে কমে ২২ টাকা ২৪ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ