রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

এতুল বেতুল চিরলপাতা তেঁতুল নয় তো টক

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : তেঁতুল। বেশ বড়সড় সবুজ এবং ঝিরিঝিরি ঘনপাতাসমৃদ্ধ গাছ। ফল লম্বা। কিছুটা বাঁকা আর চেপ্টা ধরণের। ভেতরে বীজ থাকে। পাতলা খোসায় আবৃত থাকে তেঁতুলের শাস। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায়ই বেশ টক। বয়ঃসন্ধিকালে তরুণীদের এটি খুব পছন্দের। এছাড়া সন্তানসম্ভবা মা-বোনেরাও লঙ্কা-লবণসহযোগে  তেঁতুল খেতে খুব পছন্দ করেন। এসময় বমিভাবের উদ্রেক করলে  তেঁতুল সেবনে সেটারও নাকি উপশম হয়। 'সেবন' বলছি এজন্য যে কাঁচা  তেঁতুল অনেকটা ওষুধের মতোই গ্রহণ করতে দেখি ওদের।
আগে অবশ্য  তেঁতুল নিয়ে অহেতুক কিছু বিভ্রান্তিকর ধারণা ছিল মানুষের। এখনও আছে। তবে আগের তুলনায়  তেঁতুল নিয়ে ভুল ধারণা অনেকটাই কমেছে। তাই  তেঁতুল এখন অনেকে নানাভাবে খান। তেঁতুলের আচার, মোরব্বা, চাটনি বেশ জনপ্রিয় আজকাল। শহরের সুপার শপে সাজানো থাকে সুন্দর বোয়ামে। সেখান থেকেই গৃহিণীরা সংগ্রহ করেন। হেফাজতের আমির শফি হুজুর অবশ্য ‘ তেঁতুলহুজুর’ হিসেবে খ্যাতিমান। আগে তিনি টকই ছিলেন অনেকের কাছে। অবশ্য এখন বেশ মজেছেনতো তাই আগের মতো আর ওতোটা টক নন। এখন বেশ মিষ্টিই। তাই কদরও বেড়েছে  তেঁতুলহুজুরের। আর  তেঁতুল পুরনো হলে নাকি গুণও বাড়ে।
হ্যাঁ, তেঁতুলের জানা-অজানা বহুমাত্রিক উপকারিতা নিয়ে বন্ধুকবি আতিক হেলাল ইন্টারনেট থেকে বেশকিছু তথ্য পরিবেশন করেছেন। আমি সেগুলো প্রায় হুবহু তুলে ধরতে চাই এখানে:
তেঁতুল খেলে শরীরের ক্ষতি হয়, এমন একটা ধারণা চালু আছে বহু দিন ধরে। কেউ কেউ বলেন, তেঁতুল খেলে রক্ত পানি হয়ে যায়। তবে এর আদ্যোপান্ত ঘাঁটতে গিয়ে সেরকম কিছু পাওয়া যায়নি। বরং জানা যায়, বিভিন্ন রোগে খুব উপকারী এ  তেঁতুল। হৃদরোগীদের জন্যও বিশেষ উপকারী পথ্য তেঁতুল। এতে রয়েছে প্রচুর ভেষজ ও পুষ্টিগুণ।
তেঁতুল মানবদেহের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। রক্তে কোলস্টেরল কমায়।  তেঁতুল চর্বি কমাতেও বেশ বড় ভূমিকা রাখে। এতে কোলস্টেরল ও ট্রাইগ্রাইসেরাইডের মাত্রা এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। শরীরের মেদ কমাতে ভূমিকা রাখে। এতে টারটারিক এসিড থাকায় খাবার হজমে সহায়তা করে। শরবত করেও খাওয়া যেতে পারে  তেঁতুল। পেটের বায়ূ, হাত-পা জ্বালায় এর শরবত কার্যকর পথ্য। তিন-চার দানা পুরনো তেঁতুলের এক কাপ রসের সঙ্গে চিনি বা লবণ মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন ভেষজ চিকিৎসকরা।  তেঁতুলগাছের বাকলেও উপকার আছে। শুকনো বাকলের প্রলেপ ক্ষতস্থানে লাগালে তা সারে। বুক ধড়ফর করা, মাথা ঘোরানো ও রক্তের চাপ কমাতে  তেঁতুল দারুণ উপকারী। কাঁচা  তেঁতুল গরম করে আঘাত পাওয়া স্থানে প্রলেপ দিলে ব্যথা সেরে যায়।
পুরনো  তেঁতুল খেলে আমাশয়, কোষ্ঠবদ্ধতা ও পেট গরমে উপকার পাওয়া যায়। পুরনো  তেঁতুল খেলে কাশি সারে। পাকা  তেঁতুল খেলেও কাশি যায়। পাকা তেঁতুলে খনিজ পদার্থ সব ফলের চেয়ে অনেক বেশি। তেঁতুলে খাদ্যশক্তির পরিমাণ নারিকেল ও খেজুর ছাড়া সব ফলের চেয়ে বেশি। আয়ূর্বেদীয়, হোমিও, এলোপ্যথিক ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়  তেঁতুল।  তেঁতুলপাতার রস কৃমিনাশক ও চোখওঠা সারায়। মুখে ঘা বা ক্ষত হলে পাকা  তেঁতুল পানিতে মিশিয়ে কুলকুচা করলে উপকার পাওয়া যায়।
পুষ্টিগুণেও অনন্য এই  তেঁতুল। ক্যালসিয়ামের পরিমাণ সব ফলের চেয়ে ৫ থেকে ১৭ গুণ বেশি। আয়রনের পরিমাণ নারিকেল ছাড়া সব ফলের চেয়ে ৫ থেকে ২০ গুণ বেশি। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও স্বাভাবিক পরিমাণে আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা তেঁতুলে মোট খনিজপদার্থ ২.৯ গ্রাম। খাদ্যশক্তি ২৮৩ কিলোক্যালরি। আমিষ ৩.১ গ্রাম। চর্বি ০.১ গ্রাম। শর্করা ৬৬.৪ গ্রাম। ক্যালসিয়াম ১৭০ মিলিগ্রাম। আয়রণ ১০.৯ মিলিগ্রাম। ক্যারোটিন ৬০ মাইক্রোগাম ও ভিটামিন সি ৩ মিলিগ্রাম। অতএব সব মিলিয়ে  তেঁতুল খেতে পারেন সবাই। ভয় পাবার কিচ্ছু নেই। তবে অন্য কোনও ওষুধ মানে এলোপ্যাথি, হোমিও ইত্যাদি সেবনকালে তেঁতুল খেতে নিষেধ করেন চিকিৎসকরা। খেলে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। হ্যাঁ, তেঁতুলের নিজস্ব গুণ থাকায় তা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। তেঁতুলের ফলই কেবল উপকারী তা কিন্তু নয়। এর চিরল চিরল সবুজ পাতাও যথেষ্ট উপকারী। ভিটামিন 'সি' সমৃদ্ধ। ফল যখন গাছে থাকে না, তখন এর পাতা লবণ-মরিচসহযোগে ভর্তা বানিয়ে খেলেও ভিটামিন 'সি' পাওয়া যায়। গ্রামের মেয়েরা  তেঁতুলপাতা ছিঁড়ে নিয়ে এমনিতেই চিবিয়ে চিবিয়ে খায়। অর্থাৎ তেঁতুল প্রকৃত অর্থেই অভাবনীয় উপকারী ফল। এ দিয়ে যেমন সরাসরি বহুপদের খাবার প্রস্তুত করা যায়, তেমনই অন্য খাবারের সঙ্গে মিশিয়েও উপাদেয় খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। চানাচুর, চকোলেটও প্রস্তুত হয়  তেঁতুল সংমিশ্রণে। আবার বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণেও এর ব্যবহার রয়েছে। এমনকি রোগনিরাময়কারী ওষুধও প্রস্তুত হয়  তেঁতুল দিয়ে। এলোপ্যাথিক, হোমিও, কবিরাজি বা আয়ুর্বেদিক বহু দাওয়াই প্রস্তুত হয় এ দিয়ে। তাই  তেঁতুল একটি নিয়ামত একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। তাই  তেঁতুল নিয়ে রাজনীতি করা বাঞ্ছিত কাজ নয়। কিন্তু আমরা  তেঁতুলকেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছি।
যাই হোক, ‘ তেঁতুলহুজুর’ বলে বেচারাকে আমরা অনেকেই বিদ্রুপাত্মক বাক্যবাণ ছুঁড়ে মেরেছি। চট্টলা থেকে ঢাকায় এসেও শাপলাচত্বরের সমাবেশে তিনি যাতে হাজির না হতে পারেন সেজন্য বহু ফন্দিফিকির করা হয়েছে। তারপর আরও অনেক ঘটনা-রটনার ডাল-পালা গজায় এবং সেগুলো বহুদূর বিস্তার লাভ করতে থাকে।  তেঁতুলহুজুরকেও তড়িঘড়ি করে চট্টলা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল সেবার। হেফাজতের লোকজনকে কীভাবে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করা হয় তাতো সবারই জানা। সেই থেকে হেফাজত প্রায় কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে। পরবর্তীতেও হেফাজতকে ছন্নছাড়া করতে কসরত চলে। বিভাজিতকরণের প্রচেষ্টা এখনও থেমে নেই। তলেতলে  তেঁতুলহুজুরকে দলে ভেড়াবার তদবির অব্যাহত থাকে। বারবার ঢাকা থেকে চট্টলা হাইপ্রোফাইলদের পাঠানো হয় হুজুরকে বাগে আনতে। তোহফা-নজরানাও প্রেরণ করা হয় নামে-বেনামে। কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শনও বাদ থাকে না। যেকরেই হোক হুজুরকে বাগে আনতেই হবে।
বিজ্ঞানের যুগে তেঁতুলের কদর বেড়েছে। আগের দিনে গেঁয়োমেয়েদের কাছেই এর দাম ছিল। ওদের ভালো লাগতো বলেই খেতো। কিন্তু এর ভেতর কী গুণাবলী আছে তা ওদের জানা ছিল না। এখন খাদ্যবিজ্ঞানীরা যেমন তেঁতুলের খাদ্যমান ও পুষ্টিগুণ গবেষণা করে বের করেছেন, তেমনই সচেতন সাধারণ মানুষও এর গুণাবলী অবহিত। তাই তেঁতুলের নানা পদের খাবার প্রস্তুত হয় এবং সেগুলো শহরের সুপার শপে বিক্রির জন্য সাজানো থাকে। শুধু এশিয়াতে নয়, ইউরোপ-আমেরিকার সুপার মার্কেটেও  তেঁতুলজাত খাবার পাওয়া যায়।
হ্যাঁ,  তেঁতুলহুজুরের কথা প্রসঙ্গত উঠে এসেছে। প্রথম প্রথম বেচারা এতোটা গুরুত্ব পাননি রাজনীতিতে।  তেঁতুলহুজুর যে রাজনীতিকে পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারেন তা অনেকের জানা ছিল না। এখন তিনি রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর। ভোটযুদ্ধে জিততে হলে তেঁতুলহুজুরের ফয়েজ লাভ খুব জরুরি। তাই তিনি এখন এতোটা সমাদৃত। মৌলবাদের দুর্গন্ধ, বদবু ইত্যাদি খুশবুতে রূপান্তরিত। তথাকথিত স্যাকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষবাদের ধ্বজাধারীরা পর্যন্ত লাইন লাগাচ্ছেন। তবে এটাকে মন্দ ভাববার অবকাশ নেই। তেঁতুলহুজুরের সহবত এবং ফয়েজের বরকতে যদি তাঁদের অর্ন্তচক্ষু খুলে যায়, যাক না?
উল্লেখ্য, তেঁতুলের জনপ্রিয়তা উপলব্ধি করে কেউ যদি একটি সুন্দর ছড়া উপহার দিতে পারতেন তাহলে মন্দ হতো না। সেটার শুরু এভাবে হতে পারে:
এতুল বেতুল চিরলপাতা  তেঁতুল নয় তো টক,
অনেক গুণের  তেঁতুল এখন সবার পেতে সখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ