শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জয়পুরহাটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড একই পরিবারের শিশু ও জেএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৮জন নিহত 

জয়পুরহাট সংবাদদাতা : জয়পুরহাট শহরের আরামনগর মহল্লায় বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে আগুন লেগে এক পরিবারের ৮ জনই মারা গেছে। পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের আরামনগরের মোমেনা ভিলায় বুধবার রাত ৯টা ১৫ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে। অগ্নিকান্ডের সূত্রপাতের ঘটনা খতিয়ে দেখছেন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ওই বাড়ির গৃহিনী মোমেনা বেগম বাসায় রাইস কুকারে রান্না করছিলেন এ সময় বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রতিবেশীদের ধারণা। এ অগ্নিকা-ে পুরো টিনসেট বাড়ি পুড়ে গিয়ে সেখানেই ৩ জন মারা যায়। মৃতরা হলেন, আরামনগর এলাকার দুলাল হোসেন (৬৫), তার স্ত্রী মোমেনা বেগম (৬০), ছেলে মোমিন আহম্মেদ (৩৩) ও তার ৪ সন্তান। এর মধ্যে বড় মেয়ে জেএসসি পরিক্ষার্থী মুনিরা আক্তার বৃষ্টি (১৪), জমজ দুই মেয়ে হাসি (১২), খুশি (১২) ও দেড় বছরের শিশু তাইমুর ইসলাম নূর এবং মোমিনের স্ত্রী পরিনা বেগম (৩২)। 

প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী মুরাদ হোসেন জানান, রাত আনুমানিক ৯টা ১০-১৫ মিনিটের দিকে বাড়ির মালিক দুলাল আগুন দেখে চিৎকার করে ছেলে মোমিনকে ডাকা-ডাকির শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি পুরো বাড়ি আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং বিদ্যুৎ এর তার পুড়ে মাটিতে পড়ে আছে এ অবস্থায় বাড়ির দক্ষিণ দিক সরু গলি দিয়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য প্রতিবেশী আহসান, রমিছা, আব্দুর রহিম, আরিফ লোহার সাবল দিয়ে রান্না ঘরের জানালা ভেঙে একই পরিবারের আটজনের মধ্যে শিশুসহ পাঁচজনকে বের করে আনতে পারলেও আগুনের প্রচ- তাপের কারণে বাকি ৩ জনকে বের করতে পারিনি। বাড়িটির এক দিকেই মেইন গেইট ছাড়া কোন গেইট ছিল না। সেমিপাকা ৪টি টিনসেডের রুমের সকল আসবাব পত্র, কাঠের জানালা-দরজা ও টিন পুড়ে ছাই হলেও অক্ষত ছিল মহাগ্রন্থ কুরআন শরিফ দুটি।

এ ঘটনায় স্থানীয়রা দগ্ধ আহতদের উদ্ধার করে জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে প্রথমে ভর্তি করালে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রাতেই তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেয় দুটি অ্যাম্বুলেন্স। আহতদের ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের চালক মজনু বলেন, দগ্ধদের দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেয়ার পথে যমুনা সেতু পার হওয়ার আগেই বৃহ¯পতিবার ভোরে চারজনের মৃত্যু হয়। এসময় একটি অ্যাম্বুলেন্স লাশ নিয়ে জয়পুরহাটের উদ্দেশে ফিরে আসে। কিন্তু দুলাল হোসেন বেঁচে থাকায় তাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পৌঁছালে পরিবারের প্রধান একমাত্র বেঁচে থাকা ভ্যান চালক দুলাল হোসেনও সকালে মারা যান। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জয়পুরহাট স্টেশন ইনচার্জ সিরাজুল ইসলাম জানান, রাত ৯.৪০ মিনিটে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছি। দুটি ইউনিট নিয়ে সেখানে আগুন নেভাতে প্রায় ১ ঘন্টারও বেশি সময় লাগে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে রাইস কুকারের শটসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং পুরো বাড়ি পুড়ে গিয়ে সেখানেই তিনজন নিহত হন। 

বৃহস্পতিবার এ ঘটনায় পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোনিয়া বিনতে তাবিবকে প্রধান করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুস সালাম ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র রায়কে সদস্য করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আগুন লাগার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে নির্দেশ দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, অগ্নিকা- ঘটনায় চিকিৎসার জন্য বুধবার রাতে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ত্রাণ ও পূণর্বাসন ফান্ডে জমা রয়েছে। নিহতদের পরিবারের নিকট কারও ঋণ-দেনা পাওনা থাকে তাহলে এ ফান্ড থেকে পরিশোধ করা হবে। 

এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উজ্জল কুমার রায়কে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান। 

এছাড়াও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর পক্ষ থেকে উপ-সহকারী পরিচালক (বগুড়া) নিজাম উদ্দিনকে প্রধান করে ৩ সদস্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি ৭ কার্য দিবসের মধ্যে আগুন লাগার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে কাজ করবে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জয়পুরহাট স্টেশন ইনচার্জ সিরাজুল ইসলাম। 

জয়পুরহাটের এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখতে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান, জয়পুরহাট পৌর মেয়র, সদর উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টরা। 

মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো জয়পুরহাটজুড়ে। শোকাহত এলাকাবাসীরা বলছেন এমন ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা জয়পুরহাটবাসী এর আগে কখনো দেখেননি। 

মৃত ৮ জনের মধ্যে ৫ জনের নামাযে জানাযা স্থানীয় শহীদ জিয়া কলেজ মাঠে দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জানাযাপূর্ব সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এ্যাড. সামছুল আলম দুদু এমপি, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন, জয়পুরহাট ২০ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ মোহাম্মদ আনিসুল হক, পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম সোলায়মান, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, পৌর মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, জেলা বিএনপি সভাপতি মমতাজ উদ্দিন ম-ল, জেলা জামায়াতের আমীর ডাঃ ফজলুর রহমান সাঈদ, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক তিতাস মোস্তফা, কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আল-আমিন, নিহত দুলালের ছোট ভাই জাকির হোসেনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। নামাযে জানাযার ইমামতি করেন বাইতুল আমান জামে মসজিদের খতিব আবু জাফর। জানাযাপূর্বে সমাবেশে পৌর মেয়র এ মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোক দিবস পালনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব দেন। জানাযা শেষে পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাকি ৩ জনের লাশ আসতে দেরি হওয়ায় দাফন সম্পূর্ণ হয়নি। 

উল্লেখ্য যে, নিহতরা পঞ্চগড় জেলা থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে জয়পুরহাট আসে। প্রথমে দুলাল হোসেন চাতাল কর্মী ছিল এরপর সে এ কাজ বাদ দিয়ে ধানের তুষ-গুড়া, চালের খুদের ব্যবসা করত। পরবর্তীতে সে ভ্যান চালাতো এবং তার ছেলে মোমিন গ্রামে গ্রামে ফেরী করে দেশী মুরগীর ব্যবসা করত বলে জানান স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর নূর আলম সিদ্দিক। 

নিহত সকলের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তাদের জীবনের নেক আমলসমূহ কবুল করে নিয়ে জান্নাতবাসী এবং শহীদি মৃত্যুর জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন জেলা জামায়াতের আমীর ডাঃ ফজলুর রহমান সাঈদ, সেক্রেটারি প্রভাষক নজরুল ইসলাম, সদর উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান হাসিবুল আলম লিটনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ