বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পুলিশের সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি তপশিল ঘোষণার আগের রাতে গণহারে পদোন্নতি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশে পদোন্নতির হিড়িক লেগেছে। পদোন্নতির খুশিতে ভাসছে পুলিশ প্রশাসন। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের নামধাম-ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে চারজন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপির পদে পদোন্নতি দেয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। একই সাথে আরও ১৩ জন এডিশনাল ডিআইজিকে পদোন্নতি দিয়ে ডিআইজি করা হয়। গতকাল বুধবার রাতে ২৩০ জন এডিশনাল এসপিকে পদোন্নতি দিয়ে এসপি পদে পদোন্নতি দেয়ার আদেশ তৈরী করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। তবে গতরাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আদেশ জারির খবর পাওয়া না গেলেও ওই আদেশ জারি হতে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটির মতে, ওই ২৩০ জন এডিশনাল এসপির পদোন্নতির যে তালিকা তা আরও লম্বা হতে পারে। যে কারণে পুলিশ প্রশাসনের শেষ মুহূর্তের পদোন্নতির কাজটি সারতে সময় নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনণালয়কে। কারণ, আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর প্রশাসনের বদলী-পদোন্নতিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে যাবে, এতে করে বদলী-পদোন্নতির পথটা রুদ্ধ হতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা পদে ৪৯৫টি পদোন্নতি চেয়ে আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় পুলিশ সদর দফতর। সেই মোতাবেক মঙ্গলবার ১৭ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার আরো ২৩০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে পুলিশ সুপারের সুপার নিউমারারি পদে পদোন্নতির আদেশ জারির খবর প্রকাশ হয়ে যায়। ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পুলিশ সুপার পদে ২৩০টি পদ সৃষ্টি করেছে।
সূত্র মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশের ২৩০ কর্মকর্তা পাচ্ছেন সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি) পদোন্নতি।  প্রধানমন্ত্রীর দফতর এ সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় সম্প্রতি।
এর আগে গত ৪ জুলাই, ২০১৮ পুলিশ সদর দফতর থেকে পুলিশের ৪৯৫ কর্মকর্তাকে সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে) পদোন্নতি দেওয়ার প্রস্তাব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দফতরের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ওঅ্যান্ডএম) এস এম আখতারুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠি যাচাই-বাছাই শেষে ২৩০ জনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দফতরের ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে। ক্যাডার সার্ভিসে বিসিএস প্রশাসন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় ক্যাডার হিসেবে বিবেচিত। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে পুলিশ ক্যাডারের সম্পর্ক ঐতিহ্যগতভাবে খুবই ঘনিষ্ঠ। দুটি বিভাগই সরকারকে মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর তুলনা করলে পুলিশ ক্যাডারের তদারকি পর্যায়ে পদের অপ্রতুলতা খুব সহজে দৃষ্টিগোচর হয়।
চিঠিতে প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারের সাংগঠনিক কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রসাশন ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডার সড়ক ও জনপদ, ফরেন সার্ভিস, শুল্ক ও আবগারি, কর ইত্যাদির তুলনায়ও বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চতর পদে ব্যাপক ঘাটতি তুলে চিঠিতে বলা হয়, প্রশাসন ক্যাডারে উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে সুপার নিউমারারি পদোন্নতি দেওয়া হয়। অন্যান্য ক্যাডারেও এই পদোন্নতি দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেই রীতি অনুযায়ী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সুপার নিউমারারি পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
 সেই চিঠির আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ পুলিশ সুপার পদে (গ্রেড-৫) সুপার নিউমারারি পদোন্নতি দেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে পুলিশের ২৪টি ইউনিটের সাংগঠনিক কাঠামোতে ২৩০টি পদ অস্থায়ীভাবে সৃষ্টির জন্য গত ৩১ অক্টোবর (২০১৮) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়।
এরপর বিষয়টি প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে সুপারিশের জন্য উপস্থাপন করা হয়। সচিব কমিটির অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সেখান থেকেও এ ফাইল অনুমোদন দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
পুলিশের ২৩০ কর্মকর্তার সুপার নিউমারারি পদোন্নতির বিষয়টি স্বীকার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এনটিএমসি) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে অনুমোদিত হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে। কোন ২৩০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে তা বিভাগীয় প্রমোশন কমিটির (ডিপিসি) বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পদোন্নতির তালিকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, কর্মকর্তা তো অনেক বেশি রয়েছেন। কিন্তু বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) যাদের নম্বর কম রয়েছে এবং যাদের বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য রয়েছে, তাদের তো আর পদোন্নতি দেওয়া হবে না।’
এর আগে প্রশাসন ক্যাডারের মতো সুপার নিউমারারি পদোন্নতি চায় পুলিশ। পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত আইজি পদমর্যাদার মোট ৪৯৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে সুপার নিউমারারি পদে পদোন্নতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। সেই কমিটির প্রতিবেদনের পর বিষয়টি চুড়ান্ত করা হয়।
চিঠিতে প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারের সাংগঠনিক কাঠামোর তুলনা করে বলা হয়, গ্রেড-১ পদমর্যাদার সচিব পদে ৮৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬৭টি মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে। সুপার নিউমারারিসহ সচিব পদে ৬৭ জন কর্মরত রয়েছেন। সেখানে গ্রেড-১ পদমর্যাদার অতিরিক্ত আইজিপি পদে মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে দুটি। প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত পদ সংখ্যার অনুপাতে পুলিশের পদ ৩৮টি। গ্রেড-২ পদমর্যাদার অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ১২১টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৯০টি মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে। কিন্তু এই পদে ৩৭৪ জন কর্মরত রয়েছেন, এর মধ্যে ২৮৪টি সুপার নিউমারারি পদ। পুলিশে গ্রেড-২ পদমর্যাদার মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ১৩টি। প্রশাসন ক্যাডারে কর্মরত পদ সংখ্যার অনুপাতে পুলিশের পদ ২২৭টি।
গ্রে-১ ও গ্রেড-২ ছাড়াও চিঠিতে গ্রেড-২-এর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রসাশন ছাড়াও অন্যান্য ক্যাডার সড়ক ও জনপদ, ফরেন সার্ভিস, শুল্ক ও আবগারি, কর ইত্যাদির তুলনায়ও বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চতর পদে ব্যাপক ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের নেতৃত্ব পর্যায়ে কর্মস্পৃহা, মনোবল, মর্যাদা, শৃঙ্খলা এবং গতিশীলতা নিশ্চিত করতে উচ্চতর পদের আনুপাতিক ও তুলনামূলক অপর্যাপ্ততা একটি বড় অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাচের অনেকের পদবঞ্চিত থাকার খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ৪৯৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে সুপার নিউমারারি বা ইনসিটু পদোন্নতি করার ক্ষেত্রে সরকারের (সম্ভাব্য) মাত্র চার লাখ ৯৮ হাজার ৪৮০ টাকা আর্থিক সংশ্লেষের প্রয়োজন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ