শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে বায়ুদূষণ রোধ করতে না পারলে ১০ বছর পর অক্সিজেন নিয়ে ঘুরতে হবে

মুহাম্মদ নূরে আলম : দেশে বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োগযোগ্য কোনো আইন বা বিধি নেই। ফলে বায়ুদূষণ করছে এমন প্রতিষ্ঠানকে কোনো আইন দ্বারা ধরতে পারছে না সরকারি সংস্থাগুলো। এমন পরিস্থিতিতে সরকার নির্মল বায়ু আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে তা আজও আলোর মুখ দেখেনি। অপরদিকে বায়ুদূষণ রোধ করতে না পারলে ১০ বছর পরে সঙ্গে অক্সিজেনের বোতল নিয়ে ঘুরতে হবে রাজধানী ঢাকার সবাইকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আসছে শুষ্ক মৌসুমে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ এবার কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, ইতোমধ্যে রাজধানীর মিরপুরে এলাকা ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন। মেট্রো রেলের কাজের কারণে এবার বিশেষ করে সারা ঢাকায় ভয়াবহ বায়ু দূষণের আশঙ্কা করছে পরিবেশ কর্মী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীতে যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, যানজট, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বেড়েছে। ঢাকায় বিভিন্ন এলাকার মধ্যে মিরপুর-১০ নম্বরে বায়ুদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এ মাত্রা সবচেয়ে কম লালবাগের বিসি দাশ সড়কে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। বেইজিং ও দিল্লিতে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা সবচেয়ে ব্যাপক। দুনিয়ার যেসব নগরী বায়ুদ্বারা ভয়াবহভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে তাতে ঢাকার অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। শুধু ঢাকা নয়, পুরো বাংলাদেশই বায়ুদূষণের সাক্ষাৎ নরকে পরিণত হয়েছে। দেশের বাতাসে দূষণ প্রতিদিনই বাড়ছে। আর রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুর শহর। এই দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ধুলা। নগরের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই ধুলা হয়ে উঠেছে নিত্যসঙ্গী। ঢাকার পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে একযোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পরিবেশ অধিদফতরের এক গবেষণা প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে এ-সম্পর্কিত ভয়ঙ্কর চিত্র। এতে বলা হয়েছে, শুধু বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে ২৭ ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছে। দেশে পরিবেশদূষণের ক্ষেত্রে মহীরুহ হয়ে বিরাজ করছে ইটভাটা। শিল্পায়ন ও যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ দূষণের ক্ষেত্র আরও বাড়িয়েছে। নরওয়ের ইনস্টিটিউট ফর এয়ার রিসার্চের সহযোগিতায় পরিবেশ অধিদফতর পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ, রাস্তার ধুলামাটি ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ৭ শতাংশ দায়ী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা শহরের বাতাসে বস্তুকণাজনিত দূষণ বেড়ে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শীতকালে উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ায় ধুলাবালির প্রকোপও বাড়ে।
বায়ুদূষণ রোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আধুনিক ইটভাটা নির্মাণের ওপর। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ, যানজট কমিয়ে জ্বালানি অপচয় হ্রাস, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মনিটরিং জোরদার করা, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও মজুদের সময় ঢেকে রাখা, নির্মাণকাজের সময় পানি ছিটানো, রাস্তা খুঁড়ে মাটি শুকানোর আগে পানি ছিটানো, রাস্তা পরিষ্কারে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার, রাস্তার পাশে প্রচুর গাছ লাগানো এবং যেখানে-সেখানে আবর্জনায় আগুন না লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বায়ুদূষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। বায়ুদূষণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। চলতি বছর বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ এবং ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট যৌথভাবে আয়োজিত এক সেমিনারের বিশেষজ্ঞরা এই মত পোষণ করেন।
ঐ সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্ট সিস্টেম অ্যানালিস্ট জোসেফ ম্যাকেনটায়ার ও কানাডার ড. স্টিভেন জোনস। তারা বলেন, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে বায়ুদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটারের উপস্থিতি ১৭২ মাইক্রোগ্রাম। বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মানদ- অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার ২ দশমিক ৫-এর উপস্থিতি ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। ম্যাকেনটায়ার ও জোনস আরও বলেন, অন্যদিকে লালবাগের বি সি দাশ সড়কে মূলত অযান্ত্রিক যান চলাচল করে এবং বায়ুদূষণের মাত্রা কম। এখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার ২ দশমিক ৫-এর উপস্থিতি ৪০ মাইক্রোগ্রাম। সংস্থাগুলোর উদ্যোগে রাজধানীর ১২টি স্থানে বায়ুর মান যাচাই, যানবাহন গণনা ও পর্যবেক্ষণ করে তৈরি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, যান্ত্রিক যানের আধিক্য বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের অধীনে নির্মল বায়ু আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহযোগিতায় খসড়া প্রণয়নের কাজ করছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, পিএম ২.৫-এর নিরাপদ কিংবা সহনীয় মাত্রা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায়নি। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ ও হৃদ্রোগের পরিমাণ বাড়ায়। পিএম ২.৫-এর কারণে অ্যাজমা ও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োগ করার মতো কোনো আইন বা বিধি না থাকায় যারা বায়ুদূষণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। নির্মল বায়ু আইনে প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনা তিনটি বিষয়ই থাকতে হবে। বায়ুদূষণ রোধে আইন এবং ওই আইনের বিধি প্রণয়ন করতে হবে। বায়ুদূষণ পরিস্থিতি যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা রোধে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে একটি বিধিমালা করা হলে দ্রুত বায়ুদূষণ রোধ করা যাবে বলে তিনি মনে করেন।
বায়ুদূষণের কারণে ১০ বছর পরে সঙ্গে অক্সিজেনের বোতল নিয়ে ঘুরতে হবে বলে মন্তব্য করেন বেসরকারি পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীণ ভয়েসের আলমগীর কবির। তিনি বলেন, ‘বায়ুদূষণ রোধে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। বায়ুদূষণের যে পরিস্থিতি উদ্যোগ না নিলে ১০ বছর পরে দুটি বোতল সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে। একটি পানির আর একটি অক্সিজেনের।
নির্মল বায়ু আইনের ক্ষেত্রে এটির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটি নির্ধারণ কঠিন হবে বলে মনে করেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি ঐ সেমিনারে বলেছিলেন, ‘আইন করা হলো কিন্তু সেটি কেউ মানছে না এমনটি হলে হবে না। জনগণকে বায়ুদূষণ রোধ কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব বলেন, আইন প্রণয়নের আগে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি, প্রাপ্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির অভাব এবং পারস্পরিক দোষারোপের কারণে অনেক আইন থাকলেও সুফল পাওয়া যায় না। আইন প্রণয়নের আগে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
 শোচনীয় বায়ুদূষণ: যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর প্রতিবেদনে বিশ্বের দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের যে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতাস দূষিত এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত এক যুগে ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব বিশেষজ্ঞদের মত।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ঢাকার আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এসব ইটভাটা বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এসব ইটভাটা। ইটভাটাগুলোতে বেআইনিভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে দূষিত হচ্ছে বায়ু। ছাড়পত্রবিহীন এসব ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সে অর্থে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন বলছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মোট পরিমাণ চীন ও ভারতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তবে বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে দ্রুত বায়ুদূষণ বাড়ছে, তার মধ্যে অবশ্যই বাংলাদেশ প্রথম সারিতে থাকবে। অধ্যাপক আবদুস সালাম ১০ বছর ধরে ঢাকা ও বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী মূলত যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া ও ধুলা থেকে বাতাসে ক্ষুদ্র কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে। মূলত কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি হয়। ইটভাটা, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং সড়ক ও ভবন নির্মাণসামগ্রী থেকে তৈরি ধুলায় এগুলো সৃষ্টি হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ