সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

'চরিত্রহীন' বলে কেউ নেই কিছু নেই

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : অভিধান ও কোষশাস্ত্রে 'চরিত্রহীন' শব্দটা এসেছে বটে। তবে এর কোনও প্রয়োজন ছিল না। অভিধান ইত্যাদিতে এ শব্দ ব্যবহৃত না হলে ঝামেলাও হতো না। অভিধান ও কোষশাস্ত্রের সংগ্রাহক বা সংকলকরা এ শব্দটিকে পাত্তা না দিলে উদ্ভূত সমস্যার সৃষ্টি হবার কথা ছিল না।
মানুষ থেকে শুরু করে জীবজন্তু, কঠিন, তরল ও বায়বীয় পদার্থসমূহের প্রত্যেকটির চরিত্র বিদ্যমান। অর্থাৎ চরিত্রছাড়া কেউ নেই। কোনওকিছু নেই। সবার এবং সবকিছুর চরিত্র যখন আছেই, তখন 'চরিত্রহীন' এর মতো অপ্রয়োজনীয়, ফালতু ও ফেলনা শব্দের অস্তিত্বই দরকার ছিল না।
'চরিত্র' শব্দের অর্থ হচ্ছে: বৈশিষ্ট্য, স্বভাব, আচরণ, ধর্ম ইত্যাদি। বলুন এসব গুণ কার নেই? প্রত্যেক মানুষের যেমন এ গুণাবলী আছে, তেমনই জীবজন্তু বা পদার্থসমূহেরও এগুলো আছে। অতএব 'চরিত্রহীন' বলে কেউ নেই। কিছু নেই। থাকে না। থাকতে পারে না। 'চরিত্রহীন' শব্দটাই অর্থহীন। অনর্থক। ঝামেলাপূর্ণ। বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে শব্দটি কখনও কখনও। তাই অভিধান ও কোষশাস্ত্রে এ শব্দের ব্যবহারই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।
সারমেয় বলে চতুষ্পদ একটি প্রাণি আছে। ইউরোপীয় ও মার্কিন সাহেবদের কাছে এটি খুব প্রিয়। বহু ডলার-পাউন্ড ব্যয় করে এ প্রাণিটি পোষেন তাঁরা। পোষ মানলে এটি খুব প্রভুভক্ত হয়। এ প্রাণিটিও চরিত্রহীন নয়। পোষ মানা, প্রভুভক্তি এসব স্বভাব বা চরিত্র আছে বলে এ প্রাণিটিও চরিত্রবান। কিন্তু চরিত্রহীন নয় মোটেও।
পানির চরিত্র আছে। নিচের দিকে গড়ায়। মানুষ ও প্রাণির তেষ্টা মেটায়। জ্বাল দিলে বাষ্প হয়ে উবে যায়। বেশি ঠাণ্ডা হলে বরফ হয়। এসবই হচ্ছে পানির চরিত্র। বিজ্ঞানের ভাষায় পানির এসব অবস্থানকে ধর্ম বলা হয়। আসলে এগুলো পানির স্বভাব বা চরিত্রই। তবে পানি দূষিত হয়। ঘোলা হয়। শুকিয়েও যায়। অর্থাৎ চরিত্র বা স্বভাব পাল্টে যায়। তখন কি পানিকে 'চরিত্রহীন' বলা সমীচীন হবে? নিশ্চয়ই না। আসলে পানির এগুলোও চরিত্র বা স্বভাব।
বাতাসের চরিত্র প্রবাহিত হওয়া। উষ্ণতা ও শীতলতা ছড়িয়ে দেয়া। আবার বাতাস থেকে ঝড় সৃষ্টি হতে পারে। এ বাতাসই মানুষ ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে কখনওসখনও। তখন কি বাতাসকে চরিত্রহীন বলে কেউ? না। এটাও বাতাসের চরিত্র। ধর্ম। স্বভাব বা অবস্থা।
ছাগলের কি চরিত্র নেই কেউ বলতে চান? অবশ্যই আছে। ছাগলে সবকিছু খায়। ক্ষুদা পেলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে। ছাড়া পেলে এদিকওদিক ছোটে। অন্যের ফসল খেয়ে সাবাড় করতে পারে। এটাকে 'ছাগলচরিত্র' বলতে পারেন। তবে 'চরিত্রহীন' বলতে পারেন না। আর এ চরিত্র দোষের কিছু না। এমন চরিত্রকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখাও ঠিক না। ছাগলের চরিত্রই এরকম হয়। এটা ছাগলের স্বভাব। অন্তত এটা কোনও 'অভাব' নয়। বরং প্রাচুর্য।
ওপরের আলোচনায় এটা স্পষ্ট বোঝা গেল যে মানব, দানব, জন্তুজানোয়ার এমনকি বস্তুও চরিত্রহীন নয়। সবকিছুই 'সচরিত্র' অর্থাৎ চরিত্রবান কিংবা চরিত্রবতী। চরিত্র প্রধানত দ্বিবিধ। সচ্চরিত্র এবং অসচ্চরিত্র বা দুশ্চরিত্র। তবে এর মাঝামাঝি যারা তারা দ্বিচরিত্র বা উভচরিত্র। স্ত্রীলিঙ্গে দ্বিচারিণী। অনেকে দ্বিচারিণীকেই 'চরিত্রহীনা' বলে আখ্যায়িত করেন। কাউকে বা কোনওকিছুকে 'চরিত্রহীন' বলতে অন্তত আমি নারাজ। এর কারণ হচ্ছে, সৃষ্টিজগতের কোনওকিছুই চরিত্রহীন নয়। খারাপ চরিত্রও একরকম চরিত্র। বলা যায়, উল্টো চরিত্র। অনাকাঙ্ক্ষিত চরিত্র।
এক্ট-রিএক্ট করে না এমন কোনও বস্তু বা প্রাণি আছে নাকি কোথাও? আগুন, পানি, কীট-পতঙ্গ, পশু-পাখি সবইতো এক্ট করে। রিএক্টও করে। চরিত্র মানে আচরণ, স্বভাব, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। এটা কার নেই। পানিতে ঢিল মারলে একটা শব্দ হবে। পানি নড়ে উঠবে। ক্ষুদ্র হলেও ঢেউ বা তরঙ্গের সৃষ্টি হবে। এটা পানির চরিত্র। এটাকে পানির ধর্মও বলেন বিজ্ঞানীরা। এখানে ধর্মের আরেক অর্থ হলো চরিত্র বা স্বভাব। তাই না?
আসলে 'চরিত্রহীন' শব্দটাকে বাংলাভাষায় গালি মনে করা হয়। অথচ শাব্দিক অর্থ তেমন নয়। যাকে উদ্দেশ করে এ শব্দ বলা হয় তিনি খুব রুষ্ট হন। অসম্মান বোধ করেন। সেটা যদি প্রকাশ্যে অর্থাৎ সভা-সমাবেশে কিংবা কোনও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় হয়, তাহলে আরও ভয়াবহ হতে পারে। এমন গালমন্দ কেন্দ্র করে খুনোখুনি এমনকি কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত গড়ায়। অথচ শব্দটির প্রয়োগই ভুল। এটা অর্থহীন শব্দ। এই যে, 'অর্থহীন'। এর মানে কী? যার কোনও অর্থ বা মানে নেই। নিরর্থক। তাই না? তাহলে 'চরিত্রহীন' মানেও যার চরিত্র নেই। কিন্তু পৃথিবীতে চরিত্র নেই, এমন কোনও প্রাণি বা বস্তু বলে কিছু আছে নাকি? নেই।
আরবি 'আখলাক' মানে হচ্ছে যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম। ইসমে তাফজিলের সিগা। এর উল্টোটাও থাকে। অর্থাৎ নিকৃষ্ট চরিত্রেরও হয় কেউ কেউ। স্বভাব, আচার-আচরণ, ব্যবহার, লেনদেন, চলাফেরা, কথাবার্তা, মানুষের সঙ্গে ওঠবসেও কেউ কেউ নিম্নমানের হতে পারে। কিন্তু চরিত্রহীন নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণসম্পন্ন হতে পারে। খারাপ স্বভাব, ব্যবহার এসবও মানুষের চরিত্র। কাজেই মানুষ চরিত্রহীন কী করে হয়?
চরিত্র সাধারণত দুই প্রকার। আগেও উল্লেখ করেছি। সচ্চরিত্র এবং অসচ্চরিত্র। ইতিবাচক ও নেতিবাচক। ইতিবাচক চরিত্র সবার পছন্দ। কিন্তু নেতিবাচক চরিত্র সবার পছন্দ নাও হতে পারে। তবে নেতিবাচক চরিত্রের লোককে নেতিবাচক চরিত্রের লোকই পছন্দ করে। ঐ যে কথায় বলে না, 'চোরেচোরে মাসতুতো ভাই।' ঐরকম আর কী। চোরচরিত্রের লোককে চোরচরিত্রের লোকই পছন্দ করে। কারণ, চোরের কাছে চোরই যায়। ডাকাত ডাকাতকেই পছন্দ করে। ভালোবাসে। ডাকাতের সঙ্গে ডাকাতেরই ভালো সম্পর্ক থাকে। ওঠবস হয়। 'শঠে শঠাং সমাচারেত'। শঠের সম্পর্ক শঠের সঙ্গেই হয়। ওঠবস চলে। তবে শঠ বা ঠকবাজেরও চরিত্র আছে। মানে ঠকও চরিত্রহীন নয়। তবে সেটা ইতিবাচক নয়। নেতিবাচক। কাক্সিক্ষত নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত । ঠকের চরিত্র ভালো লোক কেউ পছন্দ করে না। ভালোও বাসে না। তাই ঠকবাজ বা ধোঁকাবাজকে কেউ ভালো বলে না। পছন্দও করে না।
অতএব 'চরিত্রহীন' কেউ নয়। অর্থাৎ সবাই 'সচ্চরিত্র' বা 'সুচরিত্র' না হোক; 'সচরিত্র' বটে। অন্তত মানুষের চরিত্র থাকবেই। থাকতেই হবে। সেটা ভালো হতে পারে। আবার মন্দও হতে পারে। তবে চরিত্র থাকতেই হবে। চরিত্র ছাড়া মানুষ হতে পারে না। হয়ও না। তাই কাউকে 'চরিত্রহীন' বলা মানে ভাষাগত দৈন্য ও নিচতার বহিঃপ্রকাশ। মুখফসকেউ কাউকে 'চরিত্রহীন' বলা সমীচীন নয়। কারুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে বা প্রশ্নে কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারেন। তবে সে ক্ষোভ সহসা প্রকাশ করা যেমন উচিত নয়, তেমনই যে যেমনটা নয় তেমনটা তাকে বলাও বিবেচনাপ্রসূত হতে পারে না। বললে অনর্থক ঝামেলা ঘটতে পারে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনকি কোর্ট-কাচারিও বাদ যায় না। আর যারা এসব ঘটাতে চান তারা তো সুযোগের সন্ধানই করেন। সুযোগ পেলে তাঁরা তো তার সদ্ব্যবহার করবেনই। সম্প্রতি এক টিভি চ্যানেলে 'চরিত্রহীন' বলা নিয়ে ঘটনাতো এমনই ঘটেছে। অথচ পৃথিবীতে 'চরিত্রহীন' বলে কেউ নেই। কিছু নেই। থাকে না। থাকতে পারে না। এটাই সত্য এবং শাশ্বত। তাই অভিধান ও কোষশাস্ত্র থেকে এমন বিপজ্জনক ও ঝামেলাপূর্ণ শব্দ মুছে ফেলাই উত্তম কাজ হতে পারে। ভাষাবিজ্ঞানীরা আমার এ প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারেন বৈকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ