শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ইতিহাসের সাক্ষী তিব্বতের অভ্যুত্থান

১৯৫৯ সালের ১০ মার্চ শুরু হয়েছিল তিব্বতে চীনা দখলদারির বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান। তার পরিণতিতে দালাইলামা এবং হাজার হাজার তিব্বতীকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত পালাতে হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থানের সময় লাসায় তিব্বতীদের প্রতিরক্ষার আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন নাওয়াং টংডক নাকেট। ১০ই মার্চ ভোরবেলা। নাওয়াং টংডক নাকেট যাচ্ছেন নবলিংকায় দালাইলামার বাসভবনে, তাকে দেখা দেথা করার জন্য ডাক পাঠিয়েছেন তিব্বতীদের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু।
তিনি দেখলেন, নবলিংকার পথে চলেছেন আরো হাজার হাজার লোক। তারা শ্লোগান দিচ্ছেন, “চীনারা চীনে ফিরে যাও। আমাদের চীনাদের কোন দরকার নেই।”
নাকেট ছিলেন দালাইলামার নেতৃত্বাধীন কাউন্সিলের একজন সদস্য। সেদিনই দালাইলামাকে চীনাদের প্রধান ঘাঁটিতে একটি নাটক দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু তাকে বলা হয়েছে দেহরক্ষী নিয়ে না আসতে। তিব্বতীরা সন্দেহ করলেন - হয়তো এটা তাকে আটক করার জন্য পাতা একটা ফাঁদ।
দালাইলামা সবাইকে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি নাকেটকে লাসায় ফেরত পাঠিয়ে দিলেন, আর বলে দিলেন, চীন যদি কোনভাবে লাসার বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়- তাহলে তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে।
লাসা শহরে দোকানপাট বন্ধ, রাস্তা ফাঁকা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো চীনাদের দখলে। নাকেট এবং তার সাথীরা চীনা সামরিক অভিযান ঠেকানোর ব্যবস্থা গড়ে তুললেন। তারা বুঝতে পারছিলেন, আক্রমণ অবধারিত।
কয়েকদিন ধরে একটা অচলাবস্থা চললো। এরই মধ্যে দালাইলামা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেলেন। ১৯ তারিখ এ খবর জানার পর চীনারা গুলী চালাতে শুরু করলো এবং তখনই সত্যিকার অর্থে শুরু হয়ে গেল তিব্বতীদের অভ্যুত্থান। চীনা বাহিনীর গুলীবর্ষণে বহু লোক নিহত হলো।
নাকেট তার চোখের সামনেই একটি হত্যাকান্ড দেখলেন। পরে তিনি নিজে দীর্ঘদিন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটালেন। চীনের সবকিছুই তখন নাকেট ঘৃণা করতেন। যদিও পরে ধীরে ধীরে তার সেই মনোভাবের পরিবর্তন হয়। চীনের কমিউনিস্ট সরকার যুক্তি দিতো যে তিব্বতের পশ্চাৎপদ সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতির কারণে দরিদ্র তিব্বতীরা নিগৃহীত হচ্ছে, এবং তাদেরকে মুক্ত করা দরকার। কিন্তু স্বাধীনচেতা তিব্বতীরা চীনকে দেখতো দখলদার হিসেবে- যারা তিব্বতের সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি হুমকি। প্রফেসর নাওয়াং টংডক নাকেট পরে তিব্বতের নির্বাসিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন দালাইলামার সরকারি জীবনীকার। তার বয়স এখন ৮৬ এবং এখনো তিনি শিক্ষকতা ও বক্তৃতার জন্য পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমণ করেন।
তিব্বতের দালাইলামার ব্যক্তিগত জীবন কেমন?
তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামাকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। নির্বাসিত এ ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত জীবন আসলে কেমন ? ভারতীয় ফটোসাংবাদিক রাঘু রাই-এর একটি নতুন বই এসেছে বাজারে যেখনে তিনি অনেকটা নজিরবিহীন ভাবে তুলে ধরেছেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন আধ্যাত্মিক নেতার জীবন।  লোকচক্ষুর অন্তরালে কিভাবে কাটে দালাইলামার সময় কিংবা ঘরে বাইরে কি করে সময় কাটান তিনি তার সবকিছুই উঠে এসেছে এ বইতে।
অ্যা গড ইন এক্সাইল- বা নির্বাসনে একজন ঈশ্বর নামক এই বইতে আসলে ফটোসংবাদিকের অন্তদৃষ্টিতে দেখা দালাইলামার প্র্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মি. রাই তিব্বতের এই ধর্মীয় নেতার ছবি প্রথম তুলেছিলেন ১৯৭৫ সালে।   সে ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, কিভাবে যেন আমি তাঁর (দালাইলামা) সাথে দৃষ্টি বিনিময়ের সুযোগ করে ফেললাম এবং তাকে বললাম যে তাঁর কিছু ছবি তুলতে পারি কি-না। তিনি হাসলেন এবং বললেন, হ্যাঁ।”
এরপর তিনি দালাইলামার ছবি তুলেছেন বহুবার এবং গড়ে তুলেছেন এক ‘গভীর বন্ধুত্ব’।
১৯৫৯ সালের মার্চে চীনা সেনাবাহিনীর হামলার মুখে ভারতে পালিয়ে এসেছিলেন দালাইলামা, তখন তিনি বিশের কোঠায় থাকা এক তরুণ।  পরে ভারত সরকার তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং তিনি আবাস গড়েন উত্তরাঞ্চলীয় শহর ধর্মশালায়।  তাকে অনুসরণ করে নির্বাসনে আসে তিব্বতের প্রায় ৮০,০০০ মানুষ এবং তারা একই শহরে বসবাস শুরু করে।  মি. রাই বলছেন, “যখন তিনি তিব্বতের কারও দিকে তাকান। তখন তাঁর চোখ দেখা উচিত। মনে হবে দাদু তার নাতি বা নাতনীকে আদর করছেন।
২০১৪ সালে মি. রাই নিজের তোলা দালাইলামার ছবি নিয়ে একটি বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন।  এসব ছবির বেশিরভাগই তোলা হয়েছে দালাইলামা যখন নিজের মতো করে একান্তে সময় কাটাচ্ছিলেন তখন।
এসব ছবি দেখে অনেকেই তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের একটি ধারণা পাবে।
রুঘু রাই বলছেন, তিনি প্রাণীর সাথে খেলতে ভালোবাসেন। একদিন আমি তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন হঠাৎ তার সাথে একটি বিড়াল দেখতে পাই”।
ধর্মশালায় ২০১৫ সালে দালাইলামার ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানের ছবিও তোলেন মি. রাই।  সেখানে দালাইলামার বড় ভাইও এসেছিলো এবং তাকে কৌতুক করে তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ‘ট্রাবলমেকার বা সমস্যা সৃষ্টিকারী’ হিসেবে।  রাঘু রাইয়ের তোলা কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে দালাইলামা নিজের টেলিভিশন ঠিক করছেন কিংবা বাড়িতে বাগানের কাজ করছেন, আর এসব তিনি নিজের হাতে করতেই পছন্দ করেন। বিবিসি বাংলা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ