শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

সংসদে কালাকানুন  পাসের হিড়িক চলছে --- বিএনপি

 

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদে বিনা ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা কালাকানুন পাসের হিড়িক চলছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে ভোটারবিহীন সংসদ সদস্যদের এখন পর্যন্ত ২৩টি অধিবেশন বসেছে এর মধ্যে প্রায় দুই শত আইন পাস করেছে তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে নিরঙ্কুশ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই এ গণবিরোধী খারাপ আইনগুলো পাস করিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

গতকাল  বহস্পতিবার সকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে রিজভী এসব কথা বলেন। সেইসাথে দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের নির্যাতন ও নিপীড়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলন হয়।

লিখিত বক্তব্যে রিজভী বলেন, অষ্টাদশ শতকের প্রখ্যাত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ান, বাগ্মি, তাত্ত্বিক এডমন্ড বার্ক বলেছেন, আসলেই কালো আইন জনগণের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচারের ন্যায়। গত অধিবেশনেও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের কণ্ঠরোধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সর্বোচ্চসংখ্যক ১৮টি আইন পাস করা হয়েছে। চলতি অধিবেশনেও চলছে নতুন নতুন আইন পাসের তোড়জোড়। মানুষ এখন নিজের ছায়াকে দেখলেই ভয় পায়। ঘুমের ঘোরের কথাতেও আঁতকে ওঠে।

তিনি গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আরো আইন পাসের জন্য সংসদের চলতি অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। দেশের রাজনীতিসহ গোটা দেশকে কব্জায় নিতে অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এত কালো আইন পাস করে রেকর্ড গড়তে চলেছেন। তাই তিনি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব তুলেছেন যা, চলতি সংসদে পাস করতে তোড়তোড় চলছে। এর পেছনে যে চূড়ান্ত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তা জাতির সামনে পরিষ্কার। শেখ হাসিনা পিতার সৃষ্টি বাকশালকে ব্যর্থ হতে দিতে চান না। তাই ভিন্ন কায়দায়, ভিন্ন পন্থায় মৃত বাকশালকে জীবিত করতে অমৃতপান করানো হচ্ছে এ সমস্ত কালো আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। আইনের মারপ্যাঁচে মূলতঃ তিনি দেশে একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটাচ্ছেন। একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ছাড়া দেশে অন্য কারো নেতৃত্ব থাকবে সেটা তিনি মানতে পারছেন না। সংসদে বিরোধী দলও থাকবে তবে সেটি হবে গৃহপালিত, শেখ হাসিনার আদরের ধন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, শেখ হাসিনা যত দিন ক্ষমতায় আছেন ততদিন গণবিরোধী কাজের সমালোচনাও করা যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না, ব্যাংক লুটের কথা বলা যাবে না, অপকর্মের কথা বলা যাবে না, গুম ও গুপ্ত হত্যার কথা বলা যাবে না। গত দুদিন আগে তিনি বলেছেন, ৪০টি টেলিভিশন আমি দিয়েছি অথচ তাদের দিয়ে সবচেয়ে ভুক্তভোগি আমরা। বিশ্ব যেখানে এগিয়ে চলছে সেখানে গণমাধ্যম এগিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি কি গণমাধ্যম দেয়াকে কি ব্যক্তিগত সম্পদ দেয়ার মতো মনে করছেন যে, তিনি তার নিজস্ব গোডাউন থেকে টেলিভিশন চ্যানেল সরবরাহ করেছেন। অর্থাৎ তিনি টেলিভিশন দিয়েছেন দলীয় চেতনার মানুষদের শুধু তার গুণগান করার জন্য। সেখানে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছেন। এটিই হচ্ছে গণতন্ত্র বিরোধী বাকশালী চেতনা।

রিজভী বলেন, এই বিশ্বায়নের যুগে তো কোনো অপকর্ম, অপকীর্তি ঢেকে রাখা যাবে না। এখন নর্থপোল থেকে সাউথপোলের খবর এক ক্লিকেই সব জানা যায়। তাই যতই কালাকানুন করুন না কেন, মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এ তথ্যপ্রযুক্তির উৎর্কষতার যুগে অনিয়ম, দুর্নীতি, অপকর্ম ঢেকে রাখা যাবে না। গণ-প্রচারযন্ত্র কায়েমি স্বার্থে ব্যবহার করার দিন শেষ হয়ে গেছে। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে আবারো আহবান জানাচ্ছি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে দিন। জাতীয় সম্প্রচার নীতি-২০১৮ এর মতো একের পর এক জঘন্য কালাকানুন তৈরি থেকে সরে আসুন।

‘যদি জনগণ ভোট দেয় আমরা আবার ক্ষমতায় আসতে পারি তাহলে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করা হবে’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে আবারো প্রমাণিত হলো তার মন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ভরা। উনি রাষ্ট্রক্ষমতা আটকে রেখেছেন জনগণের কল্যাণে নয়, শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করাটাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, আইনি ব্যবস্থায় প্রতারণামূলক নীতি কার্যকর আছে কেবল ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে। সুতরাং সেটিরই প্রতিফলন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। সেজন্য তিনি যা ইচ্ছা তাই করার হুমকি দেন। আপনারা আরো দেখেছেন শুধু ন্যায্য ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরির মতো বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার হিড়িক চলছে।

গতকাল (বুধবার)তার বিরুদ্ধে চুরির মামলাও দায়ের করা হয়েছে। কতটা অসংস্কৃত ও হিংস্রের আচরণ করা যায় তার সবটাই প্রয়োগ করা হচ্ছে গণতন্ত্রকামী মানুষদের ওপর। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরির মতো একজন খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা, মানবধিকার কর্মীরাও আজ সরকারের সহিংস আচরণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। তবে আমরা সুস্পষ্টভাবে বলে রাখি জনগণের এজলাসে বিচারের মুখোমুখি হতে ক্ষমতাসীনরা যেন প্রস্তুত থাকে।

 দেশব্যাপী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, কুমিল্লার মুরাদ নগরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ছোবলে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষতবিক্ষত। মুরাদনগর যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মাসুদ রানাকে আটক করে শারীরিকভাবে প্রচন্ড নির্যাতন করার পর প্রথমে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ কমপ্লেক্সে ভর্তি করানোর পর অবস্থা গুরুতর হলে কুমিল্লা শহরে হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। কুমিল্লা (উত্তর) স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা তার সহকর্মী মাসুদ রানাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখতে গেলে তাকেও চরম নির্যাতন করা হয়। মুরাদনগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বাদশাকে গ্রেফতার করে তার ওপর চরম নির্যাতন করা হয়।

তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে সিলেটে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভাকে কেন্দ্র করে এলাকায় এলাকায় চিরুনী অভিযান চলে। বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশির নামে সরকারি হানাদারি তীব্র আকার ধারণ করে। জনসভায় যোগ দিতে আসা মানুষদের শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আটকে দিয়ে সরকারি দলের পান্ডারা পুলিশের সহযোগিতায় তাদেরকে বেধড়ক মারধর করে। সিলেট মহানগর ছাত্রদলের নেতা আবদুল খালেক মিল্টন, আবু ইয়ামিন ও সুমনকে গ্রেফতার করেছে।

গত মঙ্গলবার সিলেট মহানগরের সাবেক আহবায়ক ডাঃ শাহরিয়ারসহ ১৪জন বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের পর শাহরিয়ারসহ ১জনকে ছেড়ে দিলেও ১২জনকে কারাগারে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। লালমনিরহাটে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের এস কে হারুন অর রশিদ কল্লোল, যুবদলের আশাফুলসহ ৩ জনের অধিক, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা কলেজের ভিপি সেলিম, কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা অন্তু, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা বিএনপির ৪ জনের অধিক, ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু বিএনপির এমদাদ, মিন্টু মালিধা, কালীগঞ্জ বিএনপির নেতা মফিজুর রহমান, হাফিজুর রহমান, রাশেদ ও যুবদলের সভাপতি রবিউল ইসলাম, চট্টগ্রামে জেলা বিএনপি নেতা আবু সাঈদ চৌধুরী ও আউয়াল চৌধুরীসহ মোট ১৮ জন নেতাকর্মী।

 মেহেরপুরের মুজিব নগর উপজেলা বিএনপির রায়হানুল কবিরসহ মোট ২৬ জন, শেরপুর জেলা বিএনপির সদস্য ক্রিসেন্ট এবং শ্রীবর্দী উপজেলা ছাত্রদলের মোঃ কোরবান আলী, চট্টগ্রাম জেলা জাসাসের আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, শহিদুল ইসলাম চৌধুরী, মঞ্জুরুল হক বাহার, আব্দুর রহিম বাবলু, ওলামা দলের মাইনুদ্দিন মনি, বিএনপি নেতা মানিক, মহিউদ্দিন, ছাত্রদলের মাসুম বিল্লাহ, আরব-আমিরাত জাতীয়তাবাদী ফোরামের নূরুন্নবী করিম বাবলু, যুবদলের জাফর, শাওন, বাবলু, ছাত্রদলের নাজিম ও জেলা বিএনপির অফিস সহকারী কাশেমকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাঞ্ছারামপুরে ছাত্রদলের ওমর ফারুক, মোশারফ হোসেন, সোহেল আরমান, আব্দুল্লাহ আল-মামুন, আনোয়ার হোসেন, ইব্রাহিম, ফাহাদ, আব্দুল্লাহ, ইব্রাহিম, বিল্লবসহ মোট ২২ জন উপজেলা ছাত্রদলের নেতা নেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব  সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, শিশু বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সহসম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, দপ্তর সহ সম্পাদক মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইফুল ইসলাম পটু প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ