রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

তাসনিয়ার স্বপ্ন

মোহাম্মদ অয়েজুল হক : হঠাৎ দুপুরবেলা আবদার, আম্মু চলো না ঘুরতে যাই। নিপার রাগ হয়। এইভর দুপুরে কেউ ঘুরতে যায়! এই গরম আর বৃষ্টির দিন। এই বৃষ্টি এই রোদ। গরম আর ঠান্ডা মিলিয়ে অনেক মানুষ জ্বর-জারিতে ভুগছে। পাশের এলাকা নদী ভাঙ্গন আর বন্যায় ডুবে গেছে। নদী ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া অসহায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উঁচু রাস্তায়। স্কুলের বারান্দায়। সেখানেই তাদের অস্থায়ী ঘরবাড়ি। এক প্রকার সিজিনালও বলা চলে। প্রতি বছর বন্যা হচ্ছে, নদী ভাঙ্গছে। মানুষ কে আপন ঘরবাড়ি ফেলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। তাসনিয়া আহ্লাদী সুরে আবার বলে, আম্মু চল চলো না।

-কোথায় যাবে?

-পানি দেখতে। জানো ইলিন আপুদের বাড়ির পাশে যে স্কুল আছেনা?

-হ্যাঁ।

-সে স্কুলে অনেক মানুষ এসেছে। ওরা নাকি খুব গরিব। মানুষের কাছে খাবার চায়। চলো না আম্মু। তোমার কাছে তো টাকা আছে। কিছু টাকা দেবে। ওরা তো গরিব। খেতে পারে না। 

নিপা মেয়ের দিকে তাকায়। পাঁচ বছর বয়স। গোলগাল মায়া ছোঁয়া মুখের এক শিশু।

-আচ্ছা তোমার আব্বু আসলে নিয়ে যেতে বলবো।

-না, আম্মু এখন চলো। আব্বু তো রাত করে আসে। 

ভ্যাপসা গরমে তাসনিয়ার একগুঁয়েমি, গা হাত-পা ধরে ঝোলাঝুলি তে রাগ লাগে। বড় হলে একটা থাপ্পড় দেয়া যেত। আদর করে বলে, সোনাপাখি এমন করতে হয়না।

-আমি পাখি?

- হ্যাঁ, আমার পাখি।

-আমি যে উড়তে পারি না। 

-পারবে, একটু বড় হও। তখন পারবে।

-আব্বু তো বড় মানুষ। উড়তে পারে কই? 

নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলে নিপা। তাসনিয়াও হাসে। খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে, আমি পাখি। আমার ডানা কই। আমি কি পাখি আম্মু?

-দুষ্টু মেয়ে, ভাত খেয়ে ঘুমাবে। চলো। 

খাওয়া দাওয়া শেষে মায়ের সাথে ঘুমাতে যাবার সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। 

তাসনিয়া দৌড়ে যায়। কচি কন্ঠে বলে, কে?

-আমি, মিম।

বাইরের আওয়াজ শুনেই একদৌড়ে নিপার কাছে ছুটে আসে। আম্মু ম্যাডাম এসেছে। চেহারায় আতংকের ছাপ। সন্ধ্যার পর পড়াতে আসে মিম। বিশেষ কাজ থাকলে মাঝেমধ্যে দুপুর কিংবা বিকালেও আসে। নিপা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। যাও বইখাতা নিয়ে পড়তে বস। অল্প সময়। তারপর ঘুমাবে। তিন কেজি বই খাতা কষ্ট করে টেনেটুনে ম্যাডামের সামনে গিয়ে বসে।

-পড়া হয়েছে? শিক্ষিকার গলায় ধমকের সুর। আজকাল মিম এসেই ধুমকি ধামকি শুরু করছে। প্রথমদিক এমন ছিল না। দিন যতো গড়াচ্ছে, ম্যাডামের ধুমকি ধামকি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নিপা ভাবে, ছোটদের ভালোবাসা দিয়ে পড়াতে হয়। বন্ধুর মতো আচরণ করতে হয়।

- হ্যাঁ। পড়া হয়েছে। ঘাড় নাড়ে তাসনিয়া।

- গুন কি বা কাকে বলে?

কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে। ওর স্বভাবজাত একটা দোষ হলো প্রশ্ন করা হলে কিছু বলতেই হবে। কিছু ঘটনা সে জানে। সেটা বলার পর নিজের মতো করে বাকিটুকু বানিয়ে বলবে। যেটুকু বানিয়ে বলা, সেটা ধরাও সহজ কাজ নয়। বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে মিল করেই বলে। পড়াশোনার বেলা তার কেরামতি কাজ করছে না।

আবার জোর গলায় শিক্ষিকার প্রশ্ন, চুপ করে আছো কেন? বলো গুন অর্থ কি বা গুন কাকে বলে?

- ম্যাডাম গুন অর্থ ভাগ, ভাগকে গুন বলে।

নিপা হেসে ফেলে। ম্যাডাম হাসে না। কর্কশ গলায় বলে, পড়া না হলে চুপ করে থাকবে। যা ইচ্ছে বলা চলবে না।

জি ম্যাডাম। কাতর কন্ঠ তাসনিয়ার। একঘণ্টা ধুমকি ধামকি শেষে ম্যাডাম চলে যায়। বেরোতে বেরোতে বলে, কাল যদি পড়া না হয় তো বুঝবে তোমার কি দশা করি।

ম্যাডাম চলে যেতেই তাসনিয়ার আরেক আবদার, আম্মু আমি আর এ ম্যাডামের কাছে পড়বো না। শুধু ঝগড়া করে। 

নিপা মেয়েটাকে বুকে টেনে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। 

- শোনো একটু আধটু রাগ না করলে কি তুমি পড়া করবে। পড়া করো না বলেই তো রাগ করে।

- আম্মু আমি যে ম্যাডামকে দেখলে সব ভুলে যাই।

- কেন ভুলে যাও!

- জানি না। আমার খুব ভয় করে।

কথা বলতে বলতে তাসনিয়ার চোখ দুটো ভারী হয়। 

চারিদিক নদীর মতো পানি আর পানি। মানুষ নৌকা নিয়ে এদিকওদিক যাচ্ছে।  কেউকেউ জাল দিয়ে মাছ ধরছে। মাজা পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। একটা বড় শিরিষ গাছের ডালে বসে তাসনিয়া দেখে, দিগন্ত বিস্তৃত পানি। হঠাৎ করে ভাবে সে এখানে এলো কিভাবে! ভাবতে যতটুকু দেরী। তার সামনে এসে দাঁড়ায় অপরূপ সুন্দরী এক মেয়ে। বইয়ে আঁকা ছবির রাজকন্যার  মতো। পিঠে দুটো সোনালি ডানা। রোদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে, আমি তোমাকে নিয়ে এসেছি বন্ধু।

- কে তুমি?

- বা রে, আমাকে চিনতে পারছো না।

- না।

- আমি হলাম মানুষ পাখি।

- আম্মুও তো আমাকে পাখি বলে। 

- ঠিক তো। 

- কিন্তু আমার যে তোমার মতো সোনালী ডানা নেই।

- একটু বড় হও।

- আম্মু তো তাই বলে। আমি কবে বড় হব?

- এই তো দেখতে দেখতেই বড় হয়ে যাবে।

অল্প সময়ের ভেতর মানুষ পাখিটার সাথে গল্পগল্পে খাতির হয়ে যায় তাসনিয়ার। মানুষ পাখিটা খুব ভালো। ম্যাডামের মতো খিটখিটে না। ' তুমি উড়তে পার মানুষ পাখি?'

- হ্যাঁ, পারি। তুমি যাবে মেঘের দেশে?

- হ্যাঁ, যাবো।

মানুষ পাখিটা তাসনিয়া কে নিয়ে উড়াল দেয়। মেঘ পেরিয়ে আরো অনেক দূর.....। আকাশে সাদাকালো মেঘ। বাতাসে ভেসে ভেসে চলে। নিচে শুধু সবুজ আর সবুজ। বাড়িঘর বোঝা যায় না। তাসনিয়া অবাক বিস্ময় নিয়ে বলে, মানুষ পাখি আমরা তো অনেক উপরে চলে এসেছি।

- হুম।

- আচ্ছা তোমার বাড়ি কোথায় মানুষ পাখি?

- স্বপ্নরাজ্যে আমার বাড়ি। সেখান থেকে আমরা আসি।

- ও। সে কি অনেক দূর?

- হ্যাঁ, অনেক দূর। তোমাকে অন্য আরেকদিন নিয়ে যাবো।

- আচ্ছা ঠিক আছে। 

  মেঘের রাজ্যে ঘুরেফিরে মানুষ পাখি তাসনিয়া কে নিয়ে নামতে শুরুকরে। তাসনিয়া আবদার করে, মানুষ পাখি আমাকে বন্যা দেখাবে?

- হ্যাঁ, চলো। 

 ডোবা ডোবা ঘর বাড়ির উপর দিয়ে ওরা উড়ে চলে। কত্তো মানুষের কি অসহায় অবস্থা। উঁচু রাস্তার উপর ঝাঁক ঝাঁক মানুষ। তাসনিয়ার মতো কতো ছোট ছোট শিশু। 

ওরা একটা রাস্তার উপর দাঁড়ায়। সাথে সাথে অনেকগুলো ছোট শিশু দৌড়ে আসে। কাঁদোকাঁদো গলায় তারা বলে, আমাদের কিছু খাবার দাওনা।

তাসনিয়ার খুব কষ্ট হয়। মায়া লাগে। ঘরবাড়ি ফেলে আসা শিশুদের মতো সেও হতে পারতো একজন। 

- দেব। তোমাদের অনেক খাবার এনে দেব।

 মেয়ের স্পষ্ট কথায় অবাক হয় নিপা। মাথায় হাত বুলায়।   কাকে অনেক খাবার দিচ্ছ! 

তাসনিয়া চোখ খোলে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আকাশে কালো কালো মেঘ জমেছে। ঝড়বৃষ্টি হবে! ঝড়বৃষ্টি হলে অসহায় শিশু গুলোর কি হবে! ওদের তো ঘর নেই। বাড়ি নেই। ক্ষুধার্ত। চোখের কোনে জমা হয় আশ্রুবিন্দু। কচি হাতেই চোখ মোছে।

- কি হয়েছে তাসনিয়া? 

- কিছু হয়নি আম্মু।

- কাঁদছো কেন?

তাসনিয়া জবাব না দিয়ে বলে, আব্বু কি এসেছে?

- না। কেন?

তাসনিয়ার কানে বাজে  আর্তনাদ। আমাদের কিছু খাবার দাওনা। মানুষ পাখিটা কি আবার আসবে! অনেক খাবার নিয়ে যেতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ