বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংবিধান পরিপন্থী

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাধীনতার নামে নৈরাজ্য রোধ করতে প্রয়োজন ছিল ব্যাপকভাবে সামাজিক জনসচেতনতা তৈরি করা ও একটি আদর্শ আইন। কিন্তু পাশকৃত আইনে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যেখানে সকল মুক্ত চিন্তা ও কণ্ঠরোধ করে কারাগারে ভর্তি করার সকল বিধি ব্যবস্থাই এ আইনে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে সম্পাদক পরিষদ বেশ কিছু ধারা নিয়ে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।
গতকাল বুধবার সকালে ‘বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন’ এর উদ্যোগে রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ শিশু কল্যাণ পরিষদের কনফারেন্স হলে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্বাধীনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন এইসব কথা বলেন। গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। গোলটেবিল আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বিএনএ’র মহাসচিব ড. মেজর (অবঃ) হাবিবুর রহমান, ন্যাশনাল কংগ্রেস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কাজী ছাব্বির, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম মহাসচিব মনিরুল ইসলাম, লেখক রাজু আহমেদ খান, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা সীমা আক্তার, সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম, প্রচার সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ।
 গোলটেবিল আলোচনায় মুল প্রবন্ধে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সারা বিশ্বেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে হৈ চৈ চলছে, আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০১১ সালে মুঠোফোন ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা থ্রিজি চালুর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক এর প্রসার ঘটতে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্রডব্যান্ড ও মুঠোফোন ভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এদের মধ্যে ফেইসবুক ব্যবহারকারী ২ কোটি ৮৭ লক্ষ। এছাড়া টুইটার, ইউটিউব, হোয়াটস্ আপ, ইমু ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নের পিছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উন্মুক্ত বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাধীনতা ব্যাপক। এই স্বাধীনতা রুখে দেয়া কোন ভাবেই কাম্য নয় বা এ মধ্যমকে বন্ধ করে দেয়াও কোনভাবেই সম্ভব না। যারা এর ব্যবহারকারী তারা ক্ষণিকের জন্য হলেও এ মাধ্যম এর বাইরে যেতে নারাজ। আজ যে কোন সংবাদ দ্রুত প্রচার করতে এ মাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সমাজের ঘটে যাওয়া অনেক খবরই যখন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই হয় একমাত্র ভরসা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আজ অতি সাধারণ ব্যক্তিও তার মনের ভাব ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম মনে করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। এর মাধ্যমে দেশে ই কমার্সের ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ইতিমধ্যে এ খাতে ব্যবসা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগামীতে আরো ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষা খাতে উন্নয়ন ও গবেষণায় ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে, তবে এর কিছু অপব্যবহার এর সুফলকে হার মানিয়েছে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস সর্বকালের রেকড ভঙ্গ করেছে। গত ২০১৭ ভোক্তা অধিকার দিবসে বানিজ্যমন্ত্রী এই বিষয়ে একটি আইন না থাকার বিষয়টি তার দৃষ্টিতে আনি, মন্ত্রীও বর্তমান টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীকে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন, কিন্তু এই কমিটি আজও আলোর মুখ না দেখলেও সরকার প্রযুক্তিখাতে নিরাপত্তার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সংসদে পাশ করেন যাতে রাষ্ট্রপতি গত ৮ অক্টোবর স্বাক্ষর করে বাস্তবায়ন করেন। আমরাও চাই এ খাতে একটি মানসম্পন্ন আইন প্রণয়ন হউক যাতে গ্রাহক স্বার্থ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক খাতে বিশৃঙ্খলা রোধ করা যাবে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল ও এইচআরডাব্লিউসহ টিআইবি এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। অথচ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হওয়ার সাথে সাথে এ আইনে মামলা করার নজিরও শুরু হয়ে গেছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে ১২ ধারায় জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ১৩ সদস্যের যে কমিটি করা হয়েছে তাতে ভোক্তা খাতের ষ্টেক হোল্ডারদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এখানে (৩) উপধারা (১) কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের পরামর্শমত সরকার গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত মেয়াদ বা শর্তে কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে যেমন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস), বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফ্টওয়ার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিস (বেসিস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ন্যাশনাল টেলিকমনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনপিএমসি) বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে গণমাধ্যমের (১জন) জনপ্রতিনিধিকে ইহার সদস্য হিসেবে যে কোন সময় কো-অপট করিতে পারিবে। আমাদের বক্তব্য এখানে ২টি বড় ষ্টেক হোল্ডার টেলিকম অপারেটর ও গ্রাহক প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অথচ মন্ত্রী মহোদয়ের সংগঠনকে ঠিকই রাখা হয়েছে।
আমরা এ আইনের সংস্কার করে প্রযুক্তি খাতের ব্যবহারকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কিছু ধারা সংশোধন করে ও নতুন ধারা সমন্বয় করার পরামর্শ তুলে ধরছি, ১.তথ্য মন্ত্রণালয়ে গঠিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণকারী ৯ সদস্য বিশিষ্ট সেলে গণমাধ্যম ব্যক্তি ও গ্রাহক প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ২. সরকার যদিও বলছে ফেইসবুক, টুইটার, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ ধরনের কোন ধারা ও উপধারা না থাকায় নতুন করে এদেরকে দেশীয় আইনের আওতায় আনতে নতুন ধারা-উপধারা সংযুক্ত করা। ৩. প্রযুক্তি খাতে ব্যবহারকারীদের অধিকার আদায়ের জন্য নতুন ধারা সংযুক্ত করতে হবে। ৪. মুক্ত চিন্তার অধিকারী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও গবেষণা কাজে ব্যবহারকারীদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখতে হবে।
৫.বিনা ওয়ারেন্ট বা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পুলিশের গ্রেফতারী ক্ষমতা প্রত্যাহার করতে হবে। ৬. সামাজিক জনসচেতনতা গড়তে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারনা করতে হবে। সেই সাথে স্কুল কলেজের পাঠ্যপোস্তকে প্রযুক্তিখাতের অপব্যবহার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে ধারনা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ৭. দ্রুত ফেক আইডি সমূহ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, সরকারি চাকরি বিধিমালার নামে সরকারিজীবীদের যেখানে বিনা অনুমতিতে গ্রেফতার করা যাবে না যেখানে সাধারণ জনগণকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে বিনা ওয়ারেন্টে যেকোন সময় জামিন অযোগ্য আইনে গ্রেফতার করার ক্ষমতা পুরোপুরি সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। চলতি সংসদ অধিবেশনের এই আইন হটকারি ধারাসমূহ সংশোধন করতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ক্ষমতায় যারা যান, তারা রঙিন চশমা পড়ে থাকেন। জনগণ কিভাবে বিষয়টি দেখছে তা ক্ষমতাসীনরা দেখেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার যে চেষ্টা তা সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে যাবে। কোন সভ্য দেশে এ ধরনের আইন আছে কি না আমার জানা নাই। তিনজন মন্ত্রী সম্পাদকদের কাছে কথা দিলেও আজ তা আমলে নেয়া হচ্ছে না।
বিএনএ’র মহাসচিব ড. মেজর (অবঃ) হাবিবুর রহমান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের সাথে সকল সেক্টরের আরও দেনদরবার করা উচিত। সঠিক সিদ্ধান্ত সরকারকে বুঝাতে হবে। তিনি, জনসচেতনতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ