রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্যাংকারদের যোগসাজশে ঋণ পরিশোধ করছেন না গ্রাহকরা

এইচ এম আকতার : রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক থেকে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। ঋণ নিতে যেমন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার হয় তেমনি পরিশোধের ক্ষেত্রেও এ পরিচয় দিয়ে বেঁচে যান। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে ঋণ নিলে আর পরিশোধ করতে হয়নি। ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। খেলাপির বিপরীতে আদায় হচ্ছে খুবই সামান্য। গত তিন মাসে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আদায়ের হার মাত্র ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
ঋণ আদায় কমে গেলে ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে মুনাফার বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। এ নিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে নানা পদক্ষেপ নিলেও তাতে তেমন কাজে আসনি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না। তা পরিশোধ না করেই তা পুনঃতপশিল হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় দেখালেও আসলে তা প্রকৃত আদায় নয়।
জানা গেছে,ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে যেমন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার হয় তেমনি পরিশোধের ক্ষেত্রে এ পরিচয় কাজে লাগানো হয়। এতে করে খেলাপির কাছে ব্যাংক অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। তারা চাইলেই ঋণ আদায় করতে পারে না। এ কারণেই তারা মাসের পর মাস চিঠি আর উকিল নোটিশ দিয়ে আসছে। কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছে না।
অর্থ আদালতে মামলার জট এত বেশি যে দুই মাসের একবার মামলা শুনানি হয় না। এতে করে বছরের পর বছর চলে গেলেও মামলার নিষ্পত্তি হয় না। এর ফাঁকে ঋণ গ্রাহিতা ঋণ নেয়া কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষনা করেন। এতে মামলার সর্বশেষ ফল দাড়ায় কোন টাকা পরিশোধ করতে হয় না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ খেলাপি হওয়ার জন্য ব্যাংকাররাও দায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও দুর্বলতা রয়েছে। ফলে আদায়ের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকেরই ক্ষতি হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। এই জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মত দেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকারদের যোগসাজশে গ্রাহকেরা ঋণ খেলাপি হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ আদায়ের তৎপরতাও কম দেখা যায়। তবে এতে ব্যাংকেরই ক্ষতি হয়। কারণ ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যায়।
কিন্তু ব্যাংকের ক্ষতি হলেও এতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কিছু যায় আসে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু বলছে না। সরকারের পক্ষ থেকেও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বড় ঋণ খেলাপিদের ধরে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় খোলাপির পরিমাণ কমবে না,বরং দিন দিন তা বাড়বে।
এছাড়া ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরণের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বিবেচনা করা যাবে না বলে মত প্রকাশ করেন সাবেক এই গর্বনর।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মুনসুর বলেন, গ্রাহক যদি ঋণ পরিশোধ না করে পার পায় তাহলে তো তারা খেলাপি হবেই। বড় বড় গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করার জন্যই নানা কৌশলে খেলাপি হয়। কিন্তু ছোট ছোট গ্রাহকেরা ঠিকই ঋণ পরিশোধ করার জন্য চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, ব্যাংক বড়দের কিছু করতে পারে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও বড়দের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তারা ঋণ পরিশোধ করছে না।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, ছোট বা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে যেসব ঋণ খেলাপি হয়েছে সেগুলো মোটামুটি আদায় হচ্ছে। বড়গুলোতে কিছুটা জটিলতা রয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণ আদায় করতে গেলে আইনগত ঝামেলায়ও পড়তে হয়। গ্রাহকেরা আদালতে রিট করে। কিন্তু ব্যাংকগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে আইনগত সঠিক সহায়তা পাচ্ছে না।
ঋণ আদায়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে মো. ইউসুফ আলী বলেন, ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংকের বিভন্ন ধরনের পদক্ষেপ থাকে। অগ্রণী ব্যাংকের হেড অফিস থেকে সব ব্রাঞ্চে ঋণ আদায়ের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়ে ৮০ দিনের একটা বিশেষ কর্মসূচিও হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করি বছরের শেষ দিকে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক কমে আসবে।
ব্যাংকাররা বলছেন, খেলাপি ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় এর বিপরীতে ব্যাংকের আয় থেকে প্রভিশন ঘাটতি মেটাতে হয়। মন্দ ঋণের বিপরীতে অর্জিত সুদ আয় খাতে নেয়া যায় না। এর ফলে ব্যাংকের সামগ্রিক আয় কমে যাচ্ছে। একই সাথে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। একই সাথে ঋণ আটকে যাওয়ায় এর বিপরীতে সংগৃহীত আমানত নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নতুন আমানত নিয়ে পুরনো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যার সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুন শেষে অবলোপনসহ মোট খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ২১০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকেরই প্রায় অর্ধেক। কিন্তু আদায় হয়েছে সবচেয়ে কম।
রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের জুন শেষে অবলোপনসহ মোট খেলাপি ঋণ ছিল সাড়ে ৬১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৭শ কোটি টাকা, যা শতকরা হিসেবে মাত্র ১ দশমিক ১৪ ভাগ।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৫১ কোটি টাকা। আদায়ের হার মাত্র ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের ১২ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় ১৬৫ কোটি টাকা, আদায়ের হার মাত্র ১ দশমিক ২৮ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের ১০ হাজার ২৩৫ কোটি টাকার মধ্যে আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৯১ কোটি টাকা, আদায়ের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। আর রূপালী ব্যাংকের ৫ হাজার ২০৯ কোটি টাকার মধ্যে আদায় করতে পেরেছে ৪৯ কোটি টাকা। আদায়ের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ।
সবচেয়ে কম আদায় হয়েছে বেসিক ব্যাংকের। ৯ হাজার ১৮ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকটি আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে গত বছর একই সময়ে এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ।
এদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৫৫ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকার মধ্যে আদায় করেছে ২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, আদায়ের হার মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ