রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিতাস গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বেসরকারি ব্যাংকে!

# আর্থিক অনিয়ম, গ্যাস চুরি ও একইস্থানে বছরের পর বছর চাকরি নিয়ে শুদ্ধি অভিযান
কামাল উদ্দিন সুমন : অব্যাহত অনিয়ম আর  দুর্নীতির ঘটনায়  দেশের গ্যাস সেক্টরের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান তিতাসে শুদ্ধি অভিযান চলছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বদলী এবং শোকজ করা হয়েছে। ফলে তিতাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাকরি নিয়ে আতংক। কখন কার বরখাস্ত কিংবা বদলির আদেশ আসে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তা। গত ১৭ অক্টোবর সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে ৫ কর্মকর্তাকে। ২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পেট্রোবাংলার কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। পরদিন বৃহস্পতিবার সাত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কোম্পানি। এছাড়া ২২ জনকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ জনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে গ্যাস সংযোগ ও বিতরণ নিয়ে ঘুষ দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম আর কেলেংকারীর ঘটনা ঘটে আসছে। যদিও এর আগে তিতাসের কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হতো না। এর ফলে দুর্নীতিবাজরা বরাবরই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতো। কিন্তু দুই দিনে এই চিত্র বদলে গেছে।
তিতাস সূত্র বলছে, আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও বেনামে সিএনজি স্টেশন নির্মাণ করে মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস চুরির অভিযোগ ছিল তিতাসের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। আর ছয় থেকে সাত বছর একই জায়গায় চাকরি করে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন তিতাসের কিছু কর্মকর্তা।
গত ১৭ অক্টোবর আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে তিতাসের পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে আরও দুই জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পেট্রোবাংলার কাছে নথি পাঠিয়েছে কোম্পানিটি। এই সাত কর্মকর্তাকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিতাসের তদন্তে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এরমধ্যে ৫ অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আরও দুই জনকে শোকজ করা হয়। সাময়িকভাবে বরখাস্ত  হওয়া পাঁচ কর্মকর্তা হলেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. আব্দুর রশিদ, ব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. হুমায়ুন কবির খান, উপ-ব্যবস্থাপক (বেতন ও তহবিল বিভাগ) নাজমুল হক, মিটারিং ও ভিজিল্যান্স টিমের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মহিদুর রহমান ও পাইপলাইন নির্মাণ বিভাগের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. গোলাম মোস্তফা খান।
তিতাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘শোকজ করা নতুন দুইজনের মধ্যে একজন বর্তমানে তিতাসের ডিএমডি (গাজীপুর) হিসেবে কর্মরত আবদুল ওয়াহাব এবং অন্যজন তিতাসের সাবেক পরিচালক (অর্থ) ও বর্তমানে বাপেক্সে কর্মরত জিএম শংকর কুমার দাস।’
বদলি হওয়া ২২ জনের মধ্যে ১১ জনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন মিটারিং ও ভিজিল্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার পারভেজ, সোনারগাও আঞ্চলিক বিক্রয় অফিসের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান, একই অফিসের উপ ব্যবস্থাপক মো. আবু রায়হান, মেট্রো ঢাকা বিপণন বিভাগ-৪ এর উপ ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী বরুন কুমার রায়, আঞ্চলিক বিক্রয় অফিস নরসিংদীর উপ-ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তাইফুর রহমান, আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ সাভারের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সুমন দাশ, আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ-সোনারগাঁও-এর উপ-ব্যবস্থাপক আবুল কালাম ভুইয়া, মিটার ও ভিজিল্যান্স শাখার উপ-ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম হাওলাদার, আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ-সোনারগাঁও-এর সহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আজাদ, একই অফিসের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোশাররফ হুসাইন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কাউছার আলম পলাশ।
এছাড়া বদলি হওয়া ৯ জনকে অবিলম্বে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ-নারায়ণগঞ্জের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম, একই অফিসের মিটারিং অ্যান্ড ভিজিল্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শাহীদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দফতরের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শেখ মনজুর আহমেদ, জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল শাখার উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, আঞ্চলিক বিক্রয় অফিস-গাজীপুরের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মিজবাহ উর রহমান, আঞ্চলিক বিক্রয় অফিস-সাভারের উপ ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী হাদী মোহম্মদ আবদুর রহিম, অপারেশন কন্ট্রোল বিভাগের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, আঞ্চলিক বিক্রয় অফিস-সাভারের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী শাকিল মন্ডল ও আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগ-গাজীপুরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদুল হক।
এছাড়া আরও দুজনকে ছাড়পত্রগ্রহণ করে নতুন জায়গায় যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন টিঅ্যান্ডটি শাখা-ডেমরা, সিস্টেম অপারেশন বিভাগ-দক্ষিণের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. তওহিদুল ইসলাম।
তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সূত্র জানায়, প্রতিমাসে গ্রাহক যে বিল দেয় তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে জমা রাখতে হয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে, সরকারি কোনও ব্যংকে এই অর্থ রাখতে হবে। কিন্তু তিতাসের হিসাব বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তা সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখায় রেখেছিলেন। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মশিউর রহমান অবসরে যাওয়ার পর সম্প্রতি পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) মোস্তফা কামালকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দায়িত্ব নিয়েই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেন।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফা কামাল বলেন, ‘এই অভিযানে সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। চেষ্টা করছি। যদি এখানে কেউ খারাপ কিছু করে, তাহলে আমরা দেখে-শুনে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনও মানুষকে শোকজ না করে তো কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সংবিধান অনুযায়ী মানুষের নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা করার অধিকার মানুষের রয়েছে। আমরা চাকরিবিধি অনুযায়ী কাজ করছি। পরিবর্তন কিছু দরকার আছে।’
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা সবমিলিয়ে সাতজনকে শোকজ করেছি। এরমধ্যে বরখাস্ত করা ৫ ছাড়াও দুই জন জিএম আছেন। জিএম দুই জনকে বরখাস্ত করতে গেলে বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাই, তাদের শুধু শোকজ করা হয়েছে। এরপর কোনও ব্যবস্থা নিতে গেলে বোর্ডের অনুমতি লাগবে।
তিনি আরও বলেন, ‘পেট্রোবাংলা একটি তদন্ত কমিটি করেছিল। সেই কমিটির তদন্তের আলোকেই ব্যবস্থা নিতে তিতাসকে নির্দেশ দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক বরাখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে বলা হয়েছে। করপোরেশন যদি কোম্পানিকে কোনও নির্দেশ দেয়, তাহলে সেটি পালনীয় বিষয়। তাই আমরা করপোরেশনের নির্দেশ ও তিতাসের চাকরি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
বদলির বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘অনেকে একই পদে ছয় থেকে সাত বছর আছেন। আমাদের গ্রাহক সেবার মানও কিছুটা বাড়ানোর কথা বিবেচনা করেই এই বদলি করা হয়েছে। মাঝে মাঝে এই পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকসেবার মানও কিছুটা উন্নত হয়।
এদিকে তিতাসে দুর্নীতির অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলবে হাজির না হওয়া তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের দুই কর্মকর্তাকে আবারও তলব করেছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, তাদের সময় আবেদনে সাড়া না দিয়ে আবারও তলবি নোটিশ দিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমান।
তিতাসের ওই দুই কর্মকর্তা হলেন পাইপলাইন ডিজাইন বিভাগের একটি শাখার ব্যবস্থাপক সাব্বের আহমেদ চৌধুরী এবং ইলেকট্রিক্যাল কোরেশন কন্ট্রোল (ইসিসি) বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান।
চিঠিতে আগেরবার তলবে হাজির না হওয়ার বিষয়টি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, দুদকের তলবে হাজির না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তিতাসের এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ, সীমার অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে দিয়ে ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন তারা। এ ছাড়া তিতাসের আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এ অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের অক্টোবরে দুদক এ অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে এর দায়িত্ব ছিল উপপরিচালক আহমারুজ্জামানের। প্রেষণে দুদকে আসা এই কর্মকর্তা সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে নিজ প্রতিষ্ঠান পুলিশে ফিরে গেলে নতুন অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদকের আরেক উপপরিচালক এ কে এম মাহবুবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। দলের অন্য দুই সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান ও মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ।
জানা গেছে, অভিযোগ সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন আগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা। নতুন অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়ে এ কে এম মাহবুবুর রহমান ও তাঁর দল তিতাসের দুই কর্মকর্তাকে তলব করেন।
এদিকে, তিতাসের দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি অনুসন্ধান করছেন দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। ইতোমধ্যে তিতাসের এমডিসহ ৮ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব করেছেন তিনি। তিতাসের এমডি মীর মশিউর রহমান, উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এস এম আবদুল ওয়াদুদ ও ব্যবস্থাপক ছাব্বের আহমেদ চৌধুরী , তিতাসের নারায়ণগঞ্জ শাখার মহাব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান, টিঅ্যান্ডটি শাখার (গাজীপুর) ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, ব্যবস্থাপক মো. আখেনজ্জিামান, ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস শাখার ব্যবস্থাপক শাহজাদা ফরাজী ও সহকারী কর্মকর্তা আবু ছিদ্দিক তায়ানীকে দুদকে তলব করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ