রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

গ্যাসের দাম এখন বাড়ানোর হচ্ছে না

স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘ দিন ধরে তোড়জোড় চললেও নির্বাচনের আগে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে সরকার। তারা মনে করছে এ মুহূর্তে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হলে মানুষের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ফলে গ্যাস কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এবং তা নিয়ে শুনানীর পর গ্যাসের দাম বাড়নো কোন সিদ্ধান্ত আপাতত নেই সরকারের। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেছেন, তারা এখন গ্যাসের দাম বাড়াবেন না। সাংবাদিক সম্মেলনে কমিশনের অন্য সদস্য রহমান মুরশেদ, মিজানুর রহমান ও মাহমুদ উল হক ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ডিসেম্বরে একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি  চলছে। তার আগে গ্যাসের দাম বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নিলে ভোটে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে তার বিরোধিতা করছিলেন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা।
গত সপ্তাহে বিইআরসি গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত চায়। গত ৭ অক্টোবর বিইআরসি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা চায়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও যান তিনি। সিদ্ধান্ত ছিল বিকেলে ফিরে এসে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে কোনও ধরনের গ্যাসের দাম বৃদ্ধি না করার বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
এলএনজি আমদানির প্রেক্ষাপটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ বাদে অন্য ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ থেকে ২৫ জুন শুনানি করে বিইআরসি। শুনানির প্রায় চার মাস পর দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এল।
তবে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করায় গ্যাসের দাম সমন্বয় না করার কারণে সরকারের চলতি অর্থবছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি গুণতে হবে বলে কমিশন হিসাব দেখিয়েছে।
গ্যাসের দাম না বাড়ানোর কারণ দেখিয়ে মনোয়ার ইসলাম বলেন, গ্যাসের উৎপাদন, এলএনজি আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যমান মূল্যহার পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো ও পেট্রোবাংলার আবেদনে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বর্তমানে ৩০০ মিলিয়নের মতো হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হতে গত তিন অক্টোবর পৃথক দুটি এসআরওর মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক এবং আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর ও অগ্রিম মূসক প্রত্যাহার করা হয়েছে।       
এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জামানত কমিয়ে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ কমিয়ে দেওয়ার কারণে এখনই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করছেন না বিইআরসি চেয়ারম্যান।
বিইআরসির সদস্য আবদুল আজিজ খান বলেন,চলতি অর্থবছরের শেষের দিকে ১০০ মেগাওয়াট এলএনজি আমদানি হতে পারে। তখন বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রয়োজন মনে করলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে আমরা বিবেচনা করব।
বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ভারিত মূল্য সাত টাকা ৩৯ পয়সা। এটা ১ টাকা ৪৬ পয়সা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে মনে করেন কমিশন চেয়ারম্যান । তা না বাড়ানোয় চলতি অর্থবছরে তিন হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে বলে জানান আজিজ খান।
 গত জুনে এলএনজি আমদানি চূড়ান্ত  হওয়ার পরই গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়। উত্তোলন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ছাড়া সব ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।জুনের ১১ তারিখ থেকে দাম বাড়ানোর উপর শুনানি শুরু করে বিইআরসি।
প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় দাম ৭ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৯৫ পয়সা করার প্রস্তাব করে কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ৭৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
এর যুক্তি হিসেবে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বিইআরসিতে দেওয়া এক উপস্থাপনায় দেখানো হয়েছে, ২৫ টাকা ১৭ পয়সা দরে কিনে এর সঙ্গে ভ্যাট, ব্যাংক চার্জ, রিগ্যাসিফিকেশন চার্জসহ নানা ধরনের চার্জ যোগ করে আমদানি করা এলএনজির বিক্রয়মূল্য মূল্য দাঁড়াবে ৩৩ টাকা ৪৪ পয়সা। এই অঙ্ক দেশে বর্তমানে বিক্রিত গ্যাসের চার গুণ বেশি।
নতুন গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন নির্মাণে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করে জিটিসিএল প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ দশমিক ২৬৫৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দশমিক ৪৪৭৬ পয়সা অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর শুনানি হয়।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা গেলে প্রচলিত দাম বহাল রেখেই আমদানি করা এলএনজির দাম সমন্বয় সম্ভব বলে মত দেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
গ্যাসের দাম না বাড়িয়েও বিতরণ কোম্পানির ব্যয় কমানোর জন্য বেশ কয়েকটি আদেশে পরিবর্তন এনেছে বিইআরসি।
এরমধ্যে রয়েছে-শিল্প, চা-বাগান, বাণিজ্যিক এবং গৃহস্থালি গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রে তিন মাসের পরিবর্তে দুই মাসের এবং ছয় মাসের পরিবর্তে চার মাসের বিলের সমপরিমাণ অর্থ নিরাপত্তা জামানত হিসেবে রাখতে হবে।
নিরাপত্তা জামানত দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যাপটিভ পাওয়ার, শিল্প ও চা-বাগান গ্রাহকশ্রেণীর ক্ষেত্রে এক তৃতীয়াংশ নগদের পরিবর্তে ৫০ শতাংশ নগদ এবং দুই তৃতীয়াং ব্যাংক গ্যারিান্টির পরিবর্তে ৫০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি বা অন্য কোন গ্রহণযোগ্য ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে নিরাপত্তা জামানত রাখা যাবে।
এছাড়া পি-প্রেইড মিটার গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কোনো নিরাপত্তা জামানত রাখা লাগবে না
বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, কমিশন আবেদনগুলো বিবেচনা করে জুনে শুনানি করে। গ্যাসের উৎপাদন, এলএনজি আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও সার্বিক দিক বিবেচনা করে ‘বিইআরসি রেগুলেটরি আইন ২০০৩ এর ধারা ২২ (খ) এবং ৩৪’-এ দেওয়া ক্ষমতা বলে কমিশন ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যমান মূল্যহার পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’
সম্মেলনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জারি করা ২৬ সেপ্টেম্বরের এসআরও-এর মাধ্যমে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে এলএনজি আমাদনির শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া ওই বিভাগের জারি করা ৩ অক্টোবরের আলাদা দুটি এসআরও-এর মধ্যেমে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক এবং আমদানি-পর্যায়ে অগ্রিম কর ও অগ্রিম মূসক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান গ্যাস মূল্যহার বণ্টন, বিবরণী সংশোধন করে কমিশন আদেশ জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
কমিশন নিরাপত্তা জামানত, বিল পরিশোধ, বিল পৌঁছানো বিষয়ে আগের নিয়মের পরিবর্তন করেছে। বিতরণ সিস্টেম লস নিরূপণের প্রচলতি পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া গ্যাস সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থায় আরও কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই আদেশ ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ