বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

তালগাছ ও পুকুর

রুহুল আমিন রাকিব : এক গাঁয়ে অনেক বড় একটা পুকুর ছিলো। পুকুরের চারপাশ জুড়ে অনেকগুলো তালগাছ ছিল। তালগাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। দূর থেকে সারি সারি তালগাছগুলোকে দেখলে ভীষণ ভালো লাগে সবার কাছে।

তাল গাছের নিচে সব সময় মানুষের আড্ডা লেগে থাকে। নানা-রকম গল্প করে,পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে। তাল গাছের গায়ে গর্ত করে বাসা বেঁধে অনেক দিন ধরে বসবাস করে মাথায় ঝুঁটি ওলা কাট-ঠোকরা পাখি। বেশ কয়েক জোড়া পাখি এই গাছগুলোয় বস-বাস করে।এখন আর প্রতি গাঁয়ে-গাঁয়ে এই ঝুঁটিওলা পাখি'কে দেখা যায় না বললেই চলে। দিনে-দিনে হারিয়ে যাচ্ছে এই পাখি। তবে এই গাঁয়ের তালগাছের আশে-পাশে চোখ মেলে তাকালেই দেখা পাওয়া যায় এই কাঠমিস্ত্রি পাখিটার।

তালগাছের শাঁখে সুনিপুণভাবে বাসা তৈরি করে বসবাস করে, মিষ্টি পাখি বাবুই, আহা! পূবের বাতাসে যখন বাবুইপাখির বাসাগুলো দোলে, দেখে কী যে ভালো লাগে! বেশ কয়েক'জোড়া বাবুই পাখি এই তালগাছের শাখাগুলো দখল করে আছে। সকাল হলে রবির আলো ফোটার আগেই, বাবুইপাখির ঝাঁক, কিচির-মিচির শব্দ করে উড়ে চলে আহার খুঁজতে।

ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে পড়ে গাঁয়ের সবুজ ফসলের ক্ষেতে। এক এক করে খেয়ে ফেলে,ফসলের ক্ষতি করা কীটগুলোকে।

হঠাৎ যখন সবুজ ফসলে হিমেল হাওয়া দোল খায়,বাবুই পাখির ঝাঁক ফুড়ুৎ করে উড়ে যায় সে এক অপরূপ দৃশ্য!

পুকুর পাড়ে রোজ বিকেলে দেখা মিলে সাদা পালকের বক'দাদুর। এক পায়ের উপর ভড় দিয়ে এমন গুটিশুটি মেরে বসে থাকে যেন কিছুই বুঝে না বুড়া দাদু! তবে শিকার সামনে এলে তার আর কোন নিস্তার নেই। পুকুর জলের উপর হেলে পড়া বাঁশের শাখে বসে শিকারের অঙ্ক কষে চতুর পাখি মাছরাঙা। জলের উপর সাঁতার কাটে নানা রঙের হাঁস।

দল বেঁধে ঝাঁকে-ঝাঁকে,পানির একটু নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়ায় মাছের দল। পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা হই হুল্লোড়ে মেতে ডুব সাঁতার খেলে, চোখ লাল করে বাড়ি ফিরে যায়। শরতের রাতে দুধে রাঙা চাঁদের আলো এসে যখন পুকুর জলে ঢেউ খেলে, আর তালের পাতায় হাওয়া এসে শন-শন শব্দ করে তখন অন্য রকম একটা ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় সবার প্রাণে!

পাকা তালের মৌ-মৌ করা ঘ্রাণ মন কেরে নেয় সবার।

এই পুকুর' আর আকাশ ছোয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তাল গাছগুলো যেন এই গাঁয়ের মধ্যমণি।

তবে সুখের সময়গুলো না কি খুবই অল্প সময়ের জন্য আসে! হঠাৎ একদিন এই পুকুর ও জমির মালিক সবার কাছে বলল, এই পুকুর ভরাট করে এই জায়গায় বাড়ি তৈরি করবে। এই কথা শুনে গাঁয়ের সবার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। গ্রামের বয়স্ক দাদুরা পুকুর মালিক'কে মানা করল এই পুকুর ভরাট করতে। পুকুর ভরাট করে, তাল গাছগুলো কেটে এই জায়গায় বাড়ি তৈরি করলে অনেক রমক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়বে এই গ্রাম। পাখ-পাখালিও চলে যাবে গ্রাম ছেড়ে। হুমকির মুখে পড়বে সবুজ ফসল। গ্রাম হারিয়ে ফেলবে তার সৌন্দর্য! তবে কে শোনে কার কথা!

মালিক তার নিজের কথা মতো চলল। একদিন সকাল বেলা, অনেক মানুষ ডাকা হলো, একে একে করাত দিয়ে সমস্ত তাল গাছগুলো কেটে ফেলা হলো। তালগাছের আশে-পাশে কিছুক্ষণ ওড়াউড়ি করে মনে দুঃখ নিয়ে, দূর থেকে আরও দূরে উড়ে গেল এই গাঁয়ের সকল পাখিগুলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ