মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে

কামাল উদ্দিন সুমন : প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে বিদ্যুৎ আমদানীর কথা বললেও মুলত এ আমদানীর পেছনে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ভারত থেকে গণহারে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে ভারত। এই শর্তের কারণে চাইলেও ভবিষ্যতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বন্ধ করা যাবে না।
সূত্র বলছে, দেশের  চাহিদা মেটানোর কথা বলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, অন্যদিকে চলছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের শর্তের কবলে পড়ে ভবিষ্যতে দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রই বন্ধ রাখতে হবে।
তাদের মতে, পরিকল্পনায় অপরিপক্বতার কারণে গণহারে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে। তারা এও বলছেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন কর্মকর্তা উদাহরণ টেনে বলেন, প্রথম ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের দামের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াটে শূন্য দশমিক  ৩৪৫৫ মার্কিন ডলার।  জ্বালানির দাম ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াটে শূন্য দশমিক ৩৬৮৫ মার্কিন ডলার। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ যে চুক্তি করেছে তাতে, বাংলাদেশ চাহিদা অনুযায়ীই ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আনবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫০০-এর স্থলে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনলেও পুরো ৫০০ মেগাওয়াটের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। আবার যদি ভারত কোনো কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ না করতে পারে, তাহলে আনুপাতিক হারে ক্যাপাসিটি চার্জ কম নেবে।
বেশিরভাগ সময় গড়ে ৩০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ আনে বাংলাদেশ। বাকি ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ  না আসার কারণে ভারতকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রতি কিলোওয়াটে টাকা দিতে হচ্ছে এখনই। ভারতের বিদ্যুতের দাম গড়ে অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় খুব বেশি না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ ধরে দাম অনেক বেশি পড়ছে। বাংলাদেশ নতুন যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য চুক্তি করতে যাচ্ছে, তাতেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে।
গ্রীষ্মে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা থাকে অন্তত ১৩ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু শীতে ওই চাহিদা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটে। দেশে শীত-গ্রীষ্মের এই চাহিদা পরিবর্তনের প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রিডভুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেশিরভাগই আবাসিকে ব্যবহার করা হয়। দেশে গ্যাস স্বল্পতার মধ্যেও শিল্প গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতকালে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি একেবারে কমে যায়। কারণ তখন দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়েই চাহিদার পুরোটা মেটানো সম্ভব। সরকার বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। এরমধ্যে বেশিরভাগই কয়লাচালিত স্বল্প ব্যয়ের। সরকার এক্ষেত্রে শুধু একতরফা বিদ্যুৎ আমদানি করতে থাকলে বাংলাদেশ লোকসানে পড়বে।
এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিনিময় না করা গেলে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে ভারতকে সেই প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত একতরফাভাবে ব্যবসা করতে না চাইলেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সূত্র জানায়, বর্তমানে ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লায় যে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ  সরবরাহ করা হয় সেই বিদ্যুতের দাম নির্দিষ্ট। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ নিতে চাইলে বিদ্যুতের বিনিময়ে টাকা দেবে। না নিলে কোনো টাকা দিতে হবে না। এই বিদ্যুৎ সরাসরি ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লায় সরবরাহ করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলে রেডিয়াল পদ্ধতি। কিন্তু ভেড়ামারা দিয়ে ভারতের বহরমপুর থেকে যে বিদ্যুৎ আসে, সেই বিদ্যুৎ না কিনলেও বাংলাদেশকে দিতে হয় ক্যাপাসিটি চার্জ। দেশের ভেতরের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে (আইপিপি) থেকে যেভাবে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে ভারত থেকে বিদ্যুৎ নেয় বাংলাদেশ। বর্তমানে ভেড়ামারা দিয়ে যে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে, তার পুরোটা বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময় আনে না। চাহিদা বেশি থাকলেই আনে।
জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি। ফলে ওই সময় ভারতের বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিদ্যুৎসহ সব ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রই চালানো হয়। কিন্তু শীতকালে চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কম থাকলে সাধারণত প্রথমে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হয়। কারণ, না নিলেই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। এরপর ভারতের বিদ্যুৎ এরপর আসে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ফলে চাহিদা কমে গেলেই সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা যত বাড়বে এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি যত বাড়বে, ততই সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসে থাকবে। এমন হতে থাকলে একসময় শীতকালে সরকারি কেন্দ্রগুলো চলবেই না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। তাই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনার বিষয়টি সব সময়েরই জন্যই ভালো হবে, সে চিন্তা করা ঠিক নয়। বেশি বিদ্যুৎ আমদানির কারণে দেশ ক্ষতিপ্রস্তও হতে পারে।’ এই সমস্যা সমাধানের বিষয়েও তিনি বলেন, ‘এই সমস্যা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে একটা উপায়ই আছে।শীতকালে যদি ভারতের আছে আমরা বিদ্যুৎ রফতানি করতে পারি। তাহলেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ খাতে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারবে।’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের এই বিষয়গুলো পরিকল্পনাহীনভাবে চলছে। যা খুবই ক্ষতিকারক। এই অবস্থাগুলো সুবিধাজনক হতে পারতো, যদি পরিকল্পিতভাবে এই বিষয়গুলো করতে পারতাম। এতে আমাদের ব্যয় বেড়ে যাবে। এই মুহূর্তে আমাদের যে উৎপাদন ক্ষমতা, সেই অনুযায়ী তো আমরা উৎপাদন করতে পারছি না। ফলে ব্যয় তো বাড়ছেই। আমদানি করার বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও আমাদের লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে। সেই ঝুঁকি বিষয়ে এখন যদি আমরা সুচিন্তিতভাবে কাজ করি, তাহলে আগামীতে সমস্যা কম হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি রেন্টালগুলোর মেয়াদ না বাড়াতাম, তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে যদি চুক্তি করা হতো যে, যে পরিমাণ কিনবো, সে পরিমাণ টাকা দেবো, কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দেবো না, তাহলে আমরা লাভবান হতাম। অন্যদিকে আমাদের যে চাহিদা, তা পূরণ করতে প্রথমে সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হবে। এরপর বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানি করা বিদ্যুৎ থেকে নেওয়া হবে, এমন নিয়ম করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার তো বেসরকারি খাতকে ব্যবসা দিতেছে, আমদানি করে তাদের মুনাফা দিতে চায়। এসব কারণে আমরা  বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে অনেক ব্যয়বহুল করে ফেলেছি। পাশাপাশি অনেকখানি অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছি।’
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা দুই দেশের সমঝোতার ক্ষেত্রে কোনও দক্ষতা দেখাতে পারছি না। যেভাবে ক্যাপাসিটি  চার্জ বা শুল্ক কর আরোপিত হচ্ছে, এটি সরকারের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ ছিল। সেসব জায়গায় আমরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারিনি। এখন বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আমরা আমদানির ওপর নির্ভর হবো। সেজন্য পরিকল্পনাও দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে। বৈজ্ঞানিকভাবে এই পরিকল্পনা করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ