বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

তাড়াশে টিআর প্রকল্পের সিংহ ভাগ টাকা লোপাট

শাহজাহান তাড়াশ সিরাজগঞ্জ থেকে: ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসুচীর আওতায় সাধারণ ১ম পর্যায়ের অধিকাংশ প্রকল্প ভুয়া, প্রকল্প থাকলে কোন কাজ হয়নি, আবার কোন প্রকল্পের নাম মাত্র কাজ করে বিপুল পরিমানে সরকারী টাকা আত্মসাত করেছেন প্রকল্পর সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদ্বয়। তাড়াশে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের সিংহভাগ টাকা হরিলুটের পরিনত হয়েছে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে ও সংশ্লিষ্ঠ সুত্রে জানাগেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসুচীর আওতায় সাধারন ১ম পর্যায়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ২৩টি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। ২৩টি প্রকল্্েপর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়ে ছিল ১৯ লাখ ৬২ হাজার ২১৯ টাকা। অধিকাংশ প্রকল্পর নাম ঠিক থাকলেও কাজের কোন অস্তিত পাওয়া যায়নি। আবার ভুয়া প্রকল্প দেখানো হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক স্বাক্ষরিত সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে উত্তোলন কৃত প্রকল্পের তালিকায় ৩নং ক্রমিকে সগুনা ইউনিয়নের সান্দুরিয়া গ্রামের সেলিমের বাড়ি হতে জগুর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্প। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাক। উক্ত গ্রামে ওই নামের কোন ব্যক্তি নাম বা প্রকল্পর অস্তিত খুজে পাওয়া যায়নি। সান্দুরিয়া গ্রামের প্রধান মাতব্বর লালচাদ, আজাহার, ভুলুর সাথে কথা বললে তারা জানান আমাদের গ্রামে ওই নামের কোন ব্যক্তি নেই এবং কোন রাস্তার কাজ করা হয়নি। ৪ নং ক্রমিকে নওখাদা জামে মসজিদের উন্নয়ন ও সবুজ পাড়া আব্দুল হকের বাড়ি হতে সাইফুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এখানেও মসজিদ বা রাস্তার কোন কাজ হয়নি বলে জানান সগুনা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল গনি মাস্টার। ৫নং ক্রমিকে সগুনা রাজ্জাকের বাড়ি হতে হবির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ও মাকড়শোন মাদ্রাসার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। সেখানে সগুনা গ্রামের রাস্তার কোন কাজ হয়নি বলে জানান সাবেক ইউপি সদস্য হবিবুর রহমান এবং মাদ্রাসায় কোন উন্নয়ন মুলক কাজ করা হয়নি বলে জানান মাকড়শোন মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ শাহ আলম সরকার। ৬ নং ক্রমিকে ধাপতেতুলিয়া খেলার মাঠ মেরামত প্রকল্প।
প্রকল্পের নাম দেওয়া হলেও সেখানে বিন্দু মাত্র কাজ করা হয়নি। প্রকল্পের কাজ হয়নি বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি আবু বক্কার, সগুনা ইউনিয়ন আ’লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব আবু ওসমান, গ্রাম প্রধান চাদ আলী, আব্দুল মান্নান প্রমুখ। ২৩ নং ক্রমিকে লালুয়ামাঝিড়া পুর্বপাড়া মসজিদের দরজা ও জানালা থ্যাইগ্লাস দ্বারা উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭২ হাজার ৪শত ৪৪ টাকা। এ প্রকল্পের সম্পন্ন টাকাই আত্মসাত করা হয়েছে। লালুয়ামাঝিড়া পুর্বপাড়ার মসজিদের সভাপতি লুৎফর রহমান ফতেন জানান মসজিদের ক্যাশ থেকে কাজ করা হয়েছে। উপজেলা থেকে কোন টাকা পাই নাই। কমিটির সাধারন সম্পাদক আয়নাল হক জানান, আমরা জানিনা আমাদের মসজিদের জন্য কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কিনা। খোজ নিয়ে জানাগেছে, উপজেলা চেয়ারম্যানের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাসুদ রানা সুর্য ভাইসচেয়ারম্যান ও অন্যান্য লোকের সাথে টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। তিনি লালুয়ামাঝিড়া গ্রামের ওই পাড়ার সন্তান হিসেবে সব কিছু জানার পর প্রকল্পটি দিয়ে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে গ্রামের লোকজন অভিযোগ করেন। এব্যাপারে সুর্য জানান প্রকল্পের ৩৫ হাজার টাকা যে প্রকল্প দিয়ে ছিলেন (ভাইসচেয়ারম্যান) তিনি নিয়েছেন। ১০ হাজার টাকা অফিস খরচের জন্য আমি নিয়েছি। ১৪ হাজার টাকা ওই গ্রামের ইউপি সদস্য আসালতকে দিয়েছি। বাকী ১৩ হাজার টাকা উপজেলা চেয়ারম্যান নিয়েছেন। ইউপি সদস্য আসালত জানান, উপজেলা চেয়ারম্যানের অফিস সহকারী মাসুদ রানা সুর্য একদিন আমাকে ডেকে বলল এখানে একটি স্বাক্ষর দিয়ে যান। আমি কোন কিছু না দেখেই স্বাক্ষর করে ছিলাম। পরে আমাকে ১৪ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে পরে ১৩ হাজার টাকা দিয়েছে। কিসের টাকা জানতে চাইলে সুর্য আমাকে বলেন এত জানার দরকার নেই। টাকা পেয়েছেন চলে যান। বিষয়টি মসজিদ কমিটির সভাপতি লুৎফর রহমান ফতেন কোন এক সাংবাদিকের মাধ্যমে জানার পর ইউপি সদস্যকে জানালে তিনি তার কাছে ভুল স্বীকার করে ১০ হাজার টাকা গত ২দিন আগে মসজিদ কমিটির নিকট জমা দিয়েছেন বলে জানান সভাপতি। তবে মসজিদ কমিটির সাধারন সম্পাদক আয়নাল হক এখন পর্যন্ত জানেন না তার মসজিদের নামে ৭২ হাজার টাকার প্রকল্প দেয়া হয়ে ছিল। সর্বশেষ ইউপি সদস্য আসালত আলী যে ১০ হাজার টাকা মসজিদে জমা দিয়েছেন তাও তিনি জানেন না। ভুয়া প্রকল্প ও প্রকল্পের কাজ না করেই টাকা দেওয়া প্রসঙ্গে মুঠো ফোনে তাড়াশ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে থাকা) কামরুল আহসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, প্রকল্পের কাজ না করলে টাকা ফেরত নেওয়া হবে। কাজ করল কিনা তা না দেখেই কি ভাবে বিল দিলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান। জুন ফাইনাল শেষ হবার পর কাজ দেখবে এ প্রশ্ন করলে তিনি বেশী কিছু বলতে পারব না বলেই ফোন রেখে দেন।
ভুয়া প্রকল্প ও কাজ না করেই টাকা ছাড় দেওয়া ও উত্তোলন প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম ফেরদৌস ইসলাম এর কোন সদউত্তর দিতে পারেন নাই। উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হক এর সাথে মুঠো ফোনে কথা বলার চেষ্ঠা করলে তিনি ফোন ধরেন নাই। ফলে তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে উক্ত অর্থ বছরের অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ না করেই সরকারী টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে আত্মসাত করা হয়েছে। সচেতন মহলের দাবী প্রকল্প গুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্ঠি আকর্ষন করেছেন। উল্লেখ্য ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষনাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসুচীর আওতায় সাধারন ১ম পর্যায়ের ২৩টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৯ লক্ষ ৬২ হাজার ২১৯ টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়ে ছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ