শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রূপগঞ্জে সড়ক-মহাসড়ক জুড়ে যানজট ॥ নেপথ্যে চাঁদাবাজি

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের উপর দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের অবস্থান। ঢাকা সিলেট মহাসড়ক ছাড়াও এশিয়ান বাইপাসও, ৩’শ ফুট খ্যাত কুড়িল কাঞ্চন কুড়িলসহ সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের কথিত ৪টি বক্স বসিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নানা অনিয়ম করে যানজটের সৃষ্টি করছে বলে রয়েছে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, এসব স্পট থেকে মাসে অবৈধ চাঁদাবাজিতে আয় ২৫ লক্ষাধিক টাকা। আর এসব চাঁদার ভাগ পায় উপর মহল।   
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত ঢাকা-সিলেট ও এশিয়ান হাইওয়ে মহাসড়ক। আর তাই এ সড়কদুটির মিলনস্থল গোলাকান্দাইল চৌরাস্তায় বসানো হয়েছে একটি পুলিশ বক্স। সেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম পাইকারী মার্কেট হিসেবে পরিচিত গাউছিয়া মার্কেটের অবস্থান। এ মার্কেটটি প্রতি মঙ্গলবার এবং পাশে গোলাকান্দাইলের পুরাতন হাট বসে প্রতি বৃহস্পতিবার। এছাড়াও  উপজেলা পর্যায়ে প্রথম মেগা প্রকল্প ভুলতা ফ্লাইওভার নির্মাণ  চলমান থাকায় স্বাভাবিকভাবে এ মহাসড়কের যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ ভুমিকা রাখার কথা থাকলেও প্রতিদিন কাগজ পত্রাদি যাচাইয়ের নামে আদায় করছে প্রকাশ্যে চাঁদা। যানবাহন চালকরা চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলেই  লাইন করে  মহাসড়কে থামিয়ে রাখে গাড়ি। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলেও তা নিরসনের কোন উদ্যোগ নেই তাদের।
  একই চিত্র দেখা গেছে, ৩’শ ফুট সড়কের কাঞ্চন ব্রিজের পশ্চিম পাশে। ট্রাফিক পুলিশের বক্স বসিয়ে বাদল ভান্ডারি নামে এক ব্যক্তিকে ওই বক্স্রের ঝাড়–দার হিসেবে মৌখিক নিয়োগ দিয়েছে টিআই মাকসুদুর রহমান। টিআই মাকসুদুর রহমান নিজেকে সিনিয়র অফিসার দাবী করে একই বক্স্রের দায়িত্বে থাকা টিআই ইকবালকে জিন্মি করে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই স্পটে এটিএসআই নাজমুল ইসলাম ওই টিআই মাকসুদের নির্দেশে ঢাকা বাইপাস সড়কের চলমান ট্রাক এবং সাধারন যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করছে। এদের চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে মধূখালী এলাকার আব্দুল হক মিয়ার ছেলে বাদল ভান্ডারি। এ বক্সের কর্মকর্তারা বাদলের  মাধ্যমে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায় করছে। এ চাঁদাবাজি থেকে রাজধানীর ভিআইপি ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা রেহাই পাচ্ছে না। এ ছাড়াও এ পথে চলমান যে কোন যানবাহন রেকার দিয়ে আটকি জড়িমানা আদায়ের নামে আদায় করছে চাঁদা। না দিলে মারধরসহ ট্রাফিক পুলিশের এ এসআই রেকার আমিনুল নিজেই মারধর করে অমানুষিক নির্যাতন করে আদায় করছে টাকা। ওই টিআইয়ের অপকর্মে কাঞ্চন ব্রিজের  উভয়পাশে  অবৈধ গাড়ী পার্কিং, সিএনজি অটো রিক্সা, ভ্যানসহ বিভিন্ন প্রকার গাড়ী থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে।  বৃহস্পতিবার দুপুরে এমন চিত্র ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে গোলাকান্দাইল মোড়ে। সেখানে দায়িত্বরত টিআই রাফিক মিয়ার অধিনে থাকা রেকারের দায়িত্বে থাকা এটিএসআই আমিনুল একই কায়দায় চাঁদা আদায় করছে।  এ স্পটে পুলিশের নির্দেশক্রমে চাঁদা আদা করছে হাটাবো এলাকার শ্রমিক নেতা শামীম মিয়া। গুরুত্বপূর্ন এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্মানাধীণ ফ্লাইওভারের পাশেই টাকার বিনিময়ে একাধিক পার্কিং সুবিধা করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে তারাব পৌরসভার বরাব বিশ^রোড এলাকায় । এ মহাসড়কটি দিয়ে কাঁচপুরসহ সুলতানা কামাল সেতু হয়ে রাজধানীতে প্রবেশ ও রাজধানী থেকে মালবাহী গাড়ী ও যাত্রীবাহী হাজারের বেশি গাড়ী চলাচল করছে। এখানকার দায়িত্বরত টিআই গোলাম মোস্তফা নিজেই তালিকা করে মহাসড়কে ২ শতাধিক অবৈধ যানবহন চলাচলের সুবিধা দিয়েছেন। এসব অবৈধ যানবাহন চলাচললের সুবিধা দিয়ে বৈধ যানবাহন থেকে কাগজপত্র দেখার নামে নামে চাঁদা আদায় করছে। এখান থেকে তার আয় মাসে ৭ লাখ টাকা। এভাবে ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন স্পটে নানা অনিয়ম করে আদায় করছে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক টাকা।
 এ পথে নিয়মিত যানবাহন চালক রাজিব মিয়া জানান, গাড়ীটা রাস্তায় (মহাসড়কে) বের করলেই মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা প্রথমে কাগজ পত্রাদি দেখতে চায় । তা দেখানোর পর সকল বৈধতা থাকার পরও নানা অযুহাতে টাকা আদায় করে। তিনি আরো জানান, ৩’শ ফুটের  টিআই মাকসুদ প্রকাশ্যেই বলেন, যতই কাগজ থাকুক, আমার টার্গেটমত টাকা আদায় করতেই হবে। রেকার ভাড়াসহ বিভিন্ন মহলকে খুশি করতে হবে।  তারাব এলাকার গাড়ী চালক আব্দুল হক বলেন,  জীবিকার তাগিদে নিয়মিত হাইএস গাড়ী নিয়ে বের হন তিনি। কিন্তু গোলাকান্দাইল মোড়ে এলেই রেকার আমিনুলকে ২শ থেকে ৩শ টাকা দিয়ে মোড় পার হতে হয়। না দিলেই রেকার দিয়ে জড়িমানা করার ভয় দেখায়।
বাইপাস সড়কে নিয়মিত সিএনজি চালক জয়নাল মিয়া বলেন, মাসে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা দিয়ে নির্ধারিত স্টিকার কিনতে হয়। এ টাকা দিতে দেরী হলেই টিআই মাকসুদ ও ইকবালের নির্দেশে এটিএসআই নাজমুল গাড়ী আটকিয়ে হয়রানি করে। কিন্তু তাদের স্টিকারযুক্ত গাড়ী প্রকাশ্যে চললেও কোন প্রকার বাঁধা দেয় না।
নরসিংদী থেকে নিয়মিত যাত্রী সাইফুল ইসলাম সাইফ রাজধানীর টিকাটুলিতে যাতায়াত করেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, পুরো সড়কে যানজটহীন গাড়ী চললেও ভুলতা গাউছিয়া এলাকায় এলে ট্রাফিকরা বাস থেকেও চাঁদা নেয়। ফলে এখানকার যানজট নিয়ন্ত্রণ করায় ব্যর্থ হওয়ায় তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন। ১ ঘন্টার পথ যেতে সময় ব্যয় হয় ৪ থেকে ৫ ঘন্টা। ফলে হয়রানীর নিরসন চান তিনি।
 ট্রাফিক পুলিশের এ চাঁদাবাজি থেকে বাদ যায়নি মহাসড়কের পাশে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা। কাঞ্চন এলাকার সোহেল মাহমুদ বলেন, মহাসড়কের পাশে অবস্থানরত স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো থেকে নিয়মিত আদায় করা হয় টাকা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত টিআই মাকসুদুর রহমান বলেন, ট্রাফিকের দায়িত্বপালন করতে গেলে কিছুটা অনিয়ম করতেই হয়। এসব লিখে কি হবে? সবাইকে ম্যানেজ করেই উপরের নির্দেশে  রেকার ভাড়া ও ঝাড়ুদারেরসহ কিছু খরচ রাখা হয়।  তবে কাউকে হয়রানী করা হয় না।
এ বিষয়ে গোলাকান্দাইল পুলিশ বক্সের দায়িত্বরত টিআই রাফিক মিয়া বলেন, আমি নতুন জয়েন্ট করেছি। তবে যথাসম্ভব যানজট নিরসনে আরো সতর্ক থাকবো।
এ প্রসঙ্গে তারাব বিশ্বরোড এলাকায় দায়িত্বরত টিআই গোলাম মোস্তফা বলেন, মহাসড়কে যানজট নিরসনে ও যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে কোন প্রকার অনিয়ম করি না। তবে কিছুটা অনিয়ম জড়ালেও তা পরিস্থিতির কারনেই হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের সিনিয়র এসএসপি আব্দুর রশিদের সাথে (তার মুঠোফোনে) যোগাযোগ করার জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি তার মুঠোফোন রিসিভড করেননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ