বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জলাবদ্ধ নগরে পরিণত হবে ঢাকা

আখতার হামিদ খান : প্রতিবছর মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় বর্ষা। সিটি করপোরেশনগুলো জুন থেকে বর্ষা মৌসুম শুরুর হিসাব করে। তবে গত বছর এপ্রিলের শেষ থেকেই আগাম বর্ষা শুরু হয়। ছয় মাসের বেশি স্থায়ী বর্ষায় প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। এবারও সেই সংকেত পাওয়া যাচ্ছে।
জানতে চাইলে নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু কাজ হচ্ছে, কিন্তু যতটা হওয়া দরকার তার ধারেকাছেও কাজ হয়নি। গতবারের মতো ভারী বর্ষণ হলে রাজধানীবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে। মূল বর্ষা শুরুর আগে কর্তৃপক্ষগুলো কাজ করে কিছুটা ভোগান্তি কমাতে পারে।
গতবার জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা দেখে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘আমি ওয়াদা করছি, সামনের বছর থেকে আর এসব (জলাবদ্ধতা) দেখবেন না। কিছুদিনের মধ্যেই নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি ঢাকার জলাবদ্ধতার নিরসনের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে। ঢাকা ওয়াসা গত মার্চ মাসেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো কার্যক্রম শুরু করেনি। কোনো নালা পরিষ্কার করেনি, পুনঃখনন করেনি কোনো খাল। তবে গত ২ এপ্রিল সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেছিলেন, জলজট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াসা।
ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, রামচন্দ্রপুর খাল, রূপনগর খাল, বাউনিয়া খাল, দেব-ধোলাই খাল, সেগুনবাগিচা খাল ও মা-া খাল (মোট ৩০ কিলোমিটার) পুনঃখনন, ২৪৯ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের নালা পরিষ্কার, নালা মেরামত, সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্টের ময়লা অপসারণ, চারটি স্থায়ী পাম্প স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণ ও ১৫টি অস্থায়ী পাম্প স্টেশন স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো বর্ষার আগে শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান প্রথম আলোকে বলেন, আজ (গতকাল রোববার) সকালে আধা ঘণ্টায় প্রায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিল মাসে এমন বৃষ্টি অনেকটা অকল্পনীয়। তারপরও ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, রোকেয়া সরণির মতো জায়গায় জলযট বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না। ওয়াসার পাম্প স্টেশনগুলো ভালোভাবে কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, এ বছর জলাবদ্ধতা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে মোট ভূমির ১২ শতাংশ জলাধার থাকা উচিত। কিন্তু ঢাকায় আছে মাত্র ২ শতাংশ। তাই বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার জায়গা নেই। অন্যদিকে ঢাকা শহরের ৮০-৯০ ভাগ কংক্রিটে ঢাকা। এতে মাটির নিচে পানি যাওয়ার পথও বন্ধ। আর ঢাকার চারপাশের নিম্নাঞ্চল ভরাট করায় এর ভেতর থেকে পানি স্বাভাবিকভাবে বের হয় না।
গত বছর রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা হওয়া এলাকাগুলোর একটি তালিকা করা হয়। এর মধ্যে মৌচাক, মালিবাগ, মুগদা, শান্তিনগর, নাজিমুদ্দিন রোড, উমেশ দত্ত রোড, বংশাল রোড, মতিঝিল, বঙ্গভবন এলাকা, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, কারওয়ান বাজার, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া অন্যতম।
তালিকার কিছু এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিয়েছে। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় নালা নির্মাণ ও সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু হলেও বর্ষা মৌসুমের আগে তা শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ফলে এবারের বর্ষায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি খোঁড়াখুঁড়ির কারণে চলাচলেও ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় নালা ও সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। এসব কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হবে। আরও আগে উন্নয়নকাজ শুরু না করার বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কাজ হয়, অনেক ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। অনেক কারণেই আগে কাজ শুরু করা সম্ভব হয় না।
সম্প্রতি একদিন ঢাকায় সকাল সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এ বৃষ্টিতে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, মিরপুর ১০ নম্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আরামবাগ, ফকিরাপুল, মতিঝিল, রাজাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তবে সরকারি ছুটি থাকায় সড়কে লোকজনের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। জরুরি কাজে বের হওয়া লোকজন ভোগান্তিতে পড়েন। জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক জায়গায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার বিকল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, গতবারের চেয়ে এবার জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে। মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের কারণে সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গায় যান চলাচল বন্ধ। সামান্য বৃষ্টিতে বাকি অংশে পানি জমায় একটি গাড়িও চলতে পারছে না।
এই বৃষ্টিতে পূর্ব জুরাইন, মুরাদপুর ও দক্ষিণ দনিয়া এলাকা হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। অনেক বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে যায়। বিকেল পর্যন্ত পানি সরেনি। এলাকার বাসিন্দারা তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গত বছর এপ্রিল মাসে দৈনিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল গড়ে ৭ দশমিক ৬৭ মিলিমিটার। এবার এপ্রিলের প্রথম ২৫ দিনে গড় বৃষ্টিপাত ৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর এপ্রিল মাসের বৃষ্টিপাত ছিল অস্বাভাবিক। গতবারের তুলনায় এবার এপ্রিলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হলেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ