শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অপরিকল্পিত নগরায়নে বৈচিত্র্য হারাচ্ছে জনপদ কর্ণফুলী

কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) : নগরায়নের দৃশ্য

জে. জাহেদ, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) : কর্ণফুলীতে গড়ে ওঠেছে অপরিকল্পিত নগরী। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উপজেলায় বসবাস করা মানুষের সংখ্যা। বর্তমানে সম্প্রসারিত হচ্ছে অবকাঠামো সুবিধাও। এতে উপজেলায় নগরায়নের ফলে কমছে কৃষিজমি। ফসলি মাঠে গড়ে ওঠছে বহুতল ভবন।
অপরিকল্পিতভাবে মিল ফ্যাক্টরী, কারখানা, ইটভাটা ও বসতবাড়ি নির্মাণের কারণে কর্ণফুলীতে দিন দিন কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। গত দুই দশকে উপজেলায় কৃষিজমি কমেছে কমপক্ষে সহ¯্র একর।
এতে আগামী ২৫বছরে  খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া, ভবিষ্যত মানুষের বসবাস করার বসতি কোথায় হবে সে আশঙ্কা ও কম গুরুত্ব নয়। কংক্রিট কিংবা ইট পাথরের দালানে গ্রাস করছে উবর্র শক্তির ফসলি ধানি জমিগুলো।
বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা নির্মাণে ব্যবহারের কারণে প্রতিদিনই কমছে কৃষি জমি। জলাভূমিও ভরাট করে ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যাতায়াতে কর্ণফুলী নদীর শাখা খাল প্রভাবশালীদের দখলে অধিকাংশ। অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ, নগরায়ণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ইটভাটা, পুকুর খনন, মাছ চাষ ও নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে।
এ যেন দেখার কেহ নেই। আবার বড় বড় কোম্পানীর কাছে নগদ টাকার লোভে জমি বিক্রি করে বাস্তুহারা হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বাসগৃহ, দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট। আবার কোথাও কোথাও সরকারী ভূমি কতিপয় কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে।
মোদ্দাকথা পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ছোবলে বৈচিত্র্য হারাচ্ছে কর্ণফুলী উপজেলা। ইছানগর ও জুলধায় ইটভাটার জন্যও প্রতি বছর হাজার হাজার একর আবাদি জমি অনাবাদিতে পরিণত হচ্ছে। নানাভাবে কৃষি জমি উৎপাদনহীন কর্মকান্ডে ব্যবহার চলছে।
অচিরেই মানুষের বসবাসে পরিকল্পনা না নিলে সামনে বিপন্নতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই বিপন্নতা মোকাবিলায় সরকারের নানা সুরক্ষার পদক্ষেপ ও আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন উদাসী এবং কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ নেই বল্লে চলে।
স্থানীয়রা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ঘরবাড়ি তৈরির প্রয়োজন পড়ছে।  সাড়ে তিনহাজার মতো রোহিঙ্গা প্রবেশের কথাও রয়েছে। তার প্রভাব পড়ছে ফসলি জমির ওপর। পরিবার বিভক্ত হলে তার প্রথম ধকলটিই পড়ে কৃষি জমিতে। এক বাবার চার সন্তান পৃথক হওয়ার পরক্ষণেই আবাদি জমিতে যার যার বাড়িঘর গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়।
অনেকে চাকরির ওপর নিভর্রশীল হওয়ায় কৃষি জমির কোনো প্রয়োজনবোধ করছেন না। এরপরও আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবল। প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বহু হেক্টর জমি। আবাসন ও নির্মাণকাজে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বছরে যে পরিমাণ কৃষি জমি কমছে, তার অর্ধেকই যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। অপরিকল্পিত ব্যবহারের ফলে জমির উবর্রতা শক্তিও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ মিল কারখানা তৈরীতে রয়েছে সরকারী নানা নির্দেশনা। যা কেহ মানছেনা।
সরকারি কর্মকর্তাদের গাফলতি কারণেও কমছে কৃষি ও সরকারী খাস জমি এমন অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। জমির দাম বাড়ায় বিভিন্ন ইউনিয়নে সরকারী খাস জমি বা পুকুর ভরাট করে শ্রেণী পরিবর্তন করে দখল নিচ্ছে খাসজমি।
স্থানীয়রা জানায়, তবে প্রস্তাবিত কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে কৃষি জমিতে আবাসন, শিল্পকারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো রকম অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। জমি যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কৃষি জমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। দেশের যে কোনো স্থানের কৃষি জমি এ আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে এবং কোনোভাবেই তা ব্যবহারে পরিবর্তন আনা যাবে না।
কোনো অবস্থাতেই উর্বর জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া যাবে না। যে কোনো ধরনের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। আইনে বিচার ও দন্ড হিসেবে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনকারী বা সহায়তাকারীর অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদন্ড বা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবে।  এ আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা বা বন ও মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন।
চট্টগ্রাম শহরের অতি পার্শ্ববর্তী হওয়ায় কর্ণফুলীতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে আবাসন প্রকল্পসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিবেশের ছাড়পত্র কিংবা সরকার বিধি মেনে এসব শিল্পকারখানা কর্ণফুলীতে গড়ে ওঠেছে কিনা সেটাও জানা যায়নি।
পরিবেশেও মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। অপরিকল্পিত বাড়িঘর শিল্প-কারখানা বা রাস্তাঘাট তৈরি রোধ করে ভূমির শ্রেণী ও প্রকৃতি ধরে রেখে খাদ্যশস্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখা জরুরি হয়ে পড়ছে।
একটি আদর্শ ও মডেল উপজেলা গঠনে পরিকল্পিত নগরায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে একটি সম্ভাবনাময় নবসৃষ্ট উপজেলা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন থেকে ছিটকে পড়ে। আমাদের শহরগুলোও দিনে দিনে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। একটি সুন্দর বসবাসযোগ্য দেশ গঠনের পূর্বে একটি পরিকল্পনা জরুরী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ