মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২০
Online Edition

নিষিদ্ধ হচ্ছে ‘এনপিএস’ : ৩৫ দিনে ৪১৪৫ কেজির চালান ধরা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ৩১ আগস্ট থেকে ৪ অক্টোবর। এই ৩৫ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাধিক স্থানে ধরা পড়েছে ৪১৪৫ কেজির ‘এনপিএস’ বা ‘খাট’। নিউ সাইকোট্রফিক সাবসটেনসেস ‘এনপিএস’ বা ‘খাট’ হচ্ছে ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমিতে জন্মানো একধরনের উদ্ভিদের পাতা।
‘এনপিএস’ এক ধরনের বিকল্প নেশাদ্রব্য। কাথ শ্রেণিভুক্ত এক ধরনের উদ্ভিদ থেকে তৈরি এই নেশাদ্রব্য আফ্রিকার দেশগুলোতে বহু আগে থেকেই প্রচলিত। তবে ইদানিং বিভিন্ন দেশে হেরোইন বা ইয়াবার মত মাদকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ভেষজ নেশার পাতা। গত ৩১ আগস্ট শুক্রবার রাজধানী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো গুদাম এবং শান্তিনগরের এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে  প্রায় সাড়ে আটশ কেজি এই নেশাদ্রব্য উদ্ধার করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, তাদের ভাষায় যা বাংলাদেশে ‘নতুন’। এই নতুন নেশাদ্রব্যের বড় চালান ধরা পড়ার পর তার নামের সাথে পরিচিত হয়েছে বাংলাদেশ। 
রাজধানী ও চট্টগ্রামের একাধিকস্থানে গত কয়েক দিনে আটক হওয়া নতুন মাদক ‘খাট’ বা ‘এনপিএস’ মানবদেহের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এই ভেষজটি অন্যান্য  প্রাণঘাতী মাদকের মতোই ভয়ংকর।
এনপিএসকে দেখে অনেকেইে ‘গ্রিন টি’ মনে করে ভুল করতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই ভেষজটি সি ক্যাটাগরির মাদক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘আরবের চা’ বলেন। মাদকসেবীরা এই পাতা চিবিয়ে বা পানিতে ফুটিয়ে চায়ের মতো পান করে।
এই মাদক মূলত সোমলিয়া ও ইথিওপিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশে উৎপন্ন হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয় মধ্য প্রাচ্যসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়।
এনপিএস মানুষের শারীরিক ও মানসিক দুইভাবেই ক্ষতি করে থাকে। এ কারণে গত বছর পর্যন্ত ১১০টি দেশ এটিকে মাদক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের দেশে নিষিদ্ধ করেছে। জাতিসংঘের মাদক এবং অপরাধ ইউনিটের প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা এনপিএস’র প্রথম চালান ধরা পড়ার পর থেকে জানিয়ে আসছিলেন, এই পাতা আসছে আফ্রিকান দেশ ইথিওপিয়া থেকে। গত ৪ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত যে ৬টি চালান ধরা পড়েছে ওই সংস্থার হাতে তার সব ক’টিই এসেছে ইথিওপিয়া থেকে। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর যে চালানটি ধরা পড়েছে, সেটি কেনিয়া থেকে এসেছে বলে জানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সর্বশেষ চালানে এসেছে ৩৩২ কেজি এনপিএস। এ নিয়ে ৩৫ দিনে ৪১৪৫ কেজি এনপিএস’র চালান ধরা পড়লো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অভিযানে।
এদিকে, নতুনভাবে পরিচিতি পাওয়া এনপিএস বা খাট নিষিদ্ধ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি ‘গ্রিন টি’ নামে আমদানি হওয়া নতুন মাদক ‘খাট’ বা ‘এনপিএস’কে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। গত বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেছেন সংস্থার মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী মাদকের তালিকায় এনপিএস বা খাটকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি  প্রস্তাব আমরা ইতমধ্যে পাঠিয়েছি। কিছুদিনের মধ্যেই খাটকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে সরকার।
জানা গেছে, চলতি সপ্তাতেই এনপিএস বা খাট নিষিদ্ধের ঘোষণা সরকারের তরফ থেকে আসতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা, ৩১ আগস্টেই  প্রথম খাটের চালান বাংলাদেশে এসেছে বিষয়টা এমন নয়। ‘গ্রিন টি’র ঘোষণা দিয়ে খাট বাংলাদেশে আসছে কয়েক বছর ধরেই। এখানে ‘হারবাল মেডিসিন’ হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, যাঁরা খাট আনছেন, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, বাংলাদেশ মূলত ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখান থেকে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এ পর্যন্ত ২০টি প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে পেরেছেন তাঁরা; যাদের মাধ্যমে খাট আসে। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই ভুয়া নাম ব্যবহার করেছে।

‘খাট’ চালানের নেপথ্যে দু’ব্যক্তি
এদেশে ‘খাট’ আমদানির পেছনে দুই ব্যক্তি জড়িত বলে জানতে পেরেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) গোয়েন্দারা।
ডিএনসি’র সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, ‘রাজধানীর শান্তিনগরের নওয়াহিন এন্টার প্রাইজের অধীনে নাজিম নামে এক ব্যক্তির নামে ‘খাট’র চালান আসে ইথিওপিয়া থেকে। সেখান থেকে মাদক কারবারি জিয়াদ মোহাম্মদ ইউসুফ ‘খাট’র চালান বাংলাদেশে পাঠায়। গত ৩০ আগস্ট ৮৬০ কেজি খাটসহ নাজিমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছে থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জানতে পেরেছি- বাংলাদেশকে মাদকের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখান থেকে নতুন প্যাকেটে করে এসব মাদক যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পাচার করা হয়। খাট আমদানির নেপথ্যে ছিল নাজিম। যাকে বাংলাদেশের ‘খাট’র এজেন্ট বলা হচ্ছে।’’
জানতে চাইলে সিআইডি’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত ‘খাট’ সংশ্লিষ্ট ৩৪ ব্যক্তি ও  প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা হয়েছে। দেশে এই মাদকের বিস্তৃতি রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’’
ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩৫ দিনে ‘খাট’র সাতটি চালান জব্দ করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বাংলাদেশকে টার্গেট করে মাদক না আসলেও, দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক কারবারিরা। সর্বশেষ, গত ৪ অক্টোবর ইথিয়োপিয়ার পর কেনিয়া থেকে এলো নতুন মাদক এনপিএস বা খাট। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৩২ কেজি খাটের একটি চালান আটক করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউজের প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যরা।
ঢাকা কাস্টমস হাউজ জানায়, গত ২৩ আগস্ট খাটের এই ১৭টি কার্টুন সিঙ্গাপুর থেকে থেকে ঢাকায় আসে। এর আগে সেটি কেনিয়ার নাইরোবি থেকে সিঙ্গাপুরে এসেছিল। কেনিয়ার ওবিএসএ নাউয়ি প্রজেক্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেগুলো বাংলাদেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নওশীন এন্টারপ্রাইজের কাছে পাঠিয়েছিল। এও নওশীন এন্টারপ্রাইজের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে রাজধানীর কাকরাইলের ১২৪-৭-এ-শান্তিনগর প্লাজার চতুর্থ তলা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা কাস্টমস হাউজের উপ-কমিশনার ওথেলো চৌধুরী বলেন, আগের  প্রতিটি চালান ইথিওপিয়া থেকে এসেছিল। এবারই  প্রথম খাতের কোনো চালান কেনিয়া থেকে এলো। খাটগুলো ১৭টি কার্টুনে এসেছিল। এর আগেও শাহজালাল বিমানবন্দরে ছয়টি চালান আটক করা হয়।
উইকিপিডিয়া ঘেটে দেখা গেছে, হর্ন অব আফ্রিকা ও আবর উপ-দ্বীপাঞ্চলে জন্মায় গুল্ম জাতীয় এই মাদক। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘কাথা ইডুলিস’, যদিও স্থানীয়ভাবে একে খাট, কাট, খাত, ঘাট, চাট, অ্যাবিসিনিয়ান টি, সোমালি টি, মিরা, অ্যারাবিয়ান টি ও কাফতা নামেও ডাকা হয়।
খাটে অ্যালকালোইড ক্যাথিনন নামক এক ধরণের উদ্দীপক উপাদান থাকে, যার কারণে উত্তেজনা বাড়ে, ক্ষুধা কমে যায় এবং শরীরের উষ্ণতায় তারতম্য ঘটে। আমেরিকান কোকো পাতা, এশিয়ান পানের মতোই স্থানীয়দের মধ্যে হাজার বছর ধরে এই নেশা দ্রব্যের শুকনো পাতা চিবিয়ে খাওয়ার  প্রচলন রয়েছে।
তবে এর আসক্তি খুব ভয়ঙ্কর। খাটের কারণে অবসাদ, দৃষ্টিভ্রম, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দাসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে৷। বেশি রস চিবিয়ে নেশা করলে বিপদও মারাত্মক। বিশেষজ্ঞদের বলছেন, ‘দাঁত এবং মাড়িতে ঘা হতে পারে। এ ছাড়াও, ইন্দ্রিয় শক্তি এবং যৌনক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খাট জীবনী শক্তিও কমিয়ে দেয়।’
১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে মাদকদ্রব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। কানাডা, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে এটি অবৈধ না হলেও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ইসরাইলে এই উদ্ভিদের পাতা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থা- ডিইএ একে ক্ষতিকারক হিসেবে সতর্ক করেছে।
অপরদিকে আফ্রিকার দেশ জিবুতি, কেনিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া এবং ইয়েমেনে এর উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় এবং অবাধে সেবনের বৈধতা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ