মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২০
Online Edition

নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৯০ হাজারের অধিক মামলা দায়ের

গতকাল শনিবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

* ১-৫ অক্টোবর গায়েবী মামলার সংখ্যা ৪,১৪৯, জ্ঞাত আসামী ৮৬,৬৯২, অজ্ঞাত আসামী ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৭৭
* ২০০৯-এর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৪০, আসামী ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৭
স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৯০ হাজারের অধিক মামলা দেয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বিএনপি। গতকাল শনিবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত গায়েবি মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ১৪৯। এর মধ্যে এজহারের জ্ঞাত আসামীর সংখ্যা ৮৬ হাজার ৬৯২ এবং অজ্ঞাত আসামী হচ্ছে ২ লাখ ৭৬ হাজারর ২৭৭ জন। ২০০৯ সাল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিথ্যা মামলার সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৪০টি এবং আসামী সংখ্যা ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৭ জন।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এটা থেকে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয়, সরকার সম্ভাব্য সব রকমের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যেন বিএনপি নির্বাচনে যেতে না পারে, যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে না পারে। দেশনেত্রীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে আটক করে রাখা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় নির্বাসিত করে রাখা এবং আমাদের সিনিয়র নেতাদের মামলাগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে তাদেরকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার একটা প্রক্রিয়া তারা (সরকার) বের করতে পারে।
এরকম পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য অনুকূল নয় মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের জনগণ একটা নির্বাচন চায়। কেনো চায়? তারা এই অবস্থার পরিবর্তন চায়। সেই সেই নির্বাচনে যেন বিরোধী দল অংশগ্রহণ করতে না পারে তার জন্য সবরকম অবস্থা তারা তৈরি করে রাখছে। আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আমরা যে ৮ দফা দিয়েছি তা মেনে নিয়ে একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে গায়েবি মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গায়েবি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮৪ জন। রিমান্ডে গেছে ২৪৭ জন। আমাদের দক্ষিনের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল এখনো রিমান্ডে আছেন। একটার পর একটা রিমান্ড তার চলছে। ২০০৯ সাল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আসামীর সংখ্যা অবিশ্বাস্য। কেউ বিশ্বাস করবে না। ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৭ জন, জেল হাজতে আসামী সংখ্যা ৭৫ হাজার ৯২৫ জন, মোট হত্যার সংখ্যার ১ হাজার ৫১২ জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা বিএনপির নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার সংখ্যা ৭৮২ জন। মোট গুমের সংখ্যা ১ হাজার ২০৪ জন। এর মধ্যে পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত থেকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় ৭৮১ জন এবং গুম হয়ে আছে এখন ৪২৩ জন। ২০০৯ সাল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুরুতর জখম ও আহত হয়েছে ১০ হাজার ১২৬ জন। এসব আমাদের কাছে রেকর্ডেড। এর বাইরেও আছে যা রেকর্ডেড হয়নি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিদেশে দেশে তারা (সরকার) সবাই বক্তৃতা করার সময়ে বলছেন যে, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে এবং লেভেল প্ল্যায়িং ফিল্ড থাকবে, সবাই নির্বাচন করতে পারবে। এই পরিসংখ্যানে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয় সরকার সব প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যেন বিএনপি নির্বাচনে যেতে না পারে।
আমরা মনে করি এটা শুধু বিএনপির জন্য নয়, বিরোধী দলগুলোর জন্য নয় এটা সমগ্র জাতির জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ, বিপদজনক। কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে। আবার আগের নাটক শুরু হয়ে গেছে। মিরেরসরাইতে জঙ্গি আস্তানা। এই আলামত কিসের? কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে। কোন দিকে কোন উদ্দেশ্যে জাতিকে নিয়ে যেতে চায় এটা আমাদের কাছে বড় আশঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন থেকে বিএনপিকে দূরে রাখার জন্য এইভাবে গায়েবি মামলা দিচ্ছে। উদ্দেশ্য আবারো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটা একতরফা নির্বাচন করা। পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই যে, এইভাবে নির্বাচনের আগে সরকার নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে। যেটা বাংলাদেশ সরকার পরিকল্পিতভাবে এসব কর্মকান্ড করছে। গত ১০ বছরে নিজের অপকর্মের কারণেই তারা আতঙ্কিত হয়ে এসব কাজ করছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, এভাবে কোনো ভিত্তি ছাড়া মামলা দায়ের করে সরকার দেশে ন্যায়, সুবিচার ও সুবিচার বলতে যা বুঝায় তা একেবারেই নিঃশেষ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের আপামর জনগণকে আপনারা হেয়প্রতিপন্ন করছেন। আপনাদের যে দেশের মানুষের প্রতি কোনো আস্থা নাই সেটাই প্রমাণ করছেন এসব কর্মের মাধ্যমে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনের আগে ওয়ার্ড লেভেল পর্যন্ত যারা আমাদের নির্বাচন করবে তাদের সকলকে কারাগারে বন্দী করে রাখা। তারা চাচ্ছেন ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার।
দলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, সরকারের দায়েরকৃত ‘গায়েবি’ মামলার বিরুদ্ধে রিট করবে বিএনপি। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি যে, একটা মামলাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়ে, বিবেচনায় নিয়ে যেমন হাতির ঝিল মামলা যেকোন একটা মামলাকে নিয়ে আমরা হাইকোর্টে রিট পিটিশন করার চিন্তা করছি। যে অফিসার বাদী হয়ে এই মামলা (গায়েবি) দায়ের করেছেন তার বিরুদ্ধে কেনো সরকার বিভাগীয় পদক্ষেপ নেবে না, তার বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার বিরুদ্ধে কেনো শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে না। এই আলোকে আমরা একটা রিট পিটিশন করার চিন্তা করছি।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গায়েবি মামলাগুলো হাস্যকর ব্যাপার। অদ্ভুত কান্ড সরকারের একবারও বোধোদয় হচ্ছে না যে, এটা করে তারা সবাইকে বিপদে ফেলছেন। এই কাজগুলোর যারা জড়িত, যারা এই মামলাগুলো করছেন ভবিষ্যতে যদি এটাকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করা যায় তারা সবাই বিপদে পড়বেন। ইনক্লোডিং দ্য গবমেন্ট আইনতভাবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘সরকারের এসব ষড়যন্ত্রের’ মোকাবিলা করবে বলে জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ