মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২০
Online Edition

বেগম খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি

গতকাল শনিবার বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে আনা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালনক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: হারুন অর রশিদ। গতকাল শনিবার বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগার থেকে আমাদের এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। উনি এই মুহূর্তে কেবিন ব্লকের ৬ তলায় অবস্থান করছেন। উনি ভর্তি হওয়ার পরে উনার কেবিনে মেডিকেল বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী দেখেছেন এবং চিকিৎসা শুরু করার আগে যা যা ফরমালিটিজ তা সম্পন্ন করেছেন।
পরিচালক বলেন, আজ রোববার বেলা ১টার পরে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা উনার চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে পারবো ইনশাল্লাহ।
তিনি জানান, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুয়ায়ী মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠিত বোর্ডে রয়েছেন বোর্ডের সভাপতি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী, সদস্য রিমেটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জী, অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক নুকুল কুমার দত্ত ও ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ।
বেগম খালেদা জিয়াকে আপনি কেমন দেখেছেন প্রশ্ন করা হলে পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, দেখুন অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী সাহেব উনাকে দেখেছেন। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আগামীকালকে (রোববার) মেডিকেল বোর্ডের সভার পরে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবো।
খালেদা জিয়াকে খুবই অসুস্থ দেখা গেছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, উনি কিন্তু আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কুশল বিনিময় করেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় দেখা করেছেন এবং উনার সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত কথাবার্তা হয়েছে। খালেদা জিয়ার এই হাসপাতালে আসার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানান পরিচালক।
মেডিকেল বোর্ড যেটা করা হয়েছে তা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে কেউ থাকছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, জেলকোড অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সঙ্গে যার যার থাকার কথা, তারা থাকতে পারবেন। সংবাদ ব্রিফিঙের সময়ে বিএসএমএমইউ‘র অতিরিক্ত পরিচালক নাজমুল করীম মানিক ও সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেন সরকার উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি কথিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকার সাবেক পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ: বেগম খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড উচ্চ আদালতের নির্দেশনার অনুযায়ী পুনর্গঠিত হয় নাই বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ড্যাব এর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হারুন অর রশিদের ব্রিফিঙের পর গতকাল বিকেলে তিনি এই অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, আজকে যে মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে যে নামগুলো পরিচালক মহোদয় বলেছেন সেখানে যে তিনজন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয় নাই। সত্যিকার অর্থে উনার (খালেদা জিয়া) চিকিৎসার জন্য যে মেডিকেল বোর্ড আদালতের নির্দেশনার অনুযায়ী হওয়া উচিত ছিলো তা যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নাই বলে আমরা মনে করি এবং আমি মনে করি।
অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা ছিলো মেডিকেল বোর্ডে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ (স্বাচিব) ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর কেউ প্রাথমিক সদস্যপদও থাকতে পারবে না। এখানে বোর্ডে যাদেরকে রাখা হয়েছে বিশেষ করে যে তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যদি নাম ধরেই বলা হয় সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জী ও নুকুল কুমার দত্ত বলেন, উনারা তো স্বাচিবের লাইভ মেম্বার। এমন কি বদরুন্নেসা আহমেদ স্বাচিবের সদস্য। তাই আজকে বলতে হচ্ছে, আমি চিকিৎসক হিসেবে একথা বলা উচিত না- কে স্বাচিব কে ড্যাবের মেম্বার। সবার পরিচয় হওয়া উচিত চিকিৎসক। আদালতের যে নির্দেশনা সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উনাকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়া হয় এবং সম্মানের সঙ্গে যে চিকিৎসা প্রয়োজন সেটা যাতে দেয়া হয়।
তিনি বলেন, আজকে যে বোর্ড করা হয়েছে সেখানে আমরা সন্দিহান এই কারণে এখানে এমন সদস্য আছেন যাদের সম্পর্কে আপীলেট ডিভিশন তাদের মেডিকেল বোর্ড বাতিল করে দিয়ে নতুন বোর্ড করিয়েছিলন। যখন মেডিকেল বোর্ড নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিলো তখন আপীলেট ডিভিশন এই কাজটি করেছিলেন।
আজকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সাহেব যে ডাক্তার সম্পর্কে বলছেন যে, সে বারে বারে আইসা আমাকে বলতেন আপনি অসুস্থ, অসুস্থ। সেই ডাক্তার সাহেবও এই বোর্ডের সদস্য। আমরা যেটা বলতে চাই, বিশেষায়িত হাসপাতালে এনেছেন তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়ার জন্য। কার্ডিওলজি বিভাগের বলেন, রিমেটোলজি বলেন, ফিজিকেল মেডিসিন বলেন, অর্থোপেডিক্স বলেন, ইন্টারনেল মেডিসিন বলেন প্রত্যেকটা বিভাগেই অত্যন্ত প্রফেশনাল চিকিৎসক আছেন তাদেরকে নিয়ে মেডিকেল বোর্ড কোর্টের নির্দেশনা  অনুযায়ী করা হতো তাহলে আদালতের রায়ের প্রতিফলন ঘটতো।
যেভাবে আনা হলো হাসপাতালে: চিকিৎসার জন্য কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা ৪১ মিনিটের দিকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি গাড়িতে (ডিএমপি-৭১৬০) করে হাসপাতালে আনা হয়। খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িসহ র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবি পুলিশের আরো ১৫টি গাড়ির বহর বেলা ৩টা ৫ মিনিটে কারাগার থেকে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়। পরে গাড়িগুলো চানখাঁরপুল মোড় দিয়ে কাকরাইল হয়ে শাহবাগের বিএসএমএমইউ হাসপাতালে পৌঁছায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান ও শাহবাগ মোড়ে মুক্তিযুদ্ধ কোটা বহাল রাখার দাবিতে হাতেগোনা কিছু লোকের আন্দোলন চলার কারণে প্রায় এক ঘণ্টার যানজট ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছে গাড়ির বহর। বহরে খালেদা জিয়ার তিনটি লাগেজও ছিল। এরপর খালেদা জিয়াকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে করে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ৬১২ নং কক্ষে নেয়া হয়। সেখানে তার সাথে গৃহ পরিচারিকা ফাতেমাও রয়েছেন।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন গতকাল সকালে জানিয়েছেন, শনিবার বেলা ৩ টার পর যেকোনো সময় খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে নেয়া হবে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালের ৬১১ ও ৬১২ ডিলাক্স কেবিনে রাখা হবে। এজন্য আগে থেকেই হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ষষ্ঠতলার কক্ষ দুটি পরিষ্কার করা হয়েছে। আর খালেদা জিয়া আসার পর হাসপাতালের সিঁড়ি থেকে কেবিনে নেয়ার জন্য একটি হুইল চেয়ার প্রস্তুত রাখা ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি। তারা আমাদের যেভাবে বলেছেন, সেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি।
আজ মেডিকেল বোর্ডের সভা: বিএনপির কারাবন্দী চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড আজ রোববার দুপুরে সভা করবে। এরপর তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হবে। কারাগার থেকে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার পর সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হারুন-অর রশিদ। হাসপাতালের সি ব্লকের কনফারেন্স রুমে তিনি আরো বলেন, রোববার মেডিকেল বোর্ড গঠনের পর দুপুর ১ টায় সভা হবে। এরপর খালেদা জিয়ার শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে।
খালেদা জিয়ার পছন্দমতো চিকিৎসক বিষয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এরপরও খালেদা জিয়া কোনো চিকিৎসকের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করলে, সেখানে তার পছন্দের চিকিৎসকের ব্যবস্থা আমরা করব।
চিকিৎসক হিসেবে আছেন যারা: হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারপার্সন কারাবন্দী খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরান কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাকে চিকিৎসা করবেন বিএসএমএমইউর দুইজন ও তার পছন্দের তিনজন চিকিৎসক। বিএসএমএমইউ’র কার্ডিওলজি বিভাগের হারিছুল হক ও ইন্টারনাল মেডিসিনের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী। এছাড়া খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মামুন থাকবেন বলে মেডিকেল সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে খালেদা জিয়ার পছন্দের তিনজন চিকিৎসকের মধ্যে আর দুজনের বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিএসএমএমইউর ভিসি অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, আমাদের হাসপাতালে খালেদা জিয়ার পুরো চিকিৎসার বিষয়টি দেখভাল করছেন হাসপাতালের পরিচালক আবদুল্লাহ্ আল হারুন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এমএ জলিল চৌধুরী, কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ সজল ব্যানার্জি, অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ নুকুল কুমার দত্ত ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বদরুন্নেসা খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসক হিসেবে আছেন।
নেতাকর্মীদের ভিড়: চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে আনার খবরে দলটির নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। শনিবার দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও বিএনপি, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন।
খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার সময় ফটকে উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, আইনবিষয়ক সম্পাদক সানা উল্লাহ মিয়া, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহম্মেদ তালুকদার, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দিন আলম, আবু নাসের মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ, যুবদল নেতা গিয়াস উদ্দিন মামুন, চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার, শায়রুল কবির খান প্রমুখ। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনা হলে রোগীসহ উৎসুক জনতা ও নেতাকর্মীদের ভিড় দেখা যায়। এসব সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।
প্রসঙ্গত বন্দী জীবনে খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করার পর এপ্রিলের শুরুতে প্রথম তাকে বিএসএমএমইউতে এনে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপরও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত ৯ সেপ্টেম্বর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি এবং পছন্দমতো চিকিৎসক দেয়ার নির্দেশ দেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, খালেদা জিয়া যেন তার পছন্দের চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা করাতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে।
কারাগারে নেয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার দাবি জানান তার আইনজীবী ও দলীয় নেতারা। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার পছন্দ ছিল বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল। তবে সরকার কারাবিধি অনুযায়ী তাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার কথা জানায়। এক্ষেত্রে বিএসএমএমইউসহ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের প্রস্তাব দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। কিন্তু, এর কোনটিতেই চিকিৎসা নিতে রাজি হননি তিনি। এ অবস্থায় এপ্রিল মাসের শুরুতে প্রথম তার জন্য মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে সরকার। গত ৭ এপ্রিল এই বিএসএমএমইউতেই নিয়ে এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় তার। তবে তখন গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি বলে সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ড জানায়।
কিন্তু, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও হাসপাতালে ভর্তি বিষয়টি গত ৬ মাস ধরেই আলোচনায় ছিল। এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে সরকারি দল ও জোটভুক্ত দলগুলোর নেতারা প্রচুর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবিতে আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। একইদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি দলটির ৮ জন সিনিয়র নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে দেখা করে আবারও কারাবন্দী খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী রাজধানীর কোনও বিশেষায়িত হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানায়। একইসঙ্গে মেডিক্যাল টিম গঠনের অনুরোধও করে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে বিএসএমএমইউ। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরীকে বোর্ডের প্রধান করে গঠন করা বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী বীরু, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গঠিত এই মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা ১৫ সেপ্টেম্বর বিকালে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কারাগারের দোতলার কারাকক্ষে গিয়ে ২০ মিনিট ধরে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিএসএমএমইউ। তবে এ বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিএনপি থেকে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়। আদালতে এ সংক্রান্ত রিটের শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, মেডিকেল বোর্ডে সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসকরা আছেন তাই খালেদা জিয়ার সুষ্ঠু চিকিৎসা সম্ভব নয়। তারা খালেদা জিয়ার পছন্দের চিকিৎসক দিয়ে তার চিকিৎসার দাবি তোলেন। এরপর গত ৪ অক্টোবর আদালত সরকারপন্থী স্বাচিপ ও বিএনপিপন্থী ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এর চিকিৎসকদের বাদ দিয়ে ওই তালিকায় থাকা দুজন নিরপেক্ষ চিকিৎসক ও খালেদা জিয়ার পছন্দের তিনজন চিকিৎসককে নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। তবে বিশেষায়িত হাসপাতালের ক্ষেত্রে কারাবিধি ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিএসএমএমইউতেই তাকে দ্রুত ভর্তির নির্দেশ দেন আদালত। এ আদেশ অনুসারে নতুন করে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের পর গতকাল শনিবার (৬ অক্টোবর) খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ-এ ভর্তি করা হলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ