বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

মাহি চৌধুরীর কারণে বৃহত্তর ঐক্যে কামাল হোসেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে বি চৌধুরীর কমছে

আজ প্রায় সাত দিন হয়ে গেল ঐক্য প্রক্রিয়ার কোনো খবর নাই। সেই ঐক্য প্রক্রিয়ায় বিএনপির কথা বলুন, বা ২০ দলীয় জোটের কথা বলুন, কারো কোনো খবর নাই। ঐদিকে যুক্তফ্রন্ট এবং কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়ারও কোনো খবর নাই। পত্রপত্রিকায় জেনারালাইজ করে বলা হচ্ছে যে ড. কামাল হোসেন দেশে নাই। তাই ঐক্য প্রক্রিয়ার কাজ থেমে গেছে। এই বক্তব্যটি অত্যন্ত বেশি সরলীকরণ হয়ে গেল বলে আমার মনে হয়। কারণ কামাল হোসেন ছাড়াও আরো অনেক নেতা আছেন এই প্রক্রিয়ায়। বিএনপিতে যারা আছেন তাদের নাম আলাদা করে নাই বা বললাম। যুক্তফ্রন্টে ড. বি চৌধুরী, আসম রব , মাহমুদুর রহমান মান্না- এরা তো রয়েছেন। কামাল হোসেনের দলে কামাল হোসেন দেশের বাইরে থাকলেও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী রয়েছেন। আরো রয়েছেন ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি এবং আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এবং গণফোরামের নেতা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু। প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বক্তব্য অনুসারে এবং বিভিন্ন টকশোতে যে সব কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর সারমর্ম অনুযায়ী কামাল হোসেনের কারণেই ঐক্য প্রক্রিয়া থমকে আছে। এসব কথাকে যদি গ্রহণ করতে হয় তাহলে বলতে হবে যে সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় এখন ড. কামাল হোসেনের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে গেছে।
অথচ মাসখানেক আগেও এমন অবস্থা ছিল না। তখন যুক্তফ্রন্ট এবং তার নেতা ড. বি চৌধুরীকে নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছিলো। এখন মনে হচ্ছে, বি চৌধুরীর গুরুত্ব অথবা গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। তাই যদি হয় তাহলে এর জন্য তিনিও কম দায়ী নন। যদি সত্যি সত্যিই তার ওজন কমে গিয়ে থাকে তাহলে সেটি হয়েছে তার পুত্র মাহি বি চৌধুরীর কারণে। বি চৌধুরী তার পুত্র মাহি চৌধুরীকে সামাল দিতে পারেননি। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, সামাল দিতে চাননি।
আমাদের এই উপমহাদেশের দিকে তাকালেও দেখা যায় যে পুত্রদের কারণে রাষ্ট্র নায়কদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে এবং জনপ্রিয়তা কমে গেছে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর ভাবমূর্তি অনেক খানি নষ্ট করেছিলেন তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধী। সঞ্জয় গান্ধীর প্রভাবে ইন্দিরা গান্ধী জরুরী অবস্থাসহ এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেগুলো তার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হন এবং কিছু দিন কারাবাসও করেন। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের কিংবদন্তি ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। তিনি পশ্চিমবঙ্গে একটানা ২০ বছর মুখ্য মন্ত্রী ছিলেন। মাঝখানে তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করারও চিন্তা ভাবনা করা হয়। কিন্তু সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিএম) কেন্দ্রীয় দুই নেতা প্রকাশ কারাত এবং সিতারাম ইয়াচুরির বিরোধিতার কারণে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেননি যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঐ পদে বসতে চেয়েছিলেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিএমের অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন জ্যোতি বসু। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর পশ্চিম বঙ্গের সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ১২ বছর ক্ষমতায় থাকেন। সর্বশেষ যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি পশ্চিম বঙ্গে কমিউনিস্টদের ৩২ বছরের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেন।
জ্যোতি বসুর ত্যাগতিতিক্ষা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। সারা ভারতে তার সুনাম ছিল। কিন্তু জ্যোতি বসুর একমাত্র পুত্র চন্দন বসুকে নিয়ে জ্যোতি বসুর ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণœ হয়। পশ্চিমবঙ্গের সিপিএমের বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি অভিযোগ করেন যে পিতার প্রধান মন্ত্রীত্বের সুনাম এবং প্রভাব খাটিয়ে তার পুত্র চন্দন বসু ব্যবসা বাণিজ্য বাগিয়ে নিয়েছেন এবং অনেক বড় লোক হয়েছেন।
॥দুই॥
পিতা বি চৌধুরীর কারণেই পুত্র মাহি বি চৌধুরী রাজনীতিতে আসেন এবং বিএনপিতে যোগদান করেন। পিতার শূন্য আসনে বিএনপির টিকিটে তিনি এমপি হন। বিএনপি না হলে তার কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকতো না। কিন্তু এবার যখন তিন দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো তখন থেকেই মাহি চৌধুরী সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হন। যতদূর খবর পাওয়া যায় সেসব খবর থেকে জানা যায় যে বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহত্তর ঐক্যের প্রস্তাব নিয়ে সর্ব প্রথম বি চৌধুরীর বাস ভবনেই যান। যে দিন মির্জা ফখরুল বি চৌধুরীর বাস ভবনে যান তার আগের দিন মাহি চৌধুরী আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। বি চৌধুরীর সাথে ফখরুলের যখন বৈঠক চলছিল তখন সেখানে মাহি চৌধুরীর উপস্থিত থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তিনি ঐ বৈঠকের মাঝে গ্যাট হয়ে বসে থাকেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে মাহি চৌধুরী বিকল্প ধারার যুগ্ম মহাসচিব। বৈঠকের এক পর্যায়ে মাহি চৌধুরী হঠাৎ দাবি করেন যে তারা ঐক্য করতে রাজি আছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে যুক্তফ্রন্টকে ১৫০টি আসন দিতে হবে। হঠাৎ করে এই দাবি উত্থাপন করায় তার পিতা বি চৌধুরীও কিছুটা বিব্রত হন। যাই হোক, এই দাবির ফলে বি চৌধুরী ও মির্জা ফখরুলের বৈঠক সফলতা পায়নি। তবে সেটি ঠিক অসফল না হয়ে বৈঠকটি স্থগিত হয়ে যায়। যুক্তফ্রন্টের অপর দুই শরিক জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্য মাহি চৌধুরীর এই দাবির খবর শুনে চরম বিব্রত হন এবং তাদের নেতা বি চৌধুরীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন। বি চৌধুরী কোনো রকমে একটি প্রলেপ দিয়ে সেই মুহূর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দেন।
কিন্তু মাহি বি চৌধুরী তার এই ধরনের অগণতান্ত্রিক মনোভাব পরিত্যাগ করেননি। তিনি ঐ ১৫০টি সিটের দাবির সাথে আরো নতুন নতুন দাবি তার ফর্দে যোগ করেন। এর মধ্যে যেগুলি উল্লেখযোগ্য সেগুলি হলো, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে তোলা যাবে না এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার দাবিও ঐক্য প্রক্রিয়ার ফোরামে তোলা যাবে না। এসব দাবি তিনি শুধুমাত্র যুক্তফ্রন্টের মিটিংয়েই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সরকারি দলের সদস্যদের মতো একাত্তর টিভিতে একাধিক দিন উত্থাপন করেন এবং বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন। এছাড়া তিনি জামায়াতে ইসলামীকে একটি ইস্যু বানান। বলেন যে, জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী। তাই তাকে যুক্তফ্রন্ট বা ঐক্য প্রক্রিয়ায় নেয়া যাবে না। তিনি আরো দাবি করেন যে, শুধুমাত্র ঐক্য প্রক্রিয়াই নয়, ২০ দলীয় জোট থেকেও জামায়াতে ইসলামীকে বহিষ্কার করতে হবে। তাঁর এসব উদ্ধত আচরণের ফলে তার তীব্র সমালোচনা করেন এক সময় বিএনপি নেতা এবং পরবর্তীতে এলডিপি নেতা কর্ণেল অলি আহমেদ।
বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রসঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেছেন, আমরা আগেও বলেছি, যতো লোককে নিয়ে পারা যায় ঐক্য করা ভালো। অলি আহমেদ বলেন, বিকল্প ধারার সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী যখন বিএনপির মহাসচিব ছিলেন, তখন মুসলিম লীগের শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। জয়পুরহাটের আব্দুল আলীম রেলমন্ত্রী ছিলেন। এ ধরনের অনেকেই বিএনপিতে ছিলেন। ডা. বদরুদ্দোজা সাহেব তাদের মহাসচিব ছিলেন। তাহলে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্যে পার্থক্য হচ্ছে কেন? মাংস হালাল, আর ঝোল হারাম, এটা কেন?
ঐক্য গড়তে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে, বি. চৌধুরীর এমন শর্তের বিষয়ে এলডিপি সভাপতি বলেন, বি. চৌধুরী সাহেব যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখনতো মুজাহিদ ও নিজামী সাহেব মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। আমিতো সেদিন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলাম না। দোকানদারদের কাছে যারা পরাজিত হয়েছেন, যাদের পেছনে কোনো লোক নেই তাদের মাহাথির মোহাম্মদ বানানো যাবে না। মাহাথির মোহাম্মদ মালশিয়ার জন্মদাতা। আধুনিক মালয়েশিয়ার নির্মাতা যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নেই। আর আমরাতো ছেলের কাছেই বিক্রি হয়ে যাই। আমাদের ছেলেরা ভিওআইপির ব্যবসা করে। আমাদের ছেলেরা মানে যারা আজকে ঐক্যজোটে তাদের অনেকের ছেলে ভিওআইপির ব্যবসা করে। তাহলে ভিওআইপির ব্যবসা কার থেকে নিয়েছে? আওয়ামী লীগের কাছ থেকে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে নিয়েছে। আর এদিকে বলছে আমরা ঐক্য করছি। রুমের ভেতরে থাকলে এক রকম, বাইরে বের হলে অন্যরকম। কখনো বলে ঐক্যজোটে আছি কখনো বলে ঐক্য জোটে নেই।
মাহি চৌধুরীকে সামাল দেয়ার কোনো চেষ্টা বি চৌধুরী করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। মাহি চৌধুরীর এই আচরণে যুক্তফ্রন্টের অপর দুই শরিক এবং গণফোরামও খুবই ক্ষুব্ধ। ঘনিষ্ঠ জনদের কাছে তারা এমনও বলেছেন যে এই মাহি চৌধুরীর কারণেই ঐক্য প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে। তারপরেও বি চৌধুরীর চৈতন্যোদয় ঘটছে না। এর অবধারিত পরিণতিতে যুক্তফ্রন্টের দুই শরিক, এমনকি বিএনপির কাছেও বি চৌধুরীর গুরুত্ব দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং তার পাশাপাশি ড. কামালের গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। অথচ সর্বপ্রথম বি চৌধুরীকেই বিএনপির বর্তমান শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অভিভাবক হিসাবে সম্বোধন করেছিলেন। মাহি চৌধুরীকে যদি তার পিতা বি চৌধুরী এখনো সামাল না দেন তাহলে খুব শীঘ্রই বিকল্প ধারা এই ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
॥তিন॥
এমন একটি বিব্রতকর অবস্থার মধ্যেও মাহি চৌধুরীকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্য। বিএনপিও এই দুটি দলকেই অনুরোধ করেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। গত শুক্রবার দৈনিক প্রথম আলো খবর মোতাবেক ঐক্য প্রক্রিয়া বসে থাকবে না। তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাত দফা দাবিতে বিএনপির দুই দিনের কর্মসূচি শেষ হয়েছে। দলটি নতুন কর্মসূচি দিতে যাচ্ছে। নতুন কর্মসূচিতে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদেরও যুক্ত করতে চান বিএনপির নীতি নির্ধারকেরা। এ জন্য দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দলের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র প্রথম আলোকে জানান, নতুন কর্মসূচি বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। তবে আবারও বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশসহ নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দেয়া হবে। এভাবে তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত বিএনপি মাঠে কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করতে বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। সেখানে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হলেও তা চূড়ান্ত করা হয়নি।
প্রথম আলোর রিপোর্ট মোতাবেক বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের দিন ১০ অক্টোবর ধার্য আছে। আলোচিত এই মামলায় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অন্যতম আসামী। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা এই মামলায় নেতিবাচক রায়ের আশঙ্কা করছেন। আলোচ্য রিপোর্ট মোতাবেক নতুন কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে, যাতে সরকার ২১ আগস্ট মামলার রায়ের সঙ্গে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে গুলিয়ে ফেলতে না পারে।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ