বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিকসের গল্প

মোহাম্মদ সুমন বাকী : ফ্ল্যাড লাইটের ঝলমলে আলো আলোকিত করে তুলে ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে। একঝাঁক তরুণ এ্যাথলেট হাসি-খুশি মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের মাঠের স্পর্শে। তা চারকোনার স্কয়ার। দু’পাশে ফুটবল খেলার বার। এর আলতো ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে গোলাকার বৃত্তের এ্যাথলেটিকস ট্র্যাক। যেখানে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ পড়ে আছে একের পর এক আয়োজিত ইভেন্ট লক্ষ্য রেখে। যা নতুন করে না বললেও হয়। ভবিষ্যতের দিকে তাকালে উঁকি দেয়া অজানা ভয়! না জানি কী হয়!! সেখানে অংশগ্রহণকারী এ্যাথলেটিকস প্লেয়ারের সংখ্যা কম নয়। যাদের পরিচয় বালক, বালিকা, কিশোর, কিশোরী, তরুণ, তরুণী। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে লাল-সবুজ পতাকার ছায়াতলে থাকা ও ক্রীড়া ভুবনে। বিভিন্ন ইভেন্টের দৌড়, জ্যাম্প, থ্রো, পারফরম্যান্স সো করার ক্ষেত্রে অন্যতম আকর্ষণ। সেটা দেখার জন্য খেলা পাগল ভক্তদের উপস্থিতিও কম হয় না। তবে বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি আলাদা। তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে কি? এখানে আশানুরূপ দর্শক পাওয়া যায় না। যা শতভাগ সত্য কথা। তবে মুখে মুখে এর পছন্দও কম নয়। সেটা ফুটে উঠে ভালোবাসা থেকে। একেবারে অন্তরে অন্তরে নাড়া দিয়ে। বলেন কি? ঠিক সে রকম দৃশ্য ভেসে উঠেছে ঢাকা বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। ফ্ল্যাড লাইটের আলো ঝলমল করছে। ২০১৮ জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে। শামীমা সাত্তার মিমু। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) কর্মরত সে। সাবেক তারকা এ্যাথলেট তিনি। গত শতাব্দীর সত্তর, আশির দশকে ট্র্যাকে একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন যিনি। মিমু ছিলেন দারুন পারফরম্যান্সের আস্থার প্রতীক। তাকে নিয়ে অভিহিত করা যায় এভাবে বাংলাদেশের অন্যতম উপহার।
চারদিকে নব তারকার সমাহার। এক বাক্যে অনায়াসে বলা যায় তা খুবই চমৎকার। সেই জন্য পরিবেশন হচ্ছে এ্যাথলেটিকসকে ঘিরে গায়ক আসিফ আকবরের রেকর্ড করা গানের বাহার। যা উত্তেজনার সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছে। সেটা সকল খেলোয়াড়ের মাঝে। বাংলাদেশ এ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের এমন আয়োজন খুবই সুন্দর। তা বলাবাহুল্য। যা সবার বোধগম্য। সেটা এই খেলার প্রাথমিক লেবেল মজবুত করবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে! তা থেকে দেশের এ্যাথলেটিকস কি লাভবান হবে? সেটা হলে এই আয়োজনের স্বার্থকতা ফুটে উঠবে। এমন বিষয়ে বিকেএসপির কর্মকর্তা ও সাবেক এ্যাথলেট শামীমা সাত্তার মিমু বলেছেন, এই ভুবনে সবকিছু পেয়েছি। আমি সফল হয়েছি। যা আমার ক্রীড়া ক্যারিয়ারে বড় সম্বল। তা প্লেয়ার এবং কর্মকর্তা হিসেবে। পদক জিতেছি বহুবার। যা আমি পেয়েছি ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকার স্পন্সর ছিলো না আমার। টিম ও পারিবারিক সাহায্য নিয়ে এগিয়েছি। সেটা বরাবরের ন্যায়। বর্তমান সময়ে একই সিস্টেম বিরাজ করছে। খেলোয়াড়দের বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর নেই। অবশ্য তা দেখে অবাক হইনি আমি। কারণ জুনিয়র এ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতার স্পন্সর নাই। সেখানে এ্যাথলেটরা পাবে কি করে? তাই পারফর্ম সুপার ধারায় অবস্থান নিলেও তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে থেকে যায়। সুতরাং এ্যাথলেটিকসের পারফেক্ট উন্নয়নে স্পন্সর প্রয়োজন। যা আমার স্পষ্ট কথা। রূপা খাতুন লাল-সবুজ পতাকা দেশের অন্যতম বেস্ট পারফর্মার। কিশোরী লেবেলের খেলোয়াড় সে। বিকেএসপির ছাত্রী রূপা। এবারের জুনিয়র প্রতিযোগিতায় দ্রুততম কিশোরী খেতাব পেয়েছেন। স্বর্ণ পদক জিতেছেন তিনি। সেটা তার ধারাবাহিক পারফর্ম বজায় রাখার উপহার। রূপা খাতুন দারুন প্লেয়ার। যার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। এমন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ এ্যাথলেটিকস ফেডারেশন কর্মকর্তা ইয়াহিয়ার ভাষ্য, রূপা পরীক্ষিত এ্যাথলেট। এই বিষয়ে বিন্দু পরিমান সন্দেহ নেই। সে সফল তারকা। ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক জয় করে এর প্রমাণ রেখেছে কয়েকবার। তাকে প্রশিক্ষণের সময় ক্যাম্পে দেখেছি।
আমার মতে, খুবই পরিশ্রমী প্লেয়ার রূপা খাতুন। সে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের জন্য সাফল্য আনতে পারবে। তাই প্রয়োজন স্পন্সর। যা মনে করি আমি। দুই দিনব্যাপী জুনিয়র এ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা চলাকালীন সময়ে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম শামীম। স্পন্সর বিষয়ে তার মন্তব্য, খেলাধুলা বিকাশ পায় প্রচার করার মাধ্যমে। দেশের মিডিয়া সেই কাজটি ঠিক মতো করে যাচ্ছে। তা সবাই জানেন। জুনিয়র এ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশীপে স্পন্সর নেই! এতো প্রচার দেবার পরও!! যা অবাক করে আমাকে!!!
কিন্তু এখন আমার প্রশ্ন সেটা কেন? আমি মনে করি, স্পন্সর যোগাবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ্যাথলেটিকস ফেডারেশন একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে এবার। তা ঠিক। তবে এ সংস্থার কর্মকর্তারা অন্যদিকে সফল। যা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটা নিজস্ব ফান্ডকে লক্ষ্য রেখে। এর উপর ভর করে তাদের কর্তৃক দুই দিনব্যাপী বিশাল বাজেটের এই টুর্নামেন্ট আয়োজন হয়। তা অবশ্যই আলোচিত বিষয়। কি বলেন? ১০০ মিটার স্প্রিন্টে বালিকা বিভাগে সেরা হন সুমাইয়া দেওয়ান। মানিকগঞ্জ জেলার মেয়ে সে। এক কথায় দারুন পারফর্মার তিনি। সুমাইয়া বিকেএসপির ছাত্রী। এ্যাথলেটিকসের আকর্ষনীয় ইভেন্ট ১০০ মিটার দৌড় (স্প্রিন্ট)। সেখানেই বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) হয়ে আলোকিত ধারায় সাফল্যের ঝলক দেখায় সে। অন্যদের পিছনে ফেলে স্বর্ন পদক জয় করে। যার উদ্ভাসিত নৈপূন্যের তুলনা হয় না। বিকেএসপির সফল নব তারকা এ্যাথলেট সুমাইয়া ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন, আমার প্রাথমিক টার্গেট এস এ গেমসে স্বর্ন পদক গলায় ঝুলিয়ে রাখা। তা বলাবাহুল্য। দক্ষিন এশিয়ার দ্রুততম মানবী হওয়া। পরের ধাপগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার স্বপ্ন ঠিকই আছে। যা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনার ছক আঁকতে হবে। সেটা কি ভাবে? তা জানিনা! কারণ এখানে স্পন্সরের অভাবটাই আসল সমস্যা। যা ক্রীড়া প্রেমীরাও জানেন। এমন ক্ষেত্রে সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা খুবই দরকার। মামুন আলী বিকেএসপির ছাত্র। এই দলের হয়ে একই ইভেন্টে স্বর্ন পদক জিতেন। প্রতিযোগিতায় তিনি দ্রুততম বালক হয়েছেন। তার লক্ষ্য সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে ভালো রেজাল্ট করা। মামুনের জন্ম কুষ্টিয়া জেলায়। মাসুদ রানা আরেক সফল এ্যাথলেট। রূপা খাতুন, সুমাইয়া দেওয়ানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সোনার মেডেল জিতে সে। তার দল যথারীতি সেই বিকেএসপি। তাদের মাঝেই অন্যতম যুব তারকা এ্যাথলেট নবিউল হাছান নবি। কক্সবাজার জেলা দলের প্লেয়ার তিনি। সে খুবই হতাশ। স্পন্সর নেই বলে।
এ অবস্থায় হকি দলে নাম লেখায় সে। এ ব্যাপারে নবিউল জানিয়েছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়? বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের লক্ষীপুর জেলার মেয়ে তাছলিমা আকতার। সে ভাড়াটে খেলোয়াড়!  জুনিয়র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে কক্সবাজার জেলা টিমের পক্ষে। যার প্রতিভা রয়েছে। তা কি ধরে রাখতে পারবে সে? যা সময়ই বলে দিবে! স্পন্সর নেই!! সেটা নিয়ে তাছলিমারও হাতাশা! তা কি কেটে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাঝে শেষ হলো জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতার গল্প। খেলা পাগল ভক্তদের ক্রীড়াটির প্রতি ভালোবাসা প্রয়োজন অল্প অল্প। যা ধাপে ধাপে এনে দিবে জোয়ার। এমন প্রত্যাশা সব প্লেয়ারের হৃদয়ে ভেসে উঠে বার বার। উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ ও ২৯ তারিখে সমাপ্তি ঘটে এ প্রতিযোগিতার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ