শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

এশিয়া কাপ থেকে বিদায়ে চাপে সরফরাজ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : যে দলটি গত বছর ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল, সেই দলটিই কিনা এশিয়া কাপে নিজেদের অতি পরিচিত মাঠে নাস্তানাবুদ হয়ে দেশে ফিরলো। তখন দলপতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সবাই। এখন অনেকেই তার পদত্যাগ দাবি করছে। এশিয়া কাপে খুব বাজেভাবেই হারে পাকিস্তান। চ্যাম্পিয়ন ট্রপিতে যারা ছিলেন সেখান থেকে মাত্র কয়েকটি পরিবর্তন ছিল এই দলে। যদিও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার পর সোনালি প্রজন্মের দল হিসেবে দাবি করেছিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ। সেই দলটি ফাইনালে উঠতে পারেনি। তবে যদি খেলাটা হতো প্রতিদ্বন্ধি তাহলে এতো সমালোচনা হতোনা। ভারতের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত দুটি ম্যাচেই তারা বাজেভাবে হেরেছে। সুপারফোরে তিন ম্যাচের দুটিতেই হেরে বিদায় নিয়েছে পাকিস্তানিরা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিও ছিল কষ্টসাধ্য জয়ের। এখন তাই চাপের মুখে সরফরাজ। অধিনায়ক সেটা দেশে ফেরার আগেই বুঝতে পেরেছেন। দেশে ফিরে দারণ চাপে রয়েছেন সরফরাজ।
এশিয়া কাপের প্রথম থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন সরফরাজ। ঘুমাতে পারেননি ঠিকমতো। আর বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটির আগের রাতে তো ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তান দলের অধিনায়ক হিসেবে একেবারে নিজের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ম্যাচটি ছিল তার। জিতলে অধিনায়ক থাকার চাপটা একেবারেই কমে যেত, আর হারলে তোপের মুখে পড়বেন সেটাও নিশ্চিত ছিল। কারণ ভারতের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচেই বাজেভাবে হেরে যাওয়াতেই চরম সমালোচিত হচ্ছিল পাকিস্তানিরা। শুধু হংকংয়ের মতো খর্বশক্তির দল ছিল গ্রুপে, সে জন্যই তো সুপারফোর খেলার সুযোগ পেয়েছিল তারা।
নাহলে অন্যরকম হতে পারতো পরিস্থিতি। সেটা সুপারফোরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়ায় ম্যাচটিতে শেষ ওভারে গিয়ে জিতেছিল সরফরাজরা। এরপরও বাংলাদেশের বিপক্ষে আবুধাবীতে জিতলেই ফাইনাল খেলার সুযোগ পেয়ে যেত পাকিস্তান। সুযোগ থাকতো ফাইনালে গিয়ে ভারতের ওপর প্রতিশোধ তোলার। কিন্তু সেটিতো হলো না।
গত দেড় বছরে ব্যাট হাতেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি সরফরাজ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচজয়ী ফিফটি হাঁকানোর পর থেকে তার ব্যাটিং গড় মাত্র ১৭.২! এ কারণে তার ব্যাটিং অর্ডারেও নির্দিষ্ট কোন স্থান নেই। ৪, ৫ ও ৬ নম্বরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলেছেন তিনি। নিজের পারফর্মেন্স এবং দলের অবস্থার কারণে এখন তীব্র চাপটা বেশ ভালভাবেই অনুভব করছেন সরফরাজ। তিনি বলেন, ‘দেখুন, অধিনায়কত্বের চাপটা সবসময়ই থাকে। পাকিস্তানী অধিনায়করা সে যেই থাকুক- অনেক বেশি চাপে থাকে। অবশ্যই যখন নিজে পারফর্ম করতে পারবেন না এবং দলও হারতে থাকবে তখন চাপটা অনেক বেড়ে যায়। সত্য কথাটা হচ্ছে আমি যদি এখন বলি গত ৬ রাত আমি নির্ঘুম কাটিয়েছি, কেউ আমাকে বিশ্বাস করবে না। এটাই জীবনের অংশ এবং এভাবেই সব এগিয়ে যাবে। আমি আবার বলব যে আমাদের কখনও প্যানিক বাটনে চাপ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না।’
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে তিন ফরমেটেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরফরাজ। তখন থেকে দলের নৈপুণ্যে উত্থান-পতন রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তারচেয়ে শুধু ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট ও ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলিই বেশি ম্যাচ খেলেছেন। শুধু মা অসুস্থ থাকার কারণে ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজটাই খেলেননি সরফরাজ। কিন্তু তিনি দলে থাকা অবস্থায় উইকেটরক্ষক হিসেবেও কোন বিকল্প রাখা হয়নি দলে। তাই সরফরাজের নির্ঘুম রাত কাটানো খুবই স্বাভাবিক। এশিয়া কাপে দলের এমন বিদায়ের পর হয়তো সরফরাজের বিশ্রামটাই বেশি জরুরী। তিনি বলেন, ‘এটা চিন্তা করা আমার কাজ নয়, নির্বাচক কমিটি ও পিসিবির কাজ এটি। তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে দিন। আমার কাজ খেলা এবং আমি খেলব, খেলেই যাব।’
এশিয়া কাপ থেকে ছিককে পড়ার পরই দল নিয়ে ভাবতে হচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেটচ বোর্ডকে। আপাতত ‘অধিনায়ক’ খ্যাত হাফিজকে দলে ফেরানো হয়েছে। যদিও ফেরার আশা বোধ হয় তিনি নিজেও ছেড়ে দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ হাফিজ সবশেষ পাকিস্তানের হয়ে টেস্ট খেলেছেন প্রায় দুই বছর হতে চলল, ২০১৬ সালের আগস্টে। আমিরাতে আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য ঘোষিত ১৭ সদস্যের দলেও ছিলেন না। হঠাৎ বাড়তি একজন ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন পড়ল, ডাক পেলেন ৩৮ ছুুঁই ছুুঁই অভিজ্ঞ এই অলরাউন্ডার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আগামী ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে পাকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার দুই টেস্টের সিরিজ। মূলত দলের অনভিজ্ঞ টপ অর্ডারে শক্তি বাড়াতেই হাফিজের অকস্মাৎ অন্তর্ভুক্তি। পাকিস্তানের এই দলটিতে উপরের ব্যাটসম্যানরা একেবারেই অনভিজ্ঞ। ইমাম উল হক খেলেছেন মাত্র তিনটি টেস্ট, ফাখর জামানের এখনও বড় ফরমেটে অভিষেক হয়নি। হঠাৎ ডাক পাওয়া হাফিজ সম্ভবত টেস্ট ফরমেটে ফেরার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। ৫০ টেস্টের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অলরাউন্ডার ২০১৬ সালের আগস্টের পর থেকে নির্বাচকদের বিবেচনার বাইরে। শুধু টেস্ট নয়, সীমিত ওভারেও আস্তে আস্তে জায়গাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে হাফিজের।
সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপে ডাক পাননি। রঙিন পোশাকে সবশেষ খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি২০তে, চলতি বছরের জুলাইয়ে। এমন সময়ে টেস্ট দলে ডাক পাওয়া, চমক জাগানোর মতো খবরই!
এছাড়া ঘোষিত দলের আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ আমিরের বাদ পড়া। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পর যিনি ছিলেন দলের অতিগুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে। কিন্তু এবার এশিয়া কাপে বাজে পারফর্মেন্সের মূল্য দিতে হয়েছে তাকে। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের হয়ে বাজে পারফর্মেন্সের কারণে আরব আমিরাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েছেন বহুল আলোচিত এই বাঁহাতি পেসার। রঙিন পোশাকে ম্লান হলেও ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এ বছর খেলা তিন টেস্টে ১৮.৪ গড়ে ১২ উইকেট নিয়েছেন আমির। তারপরও এই সংস্করণে জায়গা হয়নি। পেস আক্রমণে হাসান আলী, ওয়াহাব রিয়াজ ও ফাহিম আশরাফদের সঙ্গে রয়েছেন স্পিনার ইয়াসির শাহ, শাদাব খান ও বিলাল আসিফ। ডাক পেয়েছেন ২৬ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার মির হামজা। ৫৬ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে তার বোলিং গড় ১৭, ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ২৬ বার। আগামী ৭ অক্টোবর দুবাইয়ে শুরু হবে প্রথম টেস্ট।
এদিকে ক্রিকেট মাঠে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। ক্রিকেট বিশ্বে চিরপ্রতিদ্বন্ধী এই দুই দেশের লড়াই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলকেও (আইসিসি)। কিন্তু দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্ধের কারণে এখন আর তাদের মাঠের লড়াইয়ে দেখা যায় না বললেই চলে। আইসিসির বা এশিয়া কাপের বিভিন্ন ইভেন্টে মাঝে মাঝে ভারত-পাকিস্তানের খেলা দেখা যায়। তবে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হচ্ছে না প্রায় এক দশকের বেশি সময় হতে চলল। আর ভারতের সঙ্গে এই ক্রিকেটীয় বিরোধ মেটাতে এবার শেষ পর্যন্ত আইসিসিতে আইনী যুদ্ধে নেমেছে পাকিস্তান। আইনী এই প্রক্রিয়ায় আইসিসির সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত পদক্ষেপ। আপীলের সুযোগ থাকবে না কোন পক্ষেরই।
১ অক্টোবর দুবাইয়ে শুনানি শুরু হয়ে চলেছে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। আইসিসি এ ব্যাপারে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। যেখানে মাইকেল বেলফকে প্রধান করে আরও রাখা হয়েছে জন পাউলসন এবং ড. আন্নাবেলে বেন্নেত্তে। জানা যায়, এই তিন জন যা সিদ্ধান্ত নেবেন, দুই বোর্ডকে সেটিই মেনে নিতে হবে। তবে যুক্তির বিচারে মামলা করা পাকিস্তান এগিয়ে থাকবে বলে ইঙ্গিত মিলছে। বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। উল্লেখ্য, ভারত-পাকিস্তান সবশেষ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলেছে সেই ২০০৭ সালে। পরে দু’দলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে দীর্ঘমেয়াদি খসড়া হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি ভারতের হস্তক্ষেপের কারণে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ