শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

সাকিবের ইনজুরির ভেতর- বাহির

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় সবার উপরেই থাকবে সাকিব আল হাসানের নাম। খ্যাতিতে ছাড়িয়ে গেছেন সমসাময়িক সবাইকে। মাঠের মতো মাঠের বাইরেও পরিচয় দিচ্ছেন সফলতার। তবে ইনজুরি নিয়ে বেশ বিপাকেই পড়েছেন বর্তমানে ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে দুইয়ে নেমে যাওয়া জাতীয় দলের ওয়ানডে ও টোয়েন্টি-২০ অধিনায়ক। একে ফিজিও গাফিলতি দেখছেন কেউ কেউ। সেই ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফে ফিজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ফিজিও জন গ্লুস্টার বাংলাদেশ দলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভারত জাতীয় দলের চাকরি নিয়েছেন। বাংলাদেশ দলের সর্বশেষ দীর্ঘমেয়াদী ফিজিও ভিভব সিংয়েরও নাম ডাক যথেষ্ট।
অথচ ইংলিশ ফিজিও ডিন কনওয়ের পর ফিজিও’র দায়িত্বটা যাকে দেয়া হয়েছে, সেই শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক থিহান চন্দমোহনকে নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শ্রীলঙ্কা সফরকালে দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই ফিজিও’র ভুল রোগ নির্ণয়ে বড় ধরনের বিপদ ঘটে যেতে পারত। সাকিব আল হাসানের মতো অলরাউন্ডারের ক্রিকেট ক্যারিয়ারই অনিশ্চিত হয়ে পড়ার উপক্রম হতো। এ বছরের শুরুতে হোমে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ফাইনালে ফিল্ডিং করতে যেয়ে বাঁ হাতের কনিষ্ঠা আঙুলে মারাত্মক চোট পান সাকিব। আঙুল ফেটে রক্ত ঝরেছে মাঠে। মাঠ থেকে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে সাকিবের ক্ষতস্থানে সেলাই দিতে হয়েছে। সেই ব্যথা নিয়ে সাকিব একটার পর একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলেছেন। সাকিবের আঙুলের ইনজুরির রিপোর্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে সুবিধাজনক সময়ে সাকিবের অস্ত্রোপচার করানোর দায়িত্বটা এই চন্দ্রমোহনের উপরই ছেড়ে দিয়েছিল বিসিবি।  হজব্রত পালনের আগে আঙুলের অপারেশনের জন্য পাগল হয়েছেন সাকিব। অথচ চন্দ্রমোহনের রিপোর্টে ফিট সাকিবকে এশিয়া কাপের দলে রেখেছে বিসিবি। এই আঙুল নিয়ে খেলতে বড় ধরনের অসুবিধা দেখছেন না, এশিয়া কাপ মিশনের আগে বিসিবি এবং টিম ম্যানেজমেন্টকে তা নিশ্চিত করেছেন চন্দ্রমোহন। অথচ সাকিবের কনিষ্ঠা আঙুলে পচন ধরেছে, জমে গেছে পুঁজ এবং পানি-তা ধরতেই পারেননি। এশিয়া কাপের ফাইনালের আগের দিন প্রচন্ড ব্যথাায় ব্যাট ধরা অসম্ভব যখন, তখন সাকিব ফিরে এসেছেন ঢাকায়। এসেই পুঁজ অপসারণে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে করিয়েছেন অপারেশন।  এটাই শেষ নয়, সামনে উন্নত চিকিৎসার জন্য আসল অপারেশন করাতে হবে সাকিবকে। তবে ফিজিও যে রোগ নির্ণয়ে করেছেন ভুল, তা সাকিব বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘অনেক কষ্ট করে খেলতে হয়েছে আমাকে। আমার এ অবস্থা গত ১৪-১৫ দিন ধরে। কী ঘটেছে, তা চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকই ধরতে পেরেছেন।
কিন্তু আমাদের ফিজিও ব্যাপারটা ধরতে পারেননি। এটা ঠিক, সমস্যাটা সরাসরি ফিজিও’র ধরার কথা নয়। তবে কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। কিছুটা দায় তাকে নিতে হবে। আমি তাকে পুরোপুরি দোষারোপ করছি না। কেউ জানত না যে, এখানে ইনফেকশন হবে।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ফাইনালে খেলছে ভারতের সঙ্গে, তখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে বাংলাদেশ দলের খেলা দেখেছেন সাকিব। নিজের শূন্যতা তীব্রভাবে অনুভুত হয়েছে তার। ফিজিও’র ভুলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারত। সাকিবের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তা হয়নি। হাতের পুঁজ অপসারণ করে এখন ব্যথা কমে গেছে। তবে মাঠে ফিরতে অপেক্ষা করতে হবে তিন মাস। এই সময়ে জিম্বাবুয়ে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজ মিস করবেন সাকিব। তবে কনিষ্ঠা আঙুলে তীব্র ব্যথা নিয়ে সাকিব খেলেছেন ফিজিও’র প্রেসক্রিপশনে, অনেকটা মনের জোরে। তা জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলের প্রাণ, ‘বিসিবি সভাপতি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি কি এশিয়া কাপে খেলতে পারব, না অপারেশনের জন্য যাব। তিনি আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছিলাম, এশিয়া কাপ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমি এই ব্যথা নিয়ে চার-পাঁচ ম্যাচ খেলতে পারব।’ 
এদিকে, সাকিবের এই দুর্ভোগের কথা শুনে দুবাই থেকে ফিরেই হাসপাতালে ছুটে যান মাশরাফি। অ্যাপোলো হাসপাতালে কাটিয়েছেন ২ ঘণ্টা। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সাকিব হাসপতাল ছেড়ে বাসায় চলে গেছেন। তার আগে এই ফাইনালে তিনি যদি থাকতেন...সাকিব আল হাসানের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ অনুভব করেছে ক্ষণে ক্ষণে। সাকিব নিজেও কি তীব্র তাড়না অনুভব করেননি, ‘আহ, দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে যদি থাকতে পারতাম!’ দল যখন ভারতের সঙ্গে লড়ছে, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তখন হাসপাতালের বিছানায় আঙুলের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তীব্র ব্যথা খেলা থেকে দূরে রাখতে পারেনি তাঁকে। কেবিনের টিভিতে অসহায় চোখে দেখেছেন ফাইনাল। হারের পর আঙুলের সঙ্গে নিশ্চয়ই যন্ত্রণা অনুভব করেছেন হৃদয়েও। সাকিবকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সাকিবকে দেখতে হাসপাতালে পরিবারের লোকজন থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ভিড়। যদিও তাঁর কেবিনে দর্শনার্থী যাওয়ার সুযোগ নেই। কাছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন খুব কাছের মানুষেরাই। সাকিব-কন্যা আলায়না হাসান তো এখন চিকিৎসকদেরও তাঁর বাবার কাছে আসতে দিতে চায় না! সাকিব ও তাঁর স্ত্রী উম্মে আহমেদ শিশির কেবিনে বাবার কোলঘেঁষা আলায়নার একটা হৃদয়স্পর্শী ছবি পোস্ট করেছেন। যে ছবি আপনার চোখ ভেজাবে।
চোখ ভেজাবে সাকিব-কন্যার চাওয়াটা শুনলেও। সেখানে সাকিব লিখেছেন, ‘সে আমার চোখের আড়াল হতে চায় না। ঢাল হয়ে থাকা আমার মেয়ে চিকিৎসকদেরও কাছে আসতে দিতে চায় না, যাতে তার বাবাকে তাঁরা (চিকিৎসকেরা) ব্যথা না দিতে পারে’! শিশিরও সাকিবের কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন, ‘সে (আলায়না) তাকে (সাকিব) ছাড়তে চায় না। ঢাল হয়ে থাকা এক কন্যা তার বাবার কাছে কিছুতেই কাছে চিকিৎসকদের আসতে দিতে চায় না। সে ভাবছে, চিকিৎসকেরা বুঝি ওর বাবাকে ব্যথা দেবে। তার হৃদয় কাঁদছে, চিকিৎসক থেকে বাবাকে দূরে রাখতে কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে।’ এখন যতটা দ্রুত সাকিব সুস্থ হয়ে উঠবেন ততই মঙ্গল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ