বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ভাগ্যের সহায়তা ছাড়া শিরোপা জেতা যায় না

মাহির মাহমুদ : ক্রিকেট মাঠে ভাল সময় কাটালেও বড় কোন আসরের শিরোপা জিততে পারছে না বাংলাদেশ। শিরোপা জয়ের খুব কাছ থেকে ফিরে আসায় হতাশ হয়েছে পুরো জাতি। আরো একটি এশিয়া কাপের আসর থেকে রানার্সআপ হয়ে ফিরল বাংলাদেশ। আগে দুইবার এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার দলকে। হাত ছোয়া দুরত্বে থেকে শিরোপা জিততে না পারার হতাশা যেন কোনভাবেই কাটছেনা। এশিয়া কাপের তিনটি আসরের ফাইনালে খেলে তিনটিতেই শিরোপা জিততে না পারার কষ্ট এখন ক্রিকেটপ্রেমীদের। নিংশ্বাস দুরত্ব থেকে শিরোপা জিততে না পারার বেদনা যেন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য। ফাইনালের দিনটা বারবারই হতাশায় মোড়ানো থাকে, কোনভাবেই রঙ্গিন হয়ে উঠছেনা। আরাধ্যের ট্রফিতে চুমো দিতে না পারায় বাতাস ভারী হতে থাকে। আগের দুইবার ফাইনালে উঠে নিজ দেশের হোম অব ক্রিকেট খ্যাত মিরপুরে কান্না সঙ্গী হয়েছিল। এবার মরুর দেশ আরব আমিরাতের চাকচিক্যের শহর দুবাইয়েও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রথমবার পাকিস্তানের কাছে জিততে জিততে মোটে ২ রানের হার। দ্বিতীয়টিতে ভারতের কাছে একপেশে ম্যাচে হার। সেবার হতাশ হওয়ার সুযোগ ছিলনা। কিন্তু এবার আবারো যখন শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে ৩ উইকেটে হারল বাংলাদেশ তখন হতাশ না হওয়ার কোন কারণ ছিলনা। শিরোপার এতটা কাছে গিয়েও জিততে না পারার হতাশা কি কখনোই কাটবেনা? বাংলাদেশের অধিনায়কের হাতে কি আর কখনোই শোভা পাবেনা এশিয়া কাপের শিরোপা। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপাতত দেওয়ার মতো মানুষ নেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রায় সবারই এক কথা শিরোপাটা বাংলাদেশের ভাগ্যে নেই যে। থাকলে এতটা কাঠখড় কেন পোড়াতে হবে? আর শিরোপা এতটা কাছে গিয়েও কেন তা ছোঁয়া হবে না। তবে মানুষ আশায় বুক বাঁধে, সেই আশাটা তোলা থাকল আরো দুই বছরের জন্য। আবারো এশিয়া কাপের আসর বসলে সেখানে শিরোপা জিততে পারবে কিনা সেই অপেক্ষাও এখন করতে হচ্ছে। এশিয়া কাপ ছাড়াও আরো দুটি ফাইনালে বাংলাদেশকে হতাশ হতে হয়েছে। ২০১৬ সালে সর্বশেষ ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত। বিশ্বকাপের অঅগে আগে হওয়ার কারণে এটিকে প্রথমবারের মতো টোয়েন্টি-২০ ফরম্যাটে আয়োজন করা হয়। এই ফাইনালে বাংলাদেশ অবশ্য তেমন প্রতিদ্বন্ধিতা গড়ে তুলতে পারেনি। আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ ১৫ ওভারে ছোট হয়ে আসা ম্যাচে ১২০ রান তুলতে পেরেছিল। সাব্বির রহমান ২৯ বলে ৩২ রান করেছিলেন। তবে আসল কাজটা করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তিনি মাত্র ১৩ বলে ৩৩ রানের এক ইনিংস খেলেন। ১৫ ওভারের তুলনায় রানটা যথেষ্ট হলেও ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য সেটা যথেষ্ট ছিল না। যদিও বাংলাদেশ ৫ রানে তুলে নিয়েছিল রোহিত শর্মার উইকেট। কিন্তু শিখর ধাওয়ান ৬০ ও বিরাট কোহলি ৪১ রান করে সহজেই ম্যাচ জিতে নেন। ২০০৯ সালে প্রথমবার কোন টুর্ণামেন্টের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। শ্রীলংকার বিপক্ষে এই ম্যাচটা দিয়েই মূলত প্রথম কান্নার ইতিহাস গড়া শুরু হয়। একেবারে হাতের মুঠো থেকে এই ম্যাচ কেড়ে বের করে নিয়ে যান মূলত মুত্তিয়া মুলারিধরন। আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ এই ওয়ানডে ম্যাচে মাত্র ১৫২ রান করে অলআউট হয়েছিল। একমাত্র বলার মতো স্কোর করেছিলেন রকিবুল হাসান। তার অপরাজিত ৪৩ রান মান বাঁচিয়েছিল বাংলাদেশের। কিন্তু খেলার আসল মজাটা তখনো বাকি ছিল। মূলত নাজমুল হোসেন এবং মাশরাফি ও সাকিব আল হাসানের মারাত্মক বোলিংয়ে ৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল তখনকার তারকাখঁচিত লংকান দলটি। উপল থারাঙ্গা, সনাথ জয়াসুরিয়া, মাহেলা জয়াবর্ধনে, চামারা কাপুগেদেরা, থিলান থুসারা ফিরে গিয়েছিলেন ব্যক্তিগত দুই অংক স্পর্শ করার আগেই। এখান থেকে দলকে টেনে নিয়ে যান ৫৯ রান করা সাঙ্গাকারা ও ৮ নম্বরে নামা ফারভেজ মাহরুফ। তারপরও খেলা বাংলাদেশের হাতে ছিল। ২৪ বলে দরকার ছিল ৩৫ রান। এখান থেকেই মুত্তিয়া মুরালিধরন রুবেলের এক ওভারে ২০ রান তুলে নিয়ে শিরোপা জিতে নেন। ২০১৮ সালেই তিনটি আসরের ফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ। যার মধ্যে প্রথমটি ছিল সেই শ্রীলংকার বিপক্ষে। লংকানদের পাশাপাশি জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল ত্রিদেশীয় সিরিজের। সেখানে প্রথম দুই ম্যাচ দাপটের সাথে জিতে সবার আগে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। এরপরই যেন উল্টোরথে চলতে থাকা মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের অবস্থা। ফাইনালে আর সেভাবে লড়াই জামাতে পারেনি। আগে ব্যাট করে শ্রীলঙ্কা এই ফাইনালে ২২১ রানের বেশি করতে পারেনি। এই রান খুব সহজেই পাড়ি দেবার লক্ষ্য পূরণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতায় সবকিছু মাটি হয়ে যায়। একমাত্র মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ৭৬ রান করেছিলেন। বাকিরা সবাই ছিলেন আসা যাওয়ার মিছিলে। ১৪২ রানে অলআউট হয়ে ৭৯ রানের বড় পরাজয়েল সাথে শিরোপাটা চলে যায় নাগালের বাইরে দিয়ে। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল এই সিরিজে বাংলাদেশের সাবেক কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহে ছিলেন প্রতিপক্ষ শিবিরে। সে কারণে এই শিরোপা জিতলে সাবেক কোচের জবাব দেওয়াটা সহজ হতো, কিন্তু সেটাই আর হয়নি। এশিয়া কাপের প্রথম ফাইনাল খেলেছিল ২০১২ সালে। প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে ফাইনালে পরাজিত করার সুযোগ ঘটেছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ট্রাজিক আর কষ্টদায়ক ম্যাচ ছিল সেটা। নিশ্চিত জয়ের পথে হাটতে থাকা বাংলাদেশ পরাজিত হয় মাত্র ২ রানের ব্যবধানে। আগে ব্যাট করে পাকিস্তান ৯ উইকেটে ২৩৬ রান করতে পেরেছিল। ৮ নম্বরে নেমে বর্তমান অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ অপরাজিত ৪৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। যাতে পাকিস্তানের স্কোরটা বড় হতে সহায়তা করেছিলো। জবাব দিতে নেমে তামিম ইকবালের ৬০ ও সাকিব আল হাসানের ৬৮ রানের কল্যানে জয়ের পথেই হাটছিল বাংলাদেশ। কিন্তু হঠাৎ করেই ব্যাটিং ধস সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। এক পর্যায়ে শেষ ওভারে ৯ রান প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের। শেষ ২ বলে দরকার ছিল ৪ রান। শেষ বলে শাহাদাত হোসেন রাজীব মাত্র একটি রান নিতে পেরেছিলেন। হারটা হয়ে যায় ২ রানে। এবারের এশিয়া কাপের আগে শ্রীলংকায় নিদাহাস ট্রফিতেও একই বাগ্য বরণ করতে হয়। টোয়েন্টি-২০ টুর্নামেন্টের ফাইনালে আগে ব্যাট করে স্কোর বোর্ডে জমা করেছিল ১৬৬ রান। এই রান নিয়েও বাংলাদেশের জয়ের ভালো সম্ভাবনা ছিল। রোহিত শর্মা ৫৬ রান করে ভারত ছিল সঠিক পথে। একপর্যায়ে শেষ ২ ওভারে ভারতের ৩৪ রান দরকার ছিল। এখান থেকে ভারতীয় উইকেটরক্ষক দিনেশ কার্তিক হয়ে উঠলেন সুপার ম্যান। ২২ রান তুলে নিলেন রুবেল হোসেনের ১৯তম ওভার থেকে। শেষ ওভারে দরকার ছিল ১২ রান। সৌম্য সরকার প্রথম তিন বলে দিলেন ৩ রান। পরের ৩ বলে দরকার ৯ রান। এই অবস্থায় চতুর্থ বলে হলো বাউন্ডারি এবং পঞ্চম বলে সৌম্য উইকেট নিলেন। শেষ বলে ভারতের দরকার ৫ রান। তখনই সেই কার্তিক ছক্কা মেরে দিলেন। আরো একটি আসর শেষ হয় হতাশার। এদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে একগাদা ম্যাচ খেলার ক্লান্তি। এরপর টানটান ফাইনালের ধকল। সবমিলিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল। শরীরের এই ক্লান্তির সাথে আরও যোগ হয়েছে শেষ বলে ফাইনাল হারের হতাশা। আরো একবার শিরোপার কাছে গিয়ে ফাইনালে হারতে হলো বাংলাদেশ দলকে। তবে দেশে পৌঁছে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা বললেন, এই হতাশা নয়, ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে চান তিনি। দিনশেষে নিজের আশাবাদের জায়গাটা বলতে গিয়ে মাশরাফি বলছিলেন, ‘না, আমার হতাশা নেই। হতাশ হবো যদি এই স্পিডটা না দেখি পরবর্তীতে। যেই মানসিকতা নিয়ে ছেলেরা খেলেছে, অবশ্যই অসাধারণ। তবে অবশ্যই হতাশ হতো, এমন মানসিকতা নিয়ে যদি তাঁরা চেষ্টা না করে।’ মাশরাফি বরং এই টুর্নামেন্টে ইতিবাচক কি কি পাওয়া গেছে, সে নিয়ে ভাবতে চান। সেটাই বলছিলেন তিনি, ‘মিথুন ও লিটনের কথায় শুরুতে বলতে হয়। আমাদের দুটি জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দুই জায়গার জন্য আমরা খুঁজছিলাম। সেই দুই জায়গায় প্লেয়ার পারফর্ম করেছে এটা খুবই ইতিবাচক। এক দুই ইনিংসে বলা যায় না ওরা ফর্মে আছে কি না। তবে আশাকরি ওরা বুঝতে পারছে তাদের সামর্থ্য আছে, এই ধরনের মঞ্চে পারফর্ম করার। মুস্তাফিজ আবার আগের মত ফিরে আসছে ধীরে ধীরে, এটা খুবই পজেটিভ। আর দল যেভাবে চেষ্টা করেছে, আশাকরি ওরা বুঝতে পারবে, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে শতভাগ চেষ্টা করলে যে কোনো কিছুই সম্ভব। এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারলে খুব ভালো হবে।’ তবে এই ইতিবাচকতার পাশাপাশি ফাইনালটাও ফিরে দেখতে হচ্ছে অধিনায়ককে। বাংলাদেশ এই নিয়ে ষষ্ঠ ফাইনাল হারলো। আর এর মধ্যে প্রায় সবগুলোই শেষ দিকে গিয়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে বাংলাদেশের বিপক্ষে। বাংলাদেশ কেন পারছে না, সেটা বলতে গিয়ে মাশরাফি বললেন, ‘হচ্ছে না কোনো কারণে। আমার কাছে মনে হয় একবার পারলে জিনিসটা সহজ হতো। শুরুটা যেভাবে করেছিলাম, তাদের দেখে মনে হয়নি ওরা নার্ভাস ছিল। কিন্তু মিডেল অর্ডারে ওদের দেখে মনে হয়েছে, ওরা নার্ভাস ফিল করছে। চাপের মুখে থাকলে যেমন শট খেলে তেমন শট খেলছিল। ওইসময় উইকেটে দাঁড়িয়ে থাকলে ২৬০-২৭০ সহজেই কথা যেত। এখানে মানসিক ব্যাপারগুলো কাজ করে। এই বাধা পার করার জন্য একটা টুর্নামেন্ট জেতা খুব জরুরি। তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে বড় বড় টুর্নামেন্ট জেতা সম্ভব হবে।’ তবে একটা ব্যাপার অধিনায়ক মাশরাফির ভালো লেগেছে, এবার হারের পরও কেউ ভেঙে পড়েনি। এটাকেই বড় ব্যাপার বলছেন মাশরাফি, ‘অন্যবারের থেকে এবার আমি সবাইকে শক্ত দেখেছি। যেটা ভালো লক্ষণ। তাঁরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে, জেতার ইচ্ছা তাদের ভেতরে ছিল, অনেক লিমিটেশনের মধ্যেও। অবশ্যই আমি কেন, তাদের নিজেরাও গর্ববোধ করা উচিত তাদের নিয়ে। হয়তো তাঁরা বুঝতে পেরেছে, কে কতটুকু করতে পারত, কোথায় কার ঘাটতি ছিল। যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেট তো সামনে আরও এগিয়ে যাবে। সামনে বিশ্বকাপ আছে, দুই-তিনটা সিরিজ আছে। এখানের ভুল সামনে না করলেই এগিয়ে যেতে পারবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ