মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

চলছে এখন রঙ বদলের বোলচাল

‘আরএসএসের রঙ বদল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। ২১ সেপ্টেম্বর মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সাথে উত্থাপিত হলো নতুন প্রশ্নও। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি কোন্ মতবাদকে আঁকড়ে ধরবে? একটি মতবাদ হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার সঙ্গী বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের ‘কংগ্রেসমুক্ত’ ভারত গড়ার ডাক। অপর মতবাদ হলো, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবতের ‘যুক্তভারত’ গড়ার ডাক। গোরক্ষা আন্দোলনের নামে মুসলমান-দলিতদের পিটিয়ে মারা অথবা লাভ-জেহাদের মোকাবিলায় কোমর কষে নামার যে সংস্কৃতি বিজেপি রাজনীতিতে ইদানীং প্রাধান্য পাচ্ছে সে প্রসঙ্গে আরএসএস প্রধান বলেছেন, ভারতীয় মুসলমানদের বাদ দিয়ে হিন্দুত্বের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
সংঘ প্রধানের এমন বক্তব্যে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, তাহলে কি আরএসএস রঙ বদলালো? তবে প্রথম আলোর নয়াদিল্লী প্রতিনিধির বিবেচনায় হিন্দুত্বের সংজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ ভারত গড়ার ধ্যানধারণা সম্পর্কে সংঘপ্রধান দিল্লিতে আরএসএস-এর তিন দিনের অনুষ্ঠানে যেভাবে নিজের ভাবনা তুলে ধরলেন তা শাসক দলের কর্ণধারদের নতুন নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এ যাবত লালিত ‘হিন্দুত্বের’ সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে একদা নিষিদ্ধ আরএসএস ও তার পরিবারের বিভিন্ন শাখাকে ‘বহুত্ববাদী’ ভারতীয় সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার নতুন প্রচেষ্টা শুরু করলেন কি মোহন ভগবত? উত্তর যাই হোক না কেন, তাঁর মনের কথা মোদি-অমিতের বিজেপিকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বিতর্কের মুখোমুখি। এদিকে নরেন্দ্র মোদি শুধু ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ গড়ার কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, ভারতে যাবতীয় অনাসৃষ্টির জন্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেস দেশকে বরবাদ করেছে।
আমরা জানি, রাজনীতিতে বিতর্ক থাকে, থাকে ব্লেমগেমও। তবে একটি দেশকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখতে হলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় মানবিক দর্শন, ন্যায়বোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা। দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সভ্যতায় দেশে দেশে এসব মৌলিক বিষয়ের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের শাসক দলের উগ্র রাজনীতি তার বড় প্রমাণ। ভারতের জাতীয় নেতারা, কংগ্রেস নেতারাতো বহুত্ববাদী সমাজের কথা বলেছেন, বলেছেন বৈচিত্র্যের ঐক্যের কথাও। অথচ সেই ভারতেই বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে। তাই রঙ বদলের কথা আচরণেও দেখতে চায় মানুষ।
কথামালায় অভ্যস্ত রাজনীতিবিদদের আচরণে রঙ বদল না হওয়ায় এনআরসি তথা জাতীয় নাগরিক তালিকা ভারতে এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এর আগে আমরা মিয়ানমারে লক্ষ্য করেছি নাগরিক তালিকার ছদ্মাবরণে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উৎখাতের ঘটনা। ভারতের আসাম রাজ্যে ৪০ লাখ অধিবাসীকে রাষ্ট্রহীন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের তৈরি করা চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিক তালিকায় (এনআরসি) ওদের নাম ওঠেনি। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলেছে, একজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকও যাতে তার নাগরিকত্ব নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, গৃহীত ট্রাইব্যুনাল ও আইনী প্রক্রিয়ায় সে নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু এমন বক্তব্য-বিবৃতি আতঙ্ক কমাতে পারেনি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আসামের পর ওড়িশা ও ঝাড়খ- থেকেও এনআরসি করার ঘোষণা এসেছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এনআরসি নিয়ে তেমন কিছু বলছে না। কোন উদ্বেগও প্রকাশ করছে না। তবে তারা উদ্বিগ্ন, প্রতিবেশীসহ অন্যদের বোঝাতে চাইছে এনআরসি প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ আদালত ও আসাম রাজ্যের বিষয়। গত ৩০ জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদকে বলেন, এ খসড়া তালিকা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্র কোন ভূমিকা রাখেনি। অথচ এর একদিন পরই বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ কংগ্রেসকে উদ্দেশ করে সদর্পে বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নের সাহস আপনাদের নেই, আমাদের আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশী অভিবাসীদের তাড়িয়ে দেয়ার সাহস আপনাদের নেই।’ উল্লেখ্য যে, ১১ সেপ্টেম্বর জয়পুরে দলের এক সমাবেশে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ দাবি করেন, ৪০ লাখ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর’ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বিজেপি একজন অনুপ্রবেশকারীকেও ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অথচ বাংলাদেশ এই অনুপ্রবেশ তত্ত্বকে মোটেও স্বীকার করে না। এদিকে বিজেপি প্রধানের সুরে সুর মিলিয়ে এমএলএ রাজা সিং বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীরা সসম্মানে দেশ না ছাড়লে তাদের গুলী করে নির্মূল করা হবে।’
ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বাংলাদেশ বিরোধী এমন অবস্থানের তাৎপর্য বোধোগম্য নয়। বাংলাদেশ তো সব সময় ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে এসেছে। মাত্র কিছুদিন আগেও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে পণ্য পরিবহনে দিল্লিকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের যথাযথ জবাব কিন্তু বাংলাদেশ পায়নি। বরং এখন ৪০ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমন হুমকিকে কি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বলে মেনে নিতে হবে বাংলাদেশকে? এই হুমকিকে সরকার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে মোকাবিলা করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সব দেশের জন্যই রাজনীতিবিদরা আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁদের চিন্তা-ভাবনা এবং কর্মসূচি শুধু দেশকে নয়, বিশ্বকেও প্রভাবিত করে। এ কারণে বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশের নাগরিকরাও আমেরিকা ও রাশিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের কথা ও আচরণ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে থাকে। বাংলাদেশের নাগরিকরাও উপমহাদেশের রাজনীতি ও হালচাল সম্পর্কেও বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। কারণ অভিঘাত বলে একটি কথা তো প্রচলিত আছে।
আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতিতে গেম আছে, আছে ব্লেমগেমও। শিষ্টাচারের কথা বলা হলেও রাজনীতিতে তার চর্চা তেমন হয় না। দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও দেশটিতে এখন ‘চোর বিতর্ক’ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনাবেচা চুক্তি নিয়ে বর্তমানে সরগরম হয়ে উঠেছে ভারতের রাজনীতি। তবে মূল বিষয়ের বদলে দেশটির রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে ‘চোর’ বনাম ‘চোর’ বিতর্কে। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দল কংগ্রেস এখন একে অপরকে অপবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
ভারতের রাজনীতিতে এই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে রাফায়েল বিষয়ে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তির পর। ওলাঁদ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়েই ভারত রাফায়েল চুক্তিতে সই করে। এক সাক্ষাৎকারে ওলাঁদ বলেছেন, ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের চাপে ভারতীয় ধনকুবের অনিল আম্বানির প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্সের সঙ্গে রাফায়েল চুক্তিটি হয়েছিল। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘চোর’ আখ্যা দেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। সংবাদ সম্মেলন  করে তিনি বলেন, ‘এখন আর কোন সংশয় থাকলো না যে দেশের চৌকিদারই চোর’। এ বক্তব্যের পর বিজেপির মন্ত্রীরা রাহুল গান্ধীর পুরো বংশকে সমস্বরে ‘চোর’ অপবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। তারা বলছেন, ‘রাহুলকা পুরা খানদান চোর হ্যায়’। বিজেপি সরকারের মন্ত্রীদের টুইটারে মূল বিষয় এখনÑ নেহেরু থেকে রাজীব কিভাবে দেশের সম্পদ চুরি করেছেন এবং মোদি ও তার সরকার কতটা সৎ ও স্বচ্ছ। তবে রাফায়েল নিয়ে যে মূল প্রশ্নগুলো কংগ্রেস তুলেছে, এখনও তার কোন সদুত্তর দিতে পারেনি বিজেপি।
কংগ্রেসের অভিযোগ প্রধানত দুটি। প্রথমত, কংগ্রেস যে পরিমাণ অর্থে যুদ্ধবিমান কেনাবেচা প্রায় চূড়ান্ত করেছিল, বিজেপি সরকার তার চেয়ে বেশি অর্থে কম যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে সই করেছে। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তিতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘হ্যাল’ এর যে ভূমিকা থাকার কথা ছিল, নতুন চুক্তিতে তা বাতিল করে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্সকে। আর তা করা হয়েছে ভারতের তাগিদ ও চাহিদা অনুযায়ী। কংগ্রেসের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই এ উদ্যোগের হোতা। অনিল আম্বানির সংস্থাকে ৩০ হাজার কোটি রুপির বরাত পাইয়ে দিয়ে মোদি ওই শিল্পপতির ৪৫ হাজার কোটি রুপির সরকারি ঋণ মেটানোর পথ প্রশস্ত করে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, সোমবার কংগ্রেস নেতারা বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশনের কাছে যাওয়ার কথা। তারা দাবি জানাবেন, দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে যেন তদন্ত করা হয়। তবে ভারতের রাজনীতিতে রাফায়েল বিষয়কে কেন্দ্র করে যে ‘চোর বিতর্ক’ শুরু হয়েছে তা সহজে থেমে যাবে বলে মনে হয় না। সামনে নির্বাচনের সময় এই বিতর্ক আরও উগ্র রূপ ধারণ করতে পারে। তবে এখান থেকে আমাদের গ্রহণ করার মতো কোনো বিষয় নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ