মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

শেষ মুহূর্তের উন্নয়ন প্রকল্প

সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসার পাশাপাশি নতুন জাতীয় নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসায় দেশজুড়ে একদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কর্মকান্ডের হিড়িক পড়ে গেছে, অন্যদিকে নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চাপ বাড়তে শুরু করেছে। গতকাল বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের প্রচন্ড চাপে এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের নাভিশ্বাস উঠেছে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে শতাধিক প্রকল্প।
অন্যদিকে চলতি মাস সেপ্টেম্বরের ১১ ও ১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেক-এর দুটি বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ৩৪টি প্রকল্প, যেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য ৩০ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত ছিল সংসদ সদস্যদের জন্য নেয়া মাদরাসা উন্নয়ন প্রকল্প। শুধু এই প্রকল্পগুলোর জন্যই সরকারকে ৫ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি রয়েছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট এবং ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত অসংখ্য প্রকল্প। এসব প্রকল্প সাধারণত স্থানীয় সরকার বিভাগ তথা এলজিইডির মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এবং কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। এর কারণ, এ দুটি বিভাগই রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্টসহ এমন সব প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে, যেগুলোর সঙ্গে ভোটারদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার ব্যাপার জড়িত রয়েছে। তথ্যটির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে একথাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, নির্বাচন যেহেতু এগিয়ে এসেছে সেহেতু বর্তমান সংসদের সদস্যদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের এমন অনেকেও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন, যারা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান।
প্রসঙ্গক্রমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের তৎপরতার কথাও জানানো হয়েছে। কারণ, নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হলে বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেই বাদ পড়তে পারেন। ওদিকে এই মর্মে বিধান রয়েছে যে, সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন বা বাস্তবায়ন করা যাবে না। এজন্যও তড়িঘড়ি করে প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়ার জোর তৎপরতা চলছে। এসব প্রকল্পের খুব কম সংখ্যকেরই সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ওপর চাপও তাই অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির কয়েকটি পর্যন্ত বৈঠক করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, আগে তথা সাধারণ সময়ে যেখানে কোনো প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বা পিইসিতে সংশোধিত হয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে আসতে দেড় থেকে দু’মাস সময় লাগতো, এখন সেখানে এসে যাচ্ছে এক সপ্তাহের মধ্যেই। অর্থাৎ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিরা যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে চাপের মুখে কর্মকর্তাদের নাভিশ্বাস উঠলেও পরিকল্পনা কমিশনও কম দেখাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে আসলে প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য তড়িঘড়ির পাশাপাশি চাপ সৃষ্টি করার পরিপ্রেক্ষিতে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং অন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের চাপ ও তৎপরতা স্বাভাবিক হলেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার, অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। এগুলো কি কেবলই ভোটারদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার জন্য নাকি বাস্তবেও এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের উপকার তথা কল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমরাও অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও সংশয়কে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ, স্বাভাবিক সময়েও দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের মহোৎসব হয়ে থাকে। চুরি-দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত থাকে বলে কোনো অপরাধেরই বিচার হয় না। দুর্নীতিবাজরাও সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সে কারণে জনগণের ট্যাক্সের অর্থের অপচয় ঘটে। তাছাড়া খুব কম প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং প্রথমে বরাদ্দকৃত অর্থে বাস্তবায়িত হয়। ঠিকাদাররা বরং দফায় দফায় নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় ও টাকা দুটোই বাড়িয়ে নেয়।
প্রাসঙ্গিক সর্বশেষ উদাহরণ দেয়ার জন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যায়। গতকালই প্রকাশিত অন্য এক দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের জুন মাসে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৫ শতাংশের। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। একই কথা সাধারণভাবে সরকারের অন্য সব ছোট-বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সত্য।
সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য যে তৎপরতা চালানো হচ্ছে তার কারণে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারি না। সরকারের উচিত পরিকল্পনা কমিশনকে আইনের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেয়া এবং কমিশন যাতে তড়িঘড়ি করে নতুন কোনো প্রকল্পের অনুমোদন না দেয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা অর্থের অপচয় প্রতিহত করার ব্যাপারে সচেষ্ট হবেন এবং ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করতে দেবেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ