বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে  খুলনার কয়েকটি অফিসের চিত্র

 

খুলনা অফিস : বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রিত পদ্মার এপারের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানীর নির্ধারিত তথ্য কর্মকর্তা কোম্পানীর ডেপুটি ম্যানেজার কে.এম রেজাউল হকের কাছে ১৩টি তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল গত ২০ জুন। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী ২০ কর্মদিবসের (১৮ জুলাই) মধ্যে এবং ৯ (২) ধারা অনুযায়ী ৩০ কর্মদিবস অর্থাৎ পয়লা আগষ্টের মধ্যে তথ্য প্রদান করার কথা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোন তথ্য না দেয়ার পর কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শফিক উদ্দিন বরাবর আপীল করা হয়েছিল ৮ আগষ্ট। যদিও ৬ আগষ্ট আবেদন করা হলেও সেটি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কোম্পানীর এমডি’র পি.এ রিসিভ করতেই সময় নেন দু’দিন। আপীলের ১৫ দিনের মাথায় আপীল কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদান করবেন এটিও আইন। কিন্তু এরও একমাস পর দেয়া হয় ১৩টির মধ্যে মাত্র তিনটি তথ্য। বাকী তথ্যের ব্যাপারে তথ্য কর্মকর্তা বলেন, এগুলোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করুন। তবে তিনি এসময় কম্পিউটার কম্পোজ করা কোম্পানীর র্বুমান এমডি’র আমলে সম্পন্ন হওয়া, চলমান ও কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরেন।

এটিই হচ্ছে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের চিত্র। এছাড়া খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর, খুলনাস্থ স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ আরও কয়েকটি সরকারি অফিসে তথ্য চেয়েও নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যায়নি। অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নসহ নানা পদক্ষেপ নেয়ার পরও এমন চিত্র হতাশ করেছে খুলনার সাধারণ মানুষদের। যদিও জনগনের মধ্যেও এখনও তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অসচেতনতার অভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবসকে সামনে রেখে অবশ্য খুলনায়ও সরকারিভাবে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বুধবার থেকে এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। খুলনার কয়েকটি অফিসে সাম্প্রতিক সময়ে করা তথ্য অধিকার আইনের আবেদন বিষয় নিয়েই তৈরি হয়েছে আজকের প্রতিবেদন।

গত ২০ জুন ওজোপাডিকোর তথ্য কর্মকর্তা বরাবর দেয়া আবেদনে যে ১৩টি তথ্য চাওয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়াও কোম্পানী কর্তৃপক্ষের সাথেও একাধিকবার মৌখিক ও টেলিফোন আলাপ হয় এ প্রতিবেদকের। প্রতিবারই তথ্য দেয়া হবে এমনটিই জানানো হয়। সর্বশেষ যখন নির্দিষ্ট সময় পার হয় তখন আপীল করতে গিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আপীল আবেদনটি কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে থাকায় সেটি রিসিভ করতেও দু’দিন ঘুরান এমডি’র পি.এ। পরে এমডি’র সাথে কথা বলে ৮ আগষ্ট সেটি রিসিভ করা হয়। কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বর মাত্র তিনটি বিষয়ে তথ্য দিয়ে বাকীগুলো পরে দেয়া হবে বলে জানানো হয়। আপীল আবেদনটি এখন রয়েছে তথ্য কমিশনে অভিযোগের অপেক্ষায়।

খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য কর্মকর্তা ও অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বরাবর সাতটি বিষয়ের তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল গত ২৯ জুলাই। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও কোন তথ্য না দেয়ায় মঙ্গলবার ফোন দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে। ‘তথ্য প্রস্তুত আছে এসে নিয়ে যেতে পারেন’ এমনটি জানানোর পর বুধবার সকালে সেখানে গিয়ে তথ্য চায়া হলে তিনি বলেন, প্রস্তুতকৃত তত্যে কিছুটা ভুল আছে পরে ই-মেইলে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এজন্য তিনি ই-মেইল আইডিও রেখে দেন। কিন্তু বুধবার রাত পর্যন্ত এমন তথ্য এ প্রতিবেদকের ই-মেইলে আসেনি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন দেয়া হলেও সেটি রিসিভ হয়নি।

খুলনা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম পাটোয়ারীর কাছে তিনটি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল গত ৯ জুলাই। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও তিনি কোন তথ্য দেননি এ প্রতিবেদককে। পরে ২৭ আগষ্ট আপীল করা হয় এইচইডি খুলনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএফএম আরিফুল করিমের কাছে। আবেদনের সময় তিনি হজ্ব পালনের জন্য পবিত্র সৌদি আরবে থাকায় পরে ফিরে আসার পর মোবাইলে কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে। যোগদানের পর তথ্য দেয়ার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন এমনটি জানানো হলেও বুধবার পর্যন্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি ওই দপ্তরের।

এমন আরও কয়েকটি সরকারি অফিসে তথ্য অধিকার আইনের নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করেও মিলেছে নানান চিত্র। আবার অনেক অফিসে স্পষ্ট করে উল্লেখও নেই ওই অফিসের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা কে। শুধুমাত্র ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবি এবং সচেতন নাগরিক কমিটি বা সনাক প্রদত্ত কিছু বোর্ড কয়েকটি অফিসে দেখা গেলেও এখন অনেক অফিসে সেটিও নেই। এমনকি দৃশ্যমান নেই তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা বা আপীল কর্মকর্তার নামও। যা নিয়ে সাধারণ জনগনের পক্ষে অনেক সময় বুঝে ওঠাই কঠিন যে, কার কাছে কিভাবে আবেদন করতে হবে।

এ অবস্থাকে অবশ্য জনসচেতনতার অভাব বলে উল্লেখ করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি বা সনাকে খুলনা জেলা সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইনটির প্রচারনা খুব বেশি একটা নেই। অনেক মানুষই এখনও জানেই না যে, আইন দিয়ে তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এক সময় সরকারি অফিসারদের মধ্যে অনিহা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন তেমনটি নেই। ইতোমধ্যেই খুলনায় সরকারি অফিসারদের এ বিষয়ক ট্রেনিংও দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবসকে সামনে রেখে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।

সনাক খুলনার সহ-সভাপতি এডভোকেট শামীমা সুলতানা শীলু বলেন, সনাকের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করা হয় তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। কারন এ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবার স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এর পরও যদি কোন অফিসের অফিসারদের অনিহা থাকে সেগুলো দূর করা উচিত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নের জন্যও তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ ব্যাপারে কারও অনীহা থাকলে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলেই আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সহজ হবে বলেও তিনি জানান।

এ ব্যাপারে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, এখনও এ আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসেনি। অনেক শিক্ষিত লোকও নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে নারাজ। জেলা প্রশাসনসহ বেশকিছু দপ্তরে তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা নির্দিষ্ট করাসহ যথাযথ নিয়ম অনুসরন করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। এ ব্যাপারে খুলনার বিভিন্ন সরকারি অফিসের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বুধবার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন থেকে তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে আর কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। শুধু প্রয়োজন জনসচেতনতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ