বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

সরকারের লাখ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি  ধামাচাপা দিতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন --- রিজভী

 

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে বাকশালের প্রেতাত্মা আখ্যা দিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকারের দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে এবং গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ভোটবিহীন সংসদে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হলো। এটি সংবিধানবিরোধী একটি আইন। বিশেষ করে মুক্ত চিন্তা, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ করেছে। এই কালো আইন বাকশালেরই প্রেতাত্মা। তিনি এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে দেশবাসীসহ সকল গণমাধ্যমের কর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

গতকাল বৃহস্পতিবার নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। রিজভী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করেন তিনি; চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে রিজভী বলেন, গণমাধ্যমসহ যে কোনো মাধ্যমই যাতে দুর্নীতির কোনো খবর প্রকাশিত না হয় সেজন্য এই ন্যক্কারজনক কালো আইন তৈরি করা হয়েছে। এই আইনের কারণে দেশের মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লো। কারণ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী এখন বিনা ওয়ারেন্টে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অফিসে ঢুকে তল্লাশির নামে তা-ব চালাতে পারবে, কম্পিউটারসহ সকল কিছু সিজ করতে পারবে, যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে। সাধারণ মানুষও এই কালো আইনের থাবা থেকে রেহাই পাবে না।

রিজভী অভিযোগ করেন, সুপরিকল্পিতভাবে দেশকে ধ্বংস করার সকল ষড়যন্ত্র সম্পন্ন করেছে সরকার। বন্দুকের নলের মুখে দেশ ত্যাগ ও পদত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার বইতে উল্লেখ করেছেন কিভাবে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, কিভাবে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে বিচার বিভাগকে সরকার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তিনি তার আত্মজীবনী বইয়ে পরিষ্কার উল্লেখ করেছেন-তিনি সরকারের চাপে ও হুমকির মুখে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিচারপতি সিনহা তার ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’ বইয়ে পরিষ্কার বলেছেন-বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের মুখে তিনি দেশ ছেড়েছেন এবং তার পরিবারকে জিম্মি করে বিদেশে থাকাকালীন অবস্থায় তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। বিবিসির রিপোর্টসহ দেশের কিছু গণমাধ্যমে আজকে তা প্রকাশ পেয়েছে।

রিজভী বলেন, এসকে সিনহার বক্তব্যে আরও পরিষ্কার হলো বন্দুকের নলের মুখে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েই সরকার বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা সাজানো মামলায় রায় দিয়ে কারাবন্দী করে এক নম্বর মিশন কার্যকর করার পর এখন দুই নম্বর মিশন কার্যকর করতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্টের মামলায় আগামী ১০ অক্টোবর রায় দেয়া হবে। দীর্ঘ ১৪ বছর ঝুলন্ত রাখার পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা সুপরিকল্পিত নীলনকশারই অংশ। রায় প্রকাশের আগেই সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা নানা ধরনের বক্তব্য রাখছেন। বলছেন-এই রায় প্রকাশিত হওয়ার পর বিএনপি বিপাকে পড়বে। তার মানে সরকার জানে কি রায় হতে যাচ্ছে অথবা সরকারই ২১ আগস্ট মামলার রায় লিখে দিচ্ছে। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়ে ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা হবে কি-না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ঐ সময়ে যাদের কম বয়স ছিল এখন তারা প্রাপ্তবয়স্ক, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই-আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দপ্তর সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মিলন স্বাক্ষরিত একটি আবেদনে ২১শে আগস্ট ২০০৪ মুক্তাঙ্গনে সভা করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। পুলিশের নিকট প্রেরিত আবেদনের ভিত্তিতে ২১শে আগস্ট ২০০৪ মুক্তাঙ্গনে সভার জন্য ১৯শে আগস্ট ২০০৪ পুলিশ লিখিত অনুমতি দেয়। ২১শে আগস্ট জনসভার জন্য মুক্তাঙ্গনের আশেপাশে যথারীতি ব্যাপক পুলিশ নিয়োগ করা হয়। বেলা ১টায় সভাস্থল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে স্থানান্তরিত করা হয়। এতে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা হতবাক হয়। আকস্মিক সভাস্থল পরিবর্তনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ২০০ফিট ঢ ৫০ ফিট এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুলিশ ডেপ্লয়মেন্ট হওয়ার আগেই।

তিনি উল্লেখ করেন, বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মতিঝিল থানায় মামলা রজু হওয়ার পর তদন্ত ভার অর্পণ করা হয় সিআইডি’র ওপর। দুই বছর তদন্ত চলার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি আতিকুর রহমান ও তদারককারী কর্মকর্তা এসপি রুহুল আমিন জনৈক জজ মিয়াসহ তার আরও কয়েক সহযোগীকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে মামলাটি চার্জশিট দেয়ার মানসে অনুমতি প্রার্থনা করে তদানীন্তন জাতীয় মনিটরিং সেল কর্তৃপক্ষের কাছে-যার প্রধান ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। কিন্তু সিআইডি’র সেই তদন্ত মনিটরিং সেলের কাছে সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় উল্লিখিত আসামীদের বিরুদ্ধে চার্জাশিট দাখিলের অনুমতি না দিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট ও ভিত্তিমূলক সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহপূর্বক তদন্ত নিষ্পত্তি করার জন্য মনিটরিং সেল সিআইডি কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়। অতঃপর পরামর্শ মোতাবেক সেই তদন্ত অব্যাহত থাকাকালীন বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর আন্দোলনের ফসল মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত জরুরী সরকার বিএনপিকে দমন-পীড়নে উঠে পড়ে লাগে। তারা সিআইডি’র পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে নতুন কর্মকর্তা হিসেবে এএসপি ফজলুল কবিরকে দায়িত্ব দেয়। তদন্তে ২২ জন আসামীকে অভিযুক্ত করে দেড় বছর শত চেষ্টা করেও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ আরও অনেককে আসামী হিসেবে মামলায় জড়িত করতে পারেনি। আদালত চার্জশিট একসেপ্ট করে বিচার কার্যক্রম শুরু করে ৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষীরা কেউই তারেক রহমানসহ অন্য কারো নাম বলেনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মামলাটি পুনঃ তদন্তের নামে বিচারিক আদালত হতে আগস্ট ২০০৯ এ ফিরিয়ে এনে তা পুনঃতদন্তের ভার দেয়া হয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত এসপি কাহার আকন্দকে, যিনি বেশ কয়েক বছর আগেই স্বাভাবিক নিয়মে অবসর গ্রহণের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে নিজেকে যুক্ত করে ফেলেন, এমনকি তার নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জ-কটিয়াদি থেকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রার্থনা করেন।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্তির পর আলোচ্য মামলাটির তদন্তকালীনই বিশেষ বিবেচনায় তাকে পরপর দুটি পদোন্নতি দিয়ে এসপি পদে উন্নীত করা হয়। যিনি এখনও অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ইতিহাসে সর্বোচ্চ বয়ঃবৃদ্ধ চাকরিজীবী হিসেবে রেকর্ড গড়েন। কাহার আকন্দ অতঃপর আরও প্রায় দুই বছর তদন্ত করে গত জুলাই ২০১১তে পূর্ববর্তী ২২ জনের সাথে ৩০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বমোট ৫২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দেয়। যার মধ্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ কিছু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সেই সময়ে পুলিশ বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তাবৃন্দ যারা কাহার আকন্দের নিকট ঐ সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

রিজভী আরও বলেন, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর ওপর আক্রোশবশতঃই ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মামলায় অন্যায়ভাবে তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে। নির্বিঘœ অসুয়াই প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশ বৃদ্ধি করেছে। আওয়ামী সরকারের কোন কীর্তি নেই, যা আছে সবই অপকীর্তি। এইসব অপকীর্তি ঢাকতেই আওয়ামী সরকার জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে নানাভাবে চক্রান্তের প্রকাশ ঘটাচ্ছে।   

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মুখ বন্ধ করতে, গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ভোটবিহীন সংসদে পাস হলো বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সরকারের লাখ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই এই কালো আইন করা হয়েছে। গণমাধ্যমে অথবা যেকোন মাধ্যমইে যাতে দুর্নীতির কোন খবর প্রকাশিত না হয়, অথবা প্রকাশ করতে না পারেন সেজন্যই এই ন্যক্কারজনক কালো আইন তৈরী করা হলো। এই কালো আইনে মানুষের সকল বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। দুর্নীতি ও মানবধিকার লঙ্ঘনের মত অপরাধের বিস্তার লাভ করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এটি সংবিধান বিরোধী একটি আইন। কারণ এ আইনে সংবিধানের মূল চেতনা বিশেষ করে মুক্ত চিন্তা, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে দেশের মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ল। কারণ আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এখন বিনা ওয়ারেন্টে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অফিসে ঢুকে তল্লাশির নামে তান্ডব চালাতে পারবে, কম্পিউটারসহ সকল কিছু সিজ করতে পারবে, যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে। সাধারণ মানুষও এই কালো আইনের থাবা থেকে রেহাই পাবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক এই কালো আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা সংবিধান পরিপন্থী। এই আইন  বাকশালেরই প্রেতাত্মা। এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে দেশবাসীসহ সকল গণমাধ্যমের কর্মী, মুক্ত চিন্তার মানুষদের রুখে দঁাঁড়ানোর আহ্বান জানান রিজভী।

রিজভী আরও বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে তালিকা করে আজগুবি সংবাদ প্রকাশ করছে কিছু গণমাধ্যম। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশব্যাপী সংসদীয় এলাকায় বিএনপি’র নামে ভুয়া প্রার্থী তালিকা ছাপানো হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণরুপে একটি চক্রান্ত এবং সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিরাই মিথ্যা তালিকা প্রকাশে কাজ করছে। আমি দলের পক্ষ থেকে এধরনের বানোয়াট সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ থেকে বিরত থাকার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তৈমুর আলম খন্দকার, আবুল খায়ের ভূইয়া, আব্দুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ