রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মেঘ বৃষ্টির ওপারে

মোহাম্মদ অয়েজুল হক : তাসফিয়া চার বছরের ফুটফুটে মেয়ে। খুব পাকা পাকা কথা বলে। বৃষ্টির প্রতি পিচ্চি মেয়েটার ভালোবাসা দেখে অবাক হয় ওর বাবা। বৃষ্টি নামলেই দারুণ খুশি। কতো প্রশ্ন তার। 

- আব্বু বৃষ্টি কোথায় থাকে। 

- আকাশে।

- ও আকাশে থাকে। সব বুঝে ফেলেছে এমন একটা ভাব। তারপরই প্রশ্ন করে, আকাশ এতো বৃষ্টি কোথায় পায়?

- সাগর থেকে পানি আকাশে উড়ে যায়......

- সাগরের ঢেউ ওড়ে বুঝি! 

- ঢেউ না পানি। 

-তা অতো উপরে যায় কিভাবে?

-বাতাসে মিশে উড়ে যায়। আকাশে গিয়ে বরফ জমে। সে বরফ ভারী হয়ে গলে গলে বৃষ্টি হয়ে পড়ে।

- আব্বু আকাশে কি ফ্রিজ আছে?

- ফ্রিজ থাকবে কেন?

- তাহলে বরফ জমে কিভাবে? 

- বড় হও তখন সব বুঝবে। 

বাবার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারে না তাসফিয়া। সে কি ছোট নাকি! তাসফিয়া কোথায় তুমি। দাদার ডাক শুনে চিৎকার করে বলে, এই যে দাদু আসছি। সাথে সাথে দৌড়। জামিল শুধু বলে, আস্তে যাও। মুখের কথা শেষ না হতেই মেয়েটা উধাও। এত্তো আছাড় খায়। হুড়মুড় করে পড়ে তবু ছোটাছুটি কমে না। তাসফিয়াকে খুউব ভালোবাসে দাদু। সকাল বিকাল হাঁটতে যায় দুজনা। কতো গল্প। ঘুমানো ছাড়া দিন রাতের বেশির ভাগ সময় কাটে দাদুর সাথে। হঠাত এক বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে গেলেন তাসফিয়ার দাদু। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে অনেক মানুষ। সবাই কান্নাকাটি করছে। মাসুমা- সায়মা দুই ফুফু, হাবিব চাচ্চু কতো মানুষ। অবাক তাসফিয়া। দাদু কে খাটের উপর ঘুমাতে দেখে দৌড়ে যায়। 

- ও দাদু, এখনো ঘুমিয়ে আছো। কতো বেলা হয়ে গেল। ওঠো। দাদু আজ আমাকে ডাকলে না যে! ও দাদু চোখ খোলো।

বাবা এসে মাথায় হাত বুলায়। বাবাকে দেখেই তাসফিয়া প্রশ্ন করে, আব্বু দাদু আজ হাঁটতে যাবেনা?

- না, অনেক ঘুম পেয়েছে তোমার দাদুর। 

- ও..। কিছুক্ষণ পর আবার বলে, সবাই কাঁদছে কেন আব্বু?

চুপ করে নিজের চোখে জমা অশ্রু মোছে জামিল। তাসফিয়া নির্বিকার। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

সারাদিন পর রাতে যখন জামিল ফেরে, বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তাসফিয়া। প্রশ্ন করে, আব্বু দাদু কই? সারাদিন ঘুমিয়ে থাকলো। তোমরা সবাই আমার দাদুকে কোথায় নিয়ে গেলে?

- তোমার দাদু আকাশে চলে গেছেন।

- আকাশে?

- হ্যা।

- আজ আসবে না?

- না।

তারপর থেকে ফুসরত পেলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে তাসফিয়া। রিমঝিম বৃষ্টি দিনে জানালা ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এক সপ্তাহ আগে যে মেয়েটা সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতো সপ্তাহের ব্যবধানে সে মেয়েটা কি শান্ত! নিরব।

বিকালের দিকে অফিস থেকে ফিরে মেয়েটা কে না দেখলে যেন প্রান জুড়ায় না। বৃষ্টি হচ্ছে। সারা আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। 

- তাসফিয়া কই?

রান্নায় ব্যস্ত নিপা। না ফিরেই জবাব দেয়, ছিল তো। আছে কোথাও। ফ্লাটের চার রুমের কোথাও নেই মেয়েটা। তাসফিয়ার তো এখন জানালা ধরে বৃষ্টি দেখার কথা। গেল কোথায়! কোথাও খুঁজে না পেয়ে সবশেষে ছাদের দিকে পা বাড়ায় জামিল। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় হয়। ঠিক ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। মুষলধারার বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার পিচ্ছি মেয়েটা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। 

জামিলের বুকের ভেতরটা খা খা করে ওঠে। দরদী কন্ঠে বলে, আম্মু এভাবে বৃষ্টিতে কেউ ভেজে। ছোট মানুষদের একা একা ছাদে উঠতে হয় না। চলো।

তাসফিয়া যেন বাবার কথা শুনতে পায়নি। আব্বু তুমি বলেছিলে দাদা আকাশে। 

- হ্যা।

- কই সারা আকাশে দাদাকে তো দেখি না। 

- আকাশের উপরে। দেখা যাবে না। 

- দাদা আর আসবেনা?

- আসবে। আসবে তো। বুকের ভেতর চাপা ব্যথা নিয়ে মেয়েকে সান্ত¡না দেয়।

তাসফিয়া কি যেন ভাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এতো মেঘ পেরিয়ে দাদা আসবে কিভাবে?

- এই তো বৃষ্টির সাথে হটাত একদিন চলে আসবে।

- ও। এজন্যই বুঝি আমার বৃষ্টি ভালোলাগে। দাদা আসবে তাই?

বাবা চোখ মুছে তাসফিয়াকে, বুকে জড়িয়ে নেয়। ছোট্ট মেয়েটার চোখ দুটো ভিজে ওঠে। চার চোখের পানি ঝুমঝুম বর্ষায় একাকার হয়ে মিশে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ