রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

কারবালার ঘটনা কী ১০ই মহররমে সীমাবদ্ধ..?

সাইয়্যেদা সুরাইয়া : মহরম মাস বিশ্বের বুকে প্রতি বছর আসে আর যায়। মুসলিম জাতি এ মাস আসলে আবেগে আপ্লুত হয়। দিনটি পালিত হয় নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। ১০ই মহরম একটি নাম - একটি ইতিহাস। এ দিনটি আরো বহু আগে থেকেই বিশ্ব মাঝে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ আসমানী কিতাবধারী জাতিরাও ইসলামের আগমনের পুর্বে মহরমের এ দিনটি পালন করতেন । অপরিসীম তাৎপর্যমন্ডিত এ দিনটিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবী সৃষ্টির সুচনা থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং পৃথিবীর বিলুপ্তিও এ দিনেই ঘটাবেন বলে আমরা জানি।
তবে এ দিনটি মুসলিম জাহানে বিশেষভাবে পরিচিত হয়েছে-বিশ্ব নবী মহম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নয়নমনি -নবী নন্দিনী ফাতেমাতুজ যোহরা (রাঃ) এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী বিন আবু তালিবের কলিজার টুকরা হোসাইন (রাঃ)-এর মর্মন্তুদ শাহাদতের ঘটনার কারণে । এদিনটি বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী হক ও বাতিলের চিরন্তন লড়াইয়ে সত্যপন্থীগণ যে কখনই বাতিলের নিকট মাথানত করেন না ,তারই অনমনীয় অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য।
বর্তমান প্রবন্ধে আমারা যৎসামান্য আলোচনায় আসবো, নবী (সাঃ) এর দৌহিত্র ইমাম হাসান ও হোসাইন (রাঃ) কেন যুবক বয়সে তাদের জীবনের রঙ্গীন স্বপ্নময় সোনালী জগতের মোহময় হাতছানি উপেক্ষা করে শাহাদাতের পিয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে ইহজগতের সাথে নিজেদের জীবনের ইতি ঘটিয়ে ছিলেন। আজ যারা ইসলাম ও কুফরীর সংঘাতের মাঝে যে তত্ত্বের ধারণা নিয়ে বসে আছেন যে ,আল্লাহর নিকট দোয়া করলেই সমাজের সকল অনাচার অবিচারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব!!
এমনি ধরণের তত্ত্বিয় ও ব্যবহারিক জীবন ও জগতের প্রতি, ইমাম ভ্রাতাদ্বয়ের নির্মম শাহাদাতের ঘটনা একটি প্রচন্ড আঘাত বলেই আমরা মনে করি। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটন কালে আলী ইবনে হোসাইন (রাঃ) যদি একটিবারের জন্য আল্লাহর নিকট হাত তুলে এই দোয়া করতেন যে,“ হে আল্লাহ! তোমার ও আমার দুশমনদের পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দাও”। তাহলে পৃথিবীর এমন কোন শক্তি ছিল কি ইয়াজিদ বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার ? বুক প্রচন্ড পানির পিপাসায় শিশুপুত্র আজগর (রাঃ) যখন ইমাম হোসাইন (রাঃ) বুকে তপড়াচ্ছিলেন , স্নেহময় পিতার পক্ষে এ দৃশ্য বরদাশত করার মত যোগ্যতা আর মনোবল অর্জন করা একমাত্র নবী (সাঃ) দৌহিত্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল। কারণ এ সময় ইয়াজিদ বাহিনীর কর্ণধার ওবায়দুল্লাহ যিয়াদসহ স্বয়ং ইয়াযিদের প্রতি লানত বর্ষণ করলে , আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর এই প্রিয় বান্দাকে সহ তাঁর পরিবার পরিজনকে নিশ্চয় রক্ষা করতেন। কিন্তু তা করেন নি। যুগে যুগে বিশ্বের বুকে বহু শোকাবহ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কারবালার শোকাবহ ঘটনার মতো এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা অন্য কোথাও ঘটেছে কিনা ইতিহাসের অলিগলিতে ভ্রমন করেও কেহ এমন শোকাবহ ঘটনা খুঁজে পাবেন বলে আমরা মনে করিনা। ইহা এমন একটি জাতিয় ট্রাজেডি যা আজো বিশ্ব মুসলিমকে কাঁদায়। কান্নারও একটা মানে থাকা দরকার । কেন কাঁদবো কি জন্যে কাঁদবো? কারবালার সেই বীর শহীদানেরা তো এখন আল্লাহর পক্ষ ‘ হতে সর্বোত্তম প্রতিদান পাচ্ছেন । আমাদের কান্না তাদের জন্য লাভ-ক্ষতির কোন নিয়ামক নয়। সেটি হতে পারে অনন্ত জীবনের জন্য। এ বৈশ্বিক জীবনের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। আমরা যদি তাদের আত্মোৎসর্গের বিষয়টির প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করি, কেন তারা স্বৈরাচার ইয়াযিদের হাতে খেলাফতের বাইয়াত নেন নি। কেনইবা তারা নিজেদের তাজা জীবনটাকে অকাতরে বিলিয়ে গেলেন? উম্মতে মহম্মদীর জন্য কী তারা অনুকরণীয়-অনুসরণীয় কোন আদর্শ বা দৃষ্টান্ত রেখে যাননি? সময়ের প্রয়োজনে এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা পুরো মুসলীম উম্মার জন্যই অপরিহার্য বিষয় হওয়া দরকার।
নবী পরিবারের প্রতি ভালবাসার দৃষ্টান্ত : এখানে আমরা হোসাইন ইবনে জয়নুল আবেদীনের সাথে এক ব্যক্তির ব্যবহার ও তার স্বার্থপরতা সম্পর্কে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। ইমাম জয়নুল আবেদীন নিজেই বলেছেন ,“কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর কোন এক ব্যক্তি আমাকে গোপনে তাঁর গৃহে নিয়ে যান তিনি আমাকে অত্যন্ত আদর আপ্যায়ন করেন। তার অবস্থা এই ছিল যে,তিনি আমাকে দেখলে সর্বদা কাঁদতেন আর আমি মনে করতাম আমার জন্য একমাত্র এ ব্যক্তির অন্তরে বিশ্বস্ততা আছে। ইতিমধ্যে ওবায়দুল্লাহ যিয়াদের ঘোষণা শোনা যায় যে, হোসাইন ইবনে জয়নুল আবেদীনকে যে পকড়াও করে আনবে , তাকে তিনশত দিরহাম ইনাম দেওয়া হবে। এ ঘোষণা শুনে সে ব্যক্তি আমার কাছে আসে, সে আমার হাত বাঁধছিল আর ধরা বিগলীত ধারায় কেঁদেছিল। এ অবস্থায় সে আমাকে ইবনে যিয়াদের হাতে  সোপর্দ করে ‘ইনাম’ গ্রহণ করে। (তারাকাতে ইবনে সাদ)
এই ছিল নবী (সাঃ)-এর পরিবারের প্রতি সেই ব্যক্তির ভালোবাসার দৃষ্টান্ত!!! চলমান সময়ে আমাদের মুসলিম সমাজে এমনি ধরণের আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) -এর প্রতি ভালোবাসায় উজ্জীবিত মানুষের অভাব নেই?!! কিন্তু আল্লাহ-রাসুলকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর কটুক্তির প্রতিবাদে নাম- সর্বস্ব এইসব মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া দেখে ,আমরা বিস্মিত হতবাক হই!! ইনারাই মুসলমানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং দেবেন?!! এদের সংখ্যা বিশ্ব জুড়ে অনেক বেশী(?) তারা নামায পড়েন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, ঈদে মিলাদুন্নবী বেশ ঘটা করে পালন। করেন। ইফতার পার্টিতে দেদারসে খরচ করেন। মহররম মাস এলে শোক পালন করেন। এর নামই নাকি মুসলমানিত্ব?
ইনারা স্বৈরাচার ইয়াযিদ ও ওবায়দুল্লাহ যিয়াদের মতো তাদের স্বার্থের বেদীমূলে ঈমান-আকীদা এবং ইসলামী সংস্কৃতিকে নিজস্ব চিন্তা-চেতনার ছাঁচে ঢালাই করতে পবিত্র কুরআনিক জীবন বিধান ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহর মধ্যে ছুরি চালাতেও দ্বিধা করেন না (!) ইমাম হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-দের শাহাদাতের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে। পাশ কাটিয়ে মুসলীম বিশ্বে মহরম দিবসের শোক পালন করার মধ্যে মুসলমানদের জন্য কোন ধরণের উপকারীতা রয়েছে তা আমাদের বুঝে আসেনা। বর্তমান সময়ে মিশর ও সিরিয়ায় কি ঘটছে? এক ব্যক্তির ক্ষমতার মসনদকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে অসংখ্য আদম সন্তানের জীবনহানির পরোয়া ক্ষমতাধররা করেন না !!
আধুনিক মালেয়শিয়ার স্থপতি ড.মহাথির মহম্মদ জীবন্ত একটি দৃষ্টান্ত। ক্ষমতা অপব্যবহারকারী এবং ক্ষমতালোভী শাসক শ্রেণীর জন্য। কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম ড. মহাথিরের আম্মা তার ছেলেকে উপদেশ দিয়েছিলেন ,“বাবা! পেট ভরে খেতে হয়না । পেট খালি রেখেই খেতে হয়। তুমি আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করনা এবার অন্যদের সুযোগ দাও।” অত্যন্ত চমৎকার উপদেশ! ছেলেকে উপদেশের সাথে তিনি রাসুলুল্লাহর (সাঃ) -এর হাদীসটিও দক্ষতার সাথে উল্লেখ করেছেন ! মহীয়সী মায়ের এই সন্তান মায়ের উপদেশ মেনে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন।
আইন শাসকশ্রেণীর রাক্ষাবচ : / আমার মেঝভাই সৌদীআরবে তার বড় ছেলের সাথে কথা প্রসঙ্গে বলেন ‘আইনের শাসন বলতে কি বুঝায়? আইন তো যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের কথা বলে।
ড.মাহাথির মহম্মদ বলেছিলেন, “আইনের শাসন আবার কি? জাস্টিস শাসন অথাৎ ন্যায়বিচারের শাসনই পারে সত্যিকারের ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে?” সেদিন ভাইয়ার এই কথাগুলো শুনে চমৎকৃত হয়েছি। সত্যি তো আইনের শাসন আইনের শাসন শুনতে শুনতে আমাদের কান ঝালাপালা । এই আইন তো সব সরকারেরই রক্ষবচ। যখন যে সরকার ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করেন তখন তার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে বিভিন্ন আইনে সংশোধনী এনে থাকেন, নিজস্ব ধ্যান ধারণার বলে। তাহলে আইনের শাসনের মাধ্যমে দন্ডিতরা কিভাবে ন্যায়বিচার পাবেন? প্রকৃত ন্যায় বিচারের শাসনই পারে একজন শাসককে মজলুমের কাতারে নিয়ে আসতে যার দৃষ্টান্ত আমরা মুসলিম অমুসলিম বহু শাসকের ক্ষেত্রেই দেখতে পেয়েছি।
 স্বৈরাচার ইয়াযিদের মতার মসনদ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে ইমাম হাসান হোসাইন, যেভাবে পরিবার পরিজন সহ নিগৃহীত হয়েছেন তারা সময়ের প্রয়োজনে উম্মতে মহম্মদীর ভবিষ্যত প্রজন্মকে আল্লাহ বিমুখ অলস বাগাড়ম্বরকারী না হয়ে প্রকৃত মুসলিম হিসেবে মাথা উচুঁ করে দাড়াবার অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন, যা যুগে যুগে সত্য প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণকারী বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। হায় হাসান হায় হোসেন মাতমের মধ্যে মুসলিম জাতির জন্য এমন কোন দিক নির্দেশ ১০ই মহররমে নেই। যা আছে তার অনুসন্ধান করে বিশ্বের দিকে দিকে আল্লাহর আইনের মাধ্যমে নির্যাতিত নিপীড়িত জনতা কে শোষন -বঞ্চনার বেদীমুলে বিসর্জন না দেয়ার দীপ্ত শপথে উজ্জীবিত হওয়াই ১০ মহররমের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ