রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

‘আশুরায়ে মহররম’ এবং কতিপয় বিদআত

উম্মে রুম্মান (উমামা) : আরবিতে আশারা মানে হল দশ। যেকোনো মাসের দশ তারিখের বিশেষণকে আরবিতে বলা হয় আশুরা। তাই সম্মানিত এ মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে। কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে মহররম মাস সম্পর্কে যা এসেছে তা হলো এটি অনেক ফজিলতপূর্ণ মাস। কুরানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘আরবাআতুন হুরুম’ অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ সম্মানিত মাস ৪ টি হল- জিলকদ, জিলহজ্জ, মহররম ও রজব। তার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মহররম মাস। এ দিনের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা হল, আল্লাহ এ দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেন, হযরত আদম (আঃ) এ দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, এ দিনেই কবুল হয় তার তাওবা, সংগঠিত হয় হযরত নুহ (আঃ) এর মহাপ্লাবন, হযরত আইয়ুব (আঃ) দীর্ঘকাল অসুস্থতার পরে আরোগ্য লাভ করেন, হযরত ইউনুস (আঃ) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করে, হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহ নিজের কাছে তুলে নেন, হযরত মুসা (আঃ) বনী ইসরাইল কে ফেরাউন এর কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং ফেরাউন ও তার দলবল নিয়ে লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয় এবং সর্বশেষ এ দিনেই ইস্রাফিল (আঃ) শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার সাথে সাথে সংগঠিত হবে মহা প্রলয়কারী কেয়ামত। হাদিসে এ দিন সম্পর্কে আরও জানা যায় তা হল,ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত “তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মদিনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদিরা মহররম মাসের দশ তারিখে সিয়াম পালন করছে, রাসুল্লুল্লাহ (সাঃ) জানতে চাইলেন কেন তারা এই দিনে সিয়াম পালন করে? তারা বলে এটি তাদের কাছে বড় দিন কারণ এই দিনে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে (বনী ইসরাইল জাতিকে) হযরত মুসা (আঃ) এর মাধ্যমে অত্যাচারী ফেরাউন এর কবল থেকে উদ্ধার করেন এবং ফেরাউন ও তার দলবল নিয়ে লোহিত সাগরে নিমজ্জিত হয়। তাই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ হযরত মুসা (আঃ) সিয়াম পালন করতেন তাই আমরাও এ মহররম মাসের দশ তারিখে সিয়াম পালন করি। উত্তর শুনে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, হযরত মুসা (আঃ) এর কৃতজ্ঞতা অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি হকদার, অতঃপর নিজে রোজা রাখতেন এবং উম্মতকে নির্দেশ প্রদান করেন”। (বুখারি- ৩৩৯৭, মুসলিম- ১১৩৯)।)
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ সম্মানিত মাসের প্রকৃত কারণ ও করণীয় ভুলতে বসেছে আমাদের মুসলিম সমাজ। এ মাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সমন্বয় থাকলে ও পৃথিবীব্যাপী এক শ্রেণীর মানুষ অজ্ঞতাবশত অথবা পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে কতিপয় বিদআতে লিপ্ত। আমাদের জানা দরকার বিদআত কি? কিভাবে না যেনে প্রচলিত সমাজের সর্বক্ষেত্রে গতবাঁধা নিয়মে ছড়িয়ে পড়ছে এ মারাত্মক ব্যাধি। বিদআত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নতুন আবিষ্কার। শরিয়তের পরিভাষায় ধর্মের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন বা নতুন কিছু আবিষ্কার বিদআত। বিদআত ২ প্রকার,”১” বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআত। “২” আমলের ক্ষেত্রে বিদআত। কোন কিছু অনুসরণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের পরবর্তী পর্যায়ের পদক্ষেপ হল তদানুযায়ী আমল। আর এরই মাধ্যমে শুরু হয় গোমরাহির ও ভ্রষ্টতার। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,” সর্বোত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, সর্বোত্তম পদ্ধতি হচ্ছে আমার পদ্ধতি। আর নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে শরিয়াতে নতুন কিছু তৈরি করা (বিদআত), এবং প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা নিয়ে যায় জাহান্নামের দিকে”। (মুসলিম - ৭৬৮)। আমাদের দীনের ক্ষেত্রে কখনও উচিত নয় নতুন কিছু সংযোজন করা, কারণ আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং এ দীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়াছেন। না জেনে বিদআতে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভালো কাজগুলো বিনষ্ট করে দিচ্ছি আর সমাজে ছড়াচ্ছি গোমরাহী। আমাদের জানা উচিত আশুরায়ে মহররম শ্রেষ্ঠ তার পূর্ববর্তী ঘটনা সমূহের জন্য কারবালার প্রান্তরে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের জন্য নয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ দিনে শুকরিয়া আদায় ও কৃতজ্ঞতা অনুসরণ স্বরূপ রোজা রাখতেন, এটাই আমাদের সুন্নাত। আমাদের কখন উচিত নয় যা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) করেননি এমন কোন কাজ, কথা, আচরণ সুন্নাত হিসাবে পালন ও প্রচলন করা। যারা এগুলো করে তারা তো সুস্পষ্ট জাহান্নামী। আল্লাহ আমাদের তাদের মাঝে অর্ন্তরভুক্ত না করুন। ৬১ হিজরির মহররম মাসে ১০ তারিখ সংগঠিত হয় এমন এক ঘটনা যা আশুরার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ হয়। গোটা মুসলিম উম্মাহর কাছে যা ছিল বিজয়, শোকর এবং আনন্দের দিন, তা পরিণত হল বেদনাহত, রক্তাক্ত ও মাতমের দিনে। সত্যকে বলিয়ান রাখতে, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে নির্মমভাবে শহীদ হন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর চোখের মণি, তার দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রাঃ) এবং তার দল। ইসলামের খিলাফত সমুন্নত রাখতে নির্দ্বিধায় নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তারা। শিখিয়ে গেছেন কিভাবে ইসলামের জন্য করতে হয় সর্বোচ্চ ত্যাগ।
নিঃসন্দেহে কারবালা প্রান্তরের বীভৎস কাহিনী সকল পৈশাচিকতা কে হার মানায়। স্তব্ধ করে দেয় আমাদের মানবীয় সত্তাকে। কিন্তু এ সামগ্রিক বলিদান আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পাথেয়, এ বলিদান সাক্ষী কিভাবে আল্লাহর সাথে আমাদের কৃত ওয়াদা রক্ষা করতে হয়। শিখায় সত্য ও (মুমিনদের পথ কখনই সুগম ছিলনা এবং তা সুগম হবার নয়। কিন্তু হযরত হুসাইন (রাঃ) এর মৃত্যুর চৌদ্দশত বছর পর ও কেন আমরা এ শোক পালন করবো?’ কুরআন ও হাদিস কি তাই বলে? সমাজের বাস্তবিক চিত্র অন্য কিছুই বলে। তবে হ্যাঁ আজও এ ঘটনা আমাদের অশ্রুসজল করে তুলে কিন্তু মহররম এর প্রকৃত ঘটনা পিছনে ফেলে আমরা অবমাননা করছি আমাদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাসের এবং তাদের আত্মত্যাগের মহৎ উদ্দেশ্যকে।
এ দিনকে শোকবহ দিন হিসাবে উদযাপন করায় নেই কোনে সার্থকতা। এ দিনকে উদ্দেশ করে লিপ্ত হচ্ছি বিদআতের মত ভয়ানক অপরাধে, পিছনে ফেলে দিচ্ছি নবীর সুন্নাত। সবচেয়ে ভয়ানক বিদআত হল এ দিনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয় তাজিয়া মিছিল, শোকগাঁথা পাঠ, শোক। প্রকাশ করার জন্য শরীরকে রক্তাক্ত করা, কালো কাপড় পরিধান, বিয়ে-শাদি থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি। আর নয় মার্সিয়া ক্রন্দন, নয় বুক চাপড়ানো আহাজারি, এ দিন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমাজের, দেশের, রাষ্ট্রের দূর আবস্থা দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের । জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের দুরাবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য মহররমের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে মজলুমের পক্ষে ঢাল হতে পারি, পারি সততার মশাল, নীতির প্রশ্নে যেন কোন ভাবেই আপোেষ না করি। আর নয় তাজিয়া মিছিল, মার্সিয়া ক্রন্দন, শোক শোভাযাত্রা আর অন্ধ অনুকরন, মহররম এর সম্পর্কে আমাদের চাই প্রকৃত প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও সচেতনতা, এ সম্মানিত মাসের আমলের মাধ্যমে যাতে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা অর্জন করতে পারি। এ মাসের বেদনাবহ কাহিনী থেকে যেন শিক্ষা নিয়ে দীন ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারি, প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে যেন ন্যায়ের পতাকা উত্তোলন করতে পারি।। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন (আমিন)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ