শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

কবরের তিন প্রশ্ন জীবনের মূলমন্ত্র

-ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ
আল্লাহ বলেছেন-কুল্লু নাফসিন জায়িকাতুল মাউত-“প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে”। (সূরা আল এমরান ১৮৫) মৃত্যুর সংবাদ দিয়ে কুরআন পাকে আল্লাহ এভাবে চারবার মানুষদেরকে হুশিয়ার করেছেন। আল্লাহর হুকুমে যে মানষের সৃষ্টি সে মানুষই আবার একদিন আল্লাহর হুকুমেই বিদায় হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায় অনেক সাধের এ জীবনলীলা।বাড়ী, গাড়ী, নারী, সহায়-সম্পদ সব কিছু ফেলে রেখে খালি হাতে কবরে যেতে হয়। সাথী হয় শুধু আমল। এ জন্যে মানুষকে আগেই জানানো হয়েছে যে, জ্বীন ও মানুষজাতির সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের গোলামী করার জন্য। আল্লাহ বলেন,“ওয়ামা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিয়্যাবুদু। অর্থাৎ আমি জ্বিন ও মানুষজাতিকে কেবলমাত্র আমার এবাদত (গোলামী) করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। (আজ জারিয়া ৫৬) মানুষের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা আর  মৃত্যুদাতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। শুধু রাব্বুল আলামিনের দাসত্ব করা,  তাঁর দেয়া নির্দিষ্ট জীবনবিধান মেনে চলা এবং বিশ্বনবী(সাঃ)কে রাসুল বা নেতা হিসেবে অনুসরণ করে মানুষ তার জীবন চালাবে এটাই ছিল আল্লাহ পাকের দাবী। তাই মানুষের জন্য এ দুনিয়া হল পরীক্ষাকেন্দ্র। মূলতঃ আল্লাহর হুকুমমত চলে মরনের পরে জান্নাতবাসী হওয়াই হল মানুষের দায়িত্ব।
এভাবেই আমরা সবাই জানি যে,জন্মিলে মরণ অতি সত্য।কিন্তু প্রকাশ্য শত্রু ইবলিশের প্ররোচণায় পড়ে মানুষ তার রবের গোলামী, তাঁর পাঠানো দ্বীন(জীবন ব্যবস্থা), নবীর আনুগত্য এবং পরকালের কথা ভুলে যায় ।নির্ভেজাল তৌহিদ ভুলে গিয়ে পদে পদে শিরকে লিপ্ত হয়ে যায় ।অথচ  ধাপে ধাপে সবাইকে এ দুনিয়া থেকে পরপারের স্থায়ী ঠিকানায় চলে যেতে হয় ।আল্লাহ পাকের নির্দেশে হযরত আজরাঈল(আ;) যেদিন জান  কবজ করতে আসে সেদিন তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ আচমকা হয়ে যায়। মানুষের মরণ কাল বড় কঠিন বিপদের কাল। তবুও মানুষ নির্ধারিত সময়েই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তবে এ মৃত্যু সহজ নহে ।যারা পূণ্যবান তাদের মৃত্যুতে কষ্ট হবে না। কিন্তু পাপীদের মৃত্যু যন্ত্রনা হবে খুবই ভয়াবহ। এজন্য যারা রাব্বুল আলামিনকে ভুলে যায় তারা বড়ই দুর্ভাগা ।মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে উদ্দেশ্যে আমাদের সৃষ্টি করেছেন ঐ উদ্দেশ্য পূরণে যে সফল সেই হবে ভাগ্যবান।
কবরের তিন প্রশ্ন
মুসলিম শরীফে উল্লেখিত, রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কবরস্ত করার পর মুনকার নকীর দুই ফেরেশ্তা এসে মৃত ব্যক্তির রূহকে তিনটি প্রশ্ন করবে :
১) মান রাব্বুকা-তোমার রব কে ?
২) মা দ্বীনুকা –তোমার দ্বীন কি ?
৩) মান নাবিয়্যুকা-তোমার নবী কে ?
মাত্র তিনটি প্রশ্ন ।সব কিছু বাদ দিয়ে ছোট্ট তিনটি প্রশ্ন করে মানুষের জীবনের পূরো কর্মফল জেনে নেয়া হবে ।
জীবনের মূলমন্ত্র
এ তিন প্রশ্নের মধ্যে প্রথম প্রশ্ন “রব” এর  মধ্যেই জীবনের মূল নিহীত। এ মূলের সাথে সংশ্লিষ্ট পরবর্তী দুটো বিষয় দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) ও নবী বা রিসালাত মিলিয়ে জীবনের মূলমন্ত্র। তাই কবরের তিন প্রশ্ন: জীবনের মূলমন্ত্র। এ বিষয়ের উপরই আমাদের আলোচনা।
আমরা জানি মানুষ সৃষ্টির পুর্বে প্রত্যেক মানুষের রূহকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রশ্ন করেছিলেন; আলাস্তু বিরাব্বুকুম –আমি কি তোমাদের রব নই ? সেদিন সব রূহই স্বীকার করেছিল। বলেছিল, ক্বালু বালা – হ্যা, তুমি আমাদের রব। (সুরা আল আরাফ ১৭২) আমাদের রব হলেন মহান আল্লাহ। এ রব মানে কি ? “রব” আরবী শব্দ। আরবীতে ইহাকে তিনটি অর্থে ব্যবহার করা হয়। ১) মালিক ও প্রভু ২) অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সংরক্ষণকারী। ৩) সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, শাসনকর্তা, পরিচালক ও সংগঠক।
আল্লাহ তাআলা দুনিয়া জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আল্লাহ পাক কুরআনের মাধ্যমে তা বার বার বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছেন। যুগে যুগে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবীদের পাঠিয়েছেন যে উদ্দেশ্যে তা হল এ রবুবিয়াত–বা প্রভুত্ব রক্ষা করা । নবীদের সাথে বিরোধীতা হয়েছে তাদের যারা আল্লাহর এ একক প্রভুত্ব মানতে রাজী হয় নি ।অথচ এ সমস্ত জগতের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন । তিনিই সৃষ্টিকর্তা, পূর্ণতাদানকারী, লালনপালনকারী, পর্যবেক্ষণকারী, আইনকানুনদাতা, রিজিকের ব্যবস্থাকারী, অস্তিত্ব রক্ষাকারী,গতিপথের নির্দেশকারী, প্রভুত্বকারী ইত্যাদি ।
রাব্বুল আলামিন
সূরা ফাতিহার শুরুতেই আমরা বলি, আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আরামিন-মানে হল, যাবতীয় গুণকির্তন একমাত্র আল্লাহতাআলার জন্য যিনি বিশ্ব জগতসমূহের রব।
আলম একবচন। এর অর্থ হল জগত ।আলামিন তার বহুবচন। তার অর্থ হল জগত সমূহ। আমরা যেখানে জীবনী শক্তি নিয়ে আছি এটা একটা জগত ।এটাকে বলে পৃথিবীর জগত। পৃথিবীর মত আরো অনেক গ্রহ নিয়ে চলছে সৌরমন্ডল। অনুরূপ আরো অসংখ্য সৌরমন্ডল বিরাজ করছে বিশ্ব জাহানে ।সমস্ত সৌরমন্ডলের পরে আছে গ্ল্কাশি। এরপরে অজানা আরো অনেক জগত মিলিয়ে হল বিশ্ব জগত ।সেটা বিস্তারিতভাবে অন্যত্র লিখা হবে। সীমাহীন এ জগত সমূহের উপরে  আছে এক এক করে সাত আসমান। তার উপরে অবস্থিত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আরশে আজীম । ওখান থেকেই আল্লাহ পাক আমাদের অজানা এ বিশ্ব জগত সমূহের পরিচালন, নিয়ন্ত্রন,ভারসাম্য রক্ষা করন, তার মধ্যস্থিত অগণিত প্রাণীকূল এবং ফুল,ফল ও শষ্যরাজীর সবকিছু নিয়ন্ত্রন করছেন। অতি সংক্ষেপে এমন আলামিনেরই একমাত্র রব হলেন আমাদের স্রষ্টাপাক আল্লাহ তাআলা ।
আমাদের সৃষ্টির পূর্বে ছিলাম মাতৃজঠরে। ওটা এক জগত ।এর পূর্বে ছিলাম রূহ জগতে । মৃত্যুর পরে আছে আরো তিনটি আলম বা জগত। তার প্রথমটি হল আলমে বরযখ ।একে বলা হয় পর্দার আড়ালের জগত। এর পরের জগত হল কিয়ামত বা হাশর। সর্ব শেষ জগত হল আখিরাতের কর্মফল দিবস । এক নজরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিশাল সাম্রাজ্যের কিয়দংশ এখানে তুলে ধরা হল।
রব শুধু মাত্র এক আল্লাহই
আল্লাহপাক এককভাবে বিশ্ব জাহানের রব ।আমাদের সৃষ্টির আগেই রূহ জগতে আমরা শুধু এক আল্লাহকে রব মেনে নেয়ার ওয়াদা দিয়েই এ জগতে এসেছি ।পরে যখন আল্লাহর হুকুম মত মায়ের পেটে এসেছি তখন আবার আমাদের চেহারা সুরত দিবার কালে আল্লাহ গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেন। সূরা ইনফিতরের ৬ থেকে ৮ নং আয়াতে আল্লাহ সেই কথা বলেন ,“হে মানুষ, সেই মহামহিম প্রতিপালকের (রাব্বিকা)  ব্যাপারে কোন জিনিস তোমাকে ধোকায় ফেলেছে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন,তারপর তোমাকে সুঠাম করেছেন ? তারপর তোমাকে করেছেন ভারসাম্যপূণ। তিনি তোমাকে তাঁর ইচ্ছা মত আকৃতিতে গঠন করেছেন ”। শুধু আল্লাহকেই ‘রব’ মেনে নেয়ার জন্যে পূনরায় দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়েছে ।এ ভাবে কুরআন পাকে বার বার আল্লাহর সাথে বান্দার প্রসংগ আসলেই সেখানে ‘রব’ ‘ইলাহ’ আর ‘দাস’ এর ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণীয় আলোচনা এসেছে। ‘রব’ এর গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য আল্লাহ পাক ‘রাব্বুকা’, ‘রাব্বুন্নাস’, ‘রাব্বুকি’, ‘রাব্বুকুমা’, ‘রাব্বানা’, ‘রাব্বি’, ‘রাব্বুকুম’, ‘রাব্বুহুম’ ইত্যাদি রূপে প্রকাশ করেছেন । আল্লাহ বলেন, ‘হে প্রভু (রাব্বানা), আমরা তোমার কাছে গুণাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করছি’ । (বাকারা-২৮৫)। অনুরূপভাবে আরো বণিত আছে ‘আর স্বীয় রব এর (রাব্বিহা) নিদেশ পালন করবে, আর তা-ই তার করণীয়’। (ইনশিকাক-২)‘তোমার প্রতিপালকের (রাব্বিকা) পাকড়াও অবশ্যই বড় কঠিন ।(বুরূজ-১২)‘তুমি কি দেখোনি তোমার প্রতিপালক (রাব্বুকা) আদ জাতির সাথে কী ব্যবহার করেছিলেন’? (আল ফাজর৬) ‘তোমার প্রতিপালক (রাব্বাকা) অবশ্যই দৃষ্টি রাখছেন যেমন ঘাঁটিতে শত্রুর প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়’ ।(আল ফাজর ১৪) ‘কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের(রাব্বিকা) উদ্দেশ্যে নামায আদায় করো এবং কুরবানী কর’ । (আল কাওছার ২) ‘বলো, আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের (রাব্বি) নিকট’। (সূরা নাস ১) হে আমাদের প্রতিপালক! (রাব্বানা) যে বোঝা বহন করার সামর্থ আমাদের নেই, তা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ো না। আমাদের প্রতি কোমল হও, আমাদের অপরাধ ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি করুনা করো ।তুমি আমাদের অভিভাবক ।কাফেরের মোকাবিলায় তুমি আমাদের সাহায্য করো । (সূরা বাকারা ২৮৬)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ