মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

শিগগিরই আরেক দফা বাড়ছে গ্যাসের দাম

কামাল উদ্দিন সুমন : শিগগিরই আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসছে। চলতি সপ্তাহের শেষে বা আগামী সপ্তাহের শুরুতে এই ঘোষণা আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী গতকাল শনিবার বলেছেন আগামী দুই চার দিনের মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে।
গ্যাসের দাম  বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করে বিইআরসির একটি সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে বা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক বাদে অন্য খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের বর্ধিত দাম ঘোষণা করা হবে। মূলত এলএনজি আমদানীর ফলে ৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তুলে নিতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
এর আগে গতবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বশেষ গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। দুই ধাপে গড়ে ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়ায় বিইআরসি। প্রথম ধাপ ১ মার্চ এবং দ্বিতীয় ধাপ ১ জুন থেকে কার্যকর হয়। তারও আগে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ওই সময় গ্রাহক পর্যায়ে সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছিল।
প্রসঙ্গত, বিইআরসির শুনানি শেষের ৯০ দিনের মধ্যে গ্যাসের মূল্য পুনঃনির্ধারণের ঘোষণা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত জুনে শুনানি শেষ হওয়ার পর ৯০ দিন সময় শেষ হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। এরমধ্যেই বিইআরসিকে গ্যাসের দাম পুনঃনির্ধারণের আদেশ দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক বাদে অন্য গ্রাহকদের গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘দুই-চার দিনের মধ্যেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে। তবে গ্যাসের দাম যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সে বিষয়ে বিইআরসিকে বলা হয়েছে।’
এর আগে গত ১১ জুন থেকে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি শুরু করে কমিশন। এই বছরের মার্চ মাসে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো গড়ে ৭৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তবে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়নি তারা। কমিশন গঠিত কারিগরি কমিটি এবার ১৪৩ ভাগ গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করে।
বিইআরসির সদস্য আব্দুল আজিজ খান জানান, ‘সরকার এলএনজি আমদানির শুরুতে গ্যাসের ওপর থাকা সব ধরনের কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কোম্পানিগুলোকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হবে। ওই চিঠি আমাদের কাছে এলে আমরা বর্ধিত গ্যাসের দাম ঘোষণা করবো।’
বিইআরসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী শুনানি শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দামের বিষয়ে ঘোষণা দিতে হয় কমিশনকে। এ হিসাবে আগামী সপ্তাহে ৯০ দিন শেষ হচ্ছে। এর মধ্যেই দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসবে।’ এই সপ্তাহের শেষে বা আগামী সপ্তাহের শুরুতে ঘোষণা হতে পারে বলে তিনি জানান।
সূত্র জানায়, সব বিতরণ কোম্পানিই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের  (এলএনজি) সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। সে হিসেবেই কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করে। গত ১৮ আগস্ট প্রথমবারের মতো পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয় দেশে। আপাতত শুধু চট্টগ্রামে এই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। পাইপ লাইনের কাজসহ সব ধরনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি শেষ হলে জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ শুরু হবে এলএনজি।
কমিশন গ্যাসের দাম মূল্যায়নের সময় জানিয়েছিল, এলএনজি পাইপলাইনে যুক্ত হলেই ছয় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। আর সেই ঘাটতি পূরণ করতে হলে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে। তবে এখাতে সরকার ভর্তুকির পরিমাণ যদি আরও বাড়ায়, তাহলে গ্যাসের দাম এর চেয়ে কম বাড়ালেও হবে।
গ্যাসের দাম ও সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর বিষয়ে গত ১১জুন থেকে গণশুনানি শুরু করে বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানি চলে ২১ জুন পর্যন্ত ।
বিইআরসি জানায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের ইউনিট প্রতি দাম ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮০ পয়সা, আর শিল্প-কলকারখানায় ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা, সিএনজির দাম প্রতি ইউনিট ৪০ টাকা থেকে ৪৮ টাকা বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
এছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিটে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১৬ টাকা এবং চা বাগানে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮০ পয়সা করার প্রস্তাব দেয় কোম্পানিগুলো।
শুনানী শেষে এদিকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের দাম ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।  এছাড়া দাম বাড়ানো কথা জানানো হয়  বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্যাভটিভ পাওয়ার (শিল্পের  বিদ্যুৎ ), সার কারখানা, শিল্প উৎপাদন ও সিএনজি গ্রাহকদের।
জ্বালানী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল আলম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে গড়ে দেশে একটা কূপও খনন করা হয়নি। ইচ্ছা করে দেশের জ্বালানি খাতে স্থবিরতা তেরি করা হয়েছে। নানা সময় ভিন্ন ভিন্ন কথা বলা হয়েছে। এক সময় বলা হয়েছে, দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। আর এখন বলা হচ্ছে, দেশে কোনো গ্যাস নেই। অথচ ঠিকমতো অনুসন্ধানই করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, সিলেট ছাড়া অন্য কোনো এলাকায় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে খুব একটা কাজ না হওয়াতে এখন এলএনজি আনতে হচ্ছে। এটি দেশের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জুনায়েদ সাকি বলেন, অনেকটা ইচ্ছা করেই গ্যাসের সংকট সৃষ্টি করে কিছু লোকজনকে একচেটিয়া ব্যবসা দিতে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। কমিশনকে গ্যাসের দাম না বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে জনজীবন বিপর্যস্ত হবে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকট রয়েছে। এ সংকট ক্রমেই বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, চড়া দামে জ্বালানি আমদানি নিয়ে উদ্বিগ্ন জ্বালানি বিভাগ। এ বর্ধিত দামের গ্যাস গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে সরকারকে হয় গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো ভর্তুকি দিতে হবে। তাই সরকার দাম বাড়ানোর পথই গ্রহণ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ