শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শরতের শিশিরভেজা শিউলি ফুল যেন হৃদয় ছোঁয়া প্রকৃতির নির্মল ভালোবাসা

মুহাম্মদ নূরে আলম : শরতের সকালে শিশিরমাখা শিউলি ফুল দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। ঝলমল করছে দুপুরের রোদ। বাংলা সনের হিসেবে আজ রোববার ১লা আশ্বিন ১৪২৫। কিন্তু হেমন্তের প্রভাব বাড়ছে প্রকৃতিতে। সন্ধ্যা ও ভোরে এখন বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া ও কুয়াশা বা শিশির পড়া শুরু হয়েগেছে। আসলেই শরৎ বাংলাদেশের কোমল, স্নিগ্ধ এক ঋতু। শরৎ ঋতুর রয়েছে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য। আমরা জানি, বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হয়। এক-এক ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে ও ফলে, ফসলে ও সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর আর কোন দেশের প্রকৃতিতে ঋতুবৈচিত্র্যর এমন রূপ বোধ হয় নেই । রাজধানী ঢাকার রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বোটানিকেল গার্ডেন ও শিশু একাডেমির প্রাঙ্গণে এখন শুধুই শিউলি ফুলের মেলা। শিউলি মূলত শরতেরই ফুল। তবে হেমন্তও বঞ্চিত নয় শিউলির শোভা ও সৌরভ থেকে। ফুল ফোটা দিনে দিনে কমে এলেও কার্তিকের শেষাবধি তার দেখা পাওয়া যাবে। শিউলি ও শেফালি দুটো নামই লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘ শেফালী বনের মনের কামনা’, ‘শিউলি ফুল, শিউলি ফুল, কেমন ভুল, এমন ভুল’, ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি...শিউলিবনের বুক যে ওঠে আন্দোলি’, ‘শিউলী বনের উদাস বায়ু  পড়ে থাকে তরুতলে এই গানগুলো শিউলির মতোই সুরভিত হয়ে আছে শ্রোতাদের কাছে। শিউলি কেবল কবিদেরই বিমুগ্ধ করেনি, তার অসংখ্য মুগ্ধ অনুরাগী যুগে যুগে। ভোরবেলায় শিশির মাখা শিউলি ফুল কুড়াতে যাওয়ার স্মৃতিও অম্লান সেই অনুরক্তদের অন্তরে।
ভাদ্র-আশ্বিন এ দুই মাস বাংলাদেশে শরৎকাল। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে রূপময়। গাছপালার পত্রপল্লবে গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার ফিকে হয়ে আসতেই পাখপাখালির দল মহাকলরবে ডানা মেলে উড়ে যায় নীল আকাশে। আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মত উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। শিমুল তুলোর মতো ভেসে চলে সাদা মেঘের খেয়া। চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যায় শেফালিফুলের মদির গন্ধভরা ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়া। শিউলি তলায় হালকা শিশিরে ভেজা দুর্বাঘাসের ওপর চাদরের মত বিছিয়ে থাকে সাদা আর জাফরন রং মেশানো রাশি রাশি শিউলিফুল। শরতের ভোরের এই সুরভিত বাতাস মনে জাগায় আনন্দের বন্যা। তাই খুব ভোরে কিশোর কিশোরীরা ছুটে যায় শিউলি তলায়। সূর্য ওঠে সোনার আলোয়। নির্মল আলোয় ভরে যায় চারদিক। আমন ধানের সবুজ চারার ওপর ঢেউ খেলে যায় উদাসী হাওয়া। আদিগন্ত সবুজের সমারোহ। ফসলের মাঠের একপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর রুপালি ধারায় সূর্যের আলো ঝলমল করে। ভরা নদীর বুকে পাল তুলে মালবোঝাই নৌকা চলে যায়। ডিঙি নাও বাইতে বাইতে কোনো মাঝি হয়তোবা গেয়ে ওঠে ভাটিয়ালি গান। পুকুরপাড়ে আমগাছের ডালে মাছরাঙা ধ্যান করে। স্বচ্ছ জলে পুঁটি, চান্দা বা খলসে মাছের রূপালি শরীর ভেসে উঠলে সে ছোঁ মেরে তুলে নেবে তার লম্বা ঠোঁটে। নদীর চরে চখাচখি, ,পানকৌড়ি, বালিহাঁস বা খঞ্জনা পাখির ডাক। কলসি কাঁকে মেঠো পথে হেঁটে চলে গাঁয়ের বধূ। ফসলের খেতে অমিত সম্ভাবনা কৃষকের চোখে স্বপ্নে ছাওয়া সবুজ ধানখেতটা একবার চেয়ে দেখে কৃষক। বিলের জলে নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকে সাদা ও লাল শাপলা। সকালের হালকা কুয়াশায় সেই শাপলা এক স্বপ্নিল দৃশ্যের আভাস আনে। আলো চিকচিক বিলের জলে ফুটে ওঠে প্রকৃতির অপর লীলা।
জন্মস্থান উত্তর-ভারত। বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis। আমাদের দেশের সব অঞ্চলেই জন্মে। চেনা গাছ। লাতিন Nyctanthes-এর অর্থ হচ্ছে ‘সন্ধ্যায় ফোটা’ এবং arbor-tristis-এর মানে হচ্ছে ‘বিষণ্ন গাছ’। সন্ধ্যায় ফোটা আর সকালে ঝরা ফুলের মধ্যে বিষণ্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটাই এই রকম নামকরণের কারণ বলে ধারণা করা হয়। ঝরা ফুলগলো যেমন তরতাজা, শিশির গুলোও তেমনি হিরার টুকরা। যদিও সাধারণভাবে এটি শিউলি নামেই পরিচিত। যাই হোক এই শিউলি ফুলের আর এক নাম পারিজাত।
শিউলির ভেষজ গুণ: অন্যান্য গাছ গাছড়ার মত শিউলির ও রয়েছে ভেষজ গুণ। বিখ্যাত অমরকোষ গ্রন্থের রচয়িতা অমর সিংহ শিউলিকে বণৌষধী হিসাবে নথিভূক্ত করেছেন। আর্য়বেদিক শাস্ত্রে শিউলির থেকে শিউলির পাতার ভেষজ গুণ বেশি করে উল্লেখ্য করা আছে। ভারতীয় বনৌষধি নামক গ্রন্থে উল্লেখ্য আছে বাতরোগে শিউলি পাতার রস খুব উপকারী। এই গ্রন্থে শিউলিকে ভেষজ জগতেও চানক্য হিসাবে অভিহিত করে বলা হয়েছে যে শত ভীমরুলের হাত থেকে চন্দ্রগুপ্তকে রক্ষা করছিলেন চানক্য। আর মানুষের সায়েটিকা বাতে যখন ভীমরুলের হুল ফোটানর মত যন্ত্রণা আসে তাকে দমন করতে পারে শিউলি। সায়েটিকা বাতে ৮/১০ টি শিউলির পাতা ভালভাবে থোক করে ৪/৫ কাপ পানিতে সেদ্ধ করে এক কাপ থাকতে নামিয়ে ছাকতে হবে। এরপর সকাল বিকাল দুবেলা কয়েকদিন করে খাওয়ালে যন্ত্রণার উপশম হবে। নিয়ম অনুযায়ি এই রস খেলে অনেক উপকার হয়।
মেদ রোগ: মেদ কমাতে বৈদ্যরা শিঊলি ডালের চূর্ণ দেড় গ্রাম মাত্রায় সকালে বিকালে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই ব্যবস্থা অবলম্বনে কিছু দিনের মধ্যে মেদের হ্রাস লক্ষ্য করা যায়। কৃমিঃ শিউলি পাতার রস সকাল বিকাল দুবেলা গরম পানি দিয়ে খাওয়ালে কেচোর মত কৃমি পরে যায়। গুড়া কৃমির উপদ্রব ও কমে যায়।
গলা বসা: গলা বসার ক্ষেত্রে শিউলি পাতার রস বেশ উপকারী। শ্লেশ্মার দোষে অনেকের গলার আওয়াজ বসে যায়।, এ ক্ষেত্রে শিউলি পাতার রস সকাল বিকাল ২ বেলা খাওয়ালে উপকার পাওয়ার নিশ্চয়তা।
জ্বালা: কেউ কেউ দিনের কোন কোন সময় শরীরে জ্বালা অনুভব করেন এ ক্ষেত্রে শিউলি পাতার রস সকাল বিকাল ২ বেলা খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। তবে দীর্ঘদিন খাবার প্রয়োজন হলে চালের চূর্ণর সাথে ১ গ্রাম মাত্রায় দুবেলা খাওয়া ভাল।
মূর্ছা রোগ: মূর্ছা রোগে শিউলি পাতার রস ২ চামচ মাত্রায় অল্প গরম করে দুবেলা খেতে হবে। তবে মূর্ছা রোগের শুরুর দিকে খাওয়ালে ভাল ফল দেয়।
খাদ্যে বিষ ক্রিয়া: খাদ্যে বিষক্রিয়ার দরুন রোগী অত্যাধিক বমি করে রোগী দুর্বল হয়ে পরলে, অল্প গরম জলে শিউলির রস ২ বেলা খেলে দুর্বলতা কেটে যায়।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতির নিখুঁত আল্পনা এঁকেছেন। তার ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক'-সহ অনেক গানই শরৎ-প্রকৃতির লাবণ্যময় রূপ নিয়ে হাজির রয়েছে। শরতের অসম্ভব চিত্ররূপময়তা ফুটে উঠেছে এ সব রচনায়: "এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।/দলি শাপলা শালুক শত দল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল/নীল লাল ঝরায়ে ঢলঢল এসো অরণ্য পর্বতের”। আদি মহাকবি কালিদাস ‘ মেঘদূত’ কাব্যের জন্য বিখ্যাত এবং তিনিও শরৎ বন্দনায় বলেছেন: “প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎ কাল সমাগত।’
শিউলি চরিত: দক্ষিণ এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব থাইল্যান্ড থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশ, ভারত, উত্তরে নেপাল ও পূর্বে পাকিস্তান পর্যন্ত এলাকা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। শেফালি নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের ও থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি প্রদেশের রাষ্ট্রীয় ফুল। শিউলি গাছ নরম ধূসর ছাল বা বাকল বিশিষ্ট হয় এবং ১০ মিটারের মতো লম্বা হয়ে থাকে। গাছের পাতাগুলো ৬-৭ সেন্টিমিটার লম্বা ও সমান্তরাল প্রান্তের বিপরীতমুখী থাকে। সুগন্ধি জাতীয় এই ফুলে রয়েছে পাঁচ থেকে সাতটি সাদা বৃতি ও মাঝে লালচে-কমলা টিউবের মতো বৃন্ত। এর ফল চ্যাপ্টা ও বাদামি হৃদপিন্ডাকৃতির। ফলের ব্যাস ২ সেন্টিমিটার এবং এটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ভাগে একটি করে বীজ থাকে। শিউলি, শেফালি অথবা শেফালিকা, সংস্কৃতিতে বলে পারিজাত আর বাংলায় বলে শেফালি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এবং থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরি, রাজ্য প্রতীক বা রাষ্ট্রীয় ফুল। ঔষধি হিসেবে ব্যবহার হয় শিউলির বীজ, পাতা ও ফুল। এই ফুল বোঁটা শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাউডার বানিয়ে হালকা গরম পানিতে মেশালে চমৎকার রঙ হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ