বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অবশেষে মামলা নিলো পুলিশ

‘সেবাখাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবি। ৩০ আগস্ট প্রকাশিত জরিপের ফলাফলকে কেন্দ্র করে পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে। ৩১ আগস্ট প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘সেবা পেতে বছরে ঘুষ দিতে হয় ১০ হাজার কোটি টাকা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুষ ছাড়া কাজ হচ্ছে না কোথাও। বিভিন্ন ধরনের সেবা নাগরিকদের প্রয়োজন। এর অনেকগুলোই অধিকার। কিন্তু ঘুষ না দিলে তাও পাওয়া যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। অথচ সাধারণ মানুষকে তাদের কাছে যেতেই হবে। অবশ্য টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ঘুষ নেয় এ সময়ের অন্যতম আলোচিত সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের রেশ এখনো যায়নি। আন্দোলনের পর যানবাহনের জন্য বিভিন্ন ধরনের সনদ নিতে বিআরটিএতে ভিড় বাড়ছেই। আর এখন এই সংস্থায় কাজ পেতেই সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হচ্ছে।
এদিকে টিআইবির জরিপের ফলাফল প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, পুরো প্রতিবেদন না পড়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সঠিক নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ পুলিশ। বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) মাহবুব-এ রব্বানী বলেছেন, টিআইবি’র প্রতিবেদন না দেখে কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে গ্যাস খাতে দুর্নীতি নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, নিচের দিকে এখনো দুর্নীতি আছে। মূলত গ্যাস-সংকটের কারণেই এটা বেশি হচ্ছে। আর এটা থাকবে না।
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নের উত্তরে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, দুর্নীতিমুক্তভাবে বেঁচে থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার। তিনি আরো বলেন, বিচার ব্যবস্থাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না বা গ্রাহ্য করছে না। জামিন পেলেও মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিচ্ছে। এ সবের মূল কারণ দেশ পরিচালনার জন্য যে দায়িত্ববান ব্যক্তিরা আছেন, তারা দায়িত্ব পালন করছেন না। রাষ্ট্র সমস্যার সুরাহা করতে এগিয়ে আসছে না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সবাইকে ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির অংশীদার হতে বাধ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে যারা দুর্নীতি করছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। এমন অবস্থায় প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি তার কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসবে না?
দায়িত্ববানরা দায়িত্ব পালন করলে তো এমন খবর পড়তে হয় না। ‘ধর্মমন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে অবশেষে মামলা নিলো পুলিশ’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। ২ সেপ্টেম্বর তারিখে মুদ্রিত খবরে বলা হয়, ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের ছেলে মোহিত উর রহমান ওরফে শান্তর বিরুদ্ধে অবশেষে মামলা নিয়েছে পুলিশ।  ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগের সদস্য সাজ্জাদ আলম শেখ আজাদকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই মামলা হয়েছে। ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় নিহত সাজ্জাদের স্ত্রী দিলরুবা আক্তারের লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয় গত শুক্রবার ৩১ আগস্ট রাতে। উল্লেখ্য যে, মোহিত ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
খবরে বলা হয়, গত ৩১ জুলাই দুপুরে সাজ্জাদকে গুলী করে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২ আগস্ট নিহত ব্যক্তির স্ত্রী মামলা করতে লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় যান। লিখিত অভিযোগে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে মোহিতের নাম থাকায় পুলিশ মামলা নিচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন দিলরুবা। তিনি রিট আবেদন করলে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট মামলা নথিবদ্ধ করার জন্য ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার পুলিশকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পেয়ে শুক্রবার রাতে মামলা নেয় পুলিশ। থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম জানান, মামলায় মোহিত এবং ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল পাঠান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সন্তু বাবু, যুবলীগের কর্মী শেখ ফরিদ, ফরহাদ, সেলিমসহ মোট ২৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। তবে ১ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকাল পর্যন্ত কোন আসামীকে গ্রেফতার করা যায়নি। পুলিশ আসামীদের গ্রেফতারের জন্য কাজ শুরু করেছে বলে ওসি জানান। পুলিশ, দলীয় ও নিহত ব্যক্তির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ শহরের আকুয়া এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যুবলীগের স্থানীয় দুই পক্ষের বিরোধ আছে। এর জের ধরে ৩১ জুলাই সাজ্জাদ প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এ নিয়ে ২ আগস্ট শহরের কালীবাড়ি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা। সংবাদ সম্মেলনে সাজ্জাদের স্ত্রী দিলরুবা দাবি করেন, সাজ্জাদ এক সময় মোহিতের পক্ষে রাজনীতি করতেন। পরে তিনি পক্ষ ত্যাগ করলে মোহিত তার ওপর ক্ষিপ্ত হন। হত্যার সাত দিন আগে মোহিত মুঠোফোনে সাজ্জাদকে হত্যার হুমকি দেন। তার নির্দেশেই সাজ্জাদকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় বলে স্ত্রী অভিযোগ করেন।
খবরে মামলার কথা, অভিযোগের কথা জানা গেল। রায় পেতে সময় লাগবে। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে হত্যাকা-ের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে বলে আমরা আশা করতে চাই। তবে আলোচ্য ঘটনায় একটি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আসামী মন্ত্রীর পুত্র হলে কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতা হলে পুলিশ কি তার বিরুদ্ধে মামলা নিতে অক্ষম? আমরা দেখলাম হাইকোর্টের আদেশের পর পুলিশ মামলা নিলো। কিন্তু সাধারণ নাগরিক কিংবা বিরোধী দলের লোকদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে তো পুলিশকে বেশ তৎপর দেখা যায়। তখন তো আদালতের আদেশের প্রয়োজন হয় না। এটি কিন্তু সুশাসনের লক্ষণ নয়। এই দৈন্য কখন দূর হবে।
সুশাসন নেই বলেই এমন চিত্র আমাদের দেখতে হয়।
‘কয়েকশ’ স্পিন্টার শরীরে, চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে কিনা জানি না। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্তৃপক্ষের করণীয় আছে বলে আমরা মনে করি। ৩ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, একটু হাঁটলেই পা ফুলে যায় রাজিবুল ইসলামের। ঠিকমতো বসতেও পারেন না। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েকশ’ স্পিøন্টার। পরিবারের আশঙ্কা, সঠিক চিকিৎসা না পেলে ধীরে ধীরে হয়তো স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবেন তিনি। সরকারি চকরিতে কোটা সংস্কারের  দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করার সময় গত ৮ এপ্রিল রাতে পুলিশের ছোঁড়া শটগানের গুলিতে আহত হন তিনি। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেও ছেলেকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য পিতার নেই। রাজিবুলের পরিবার জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা সরকার কেউই তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। রাজিবুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।
রাজিবুল যেদিন আহত হন, সেদিন গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের আশিকুর রহমানও। গুলিতে তাঁর যকৃত ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনো তার শরীরের ভেতর রয়ে গেছে গুলিটি। এছাড়া পুলিশের ছোঁড়া শটগানের গুলিতে আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মো. শাহরিয়ার হোসেন। তাঁর পিঠে আটটি স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। এছাড়া পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত হন জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরেফিন। তার চোখে স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। এর বাইরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরিকুল ইসলাম ছাত্রলীগের হাতুড়ি ও লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হন। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক আন্দোলনের সময় তাদের বলেছিলেন, আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও একই আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা মনে করি আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ