রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নাসা সম্পর্কে চমকপ্রদ কিছু তথ্য!

জাফর ইকবাল: নাসার ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এই অক্টোবরেই। নাসার এই লোগোর জন্ম ১৯৫৯ তে। যেখানে ‘গ্রহ’ বোঝাতে আঁকা হয়েছে নীল গোলক। ‘তারা’র অর্থ মহাকাশ। ‘ঠ’ বলতে বোঝাচ্ছে বিমান চালানোর বিজ্ঞান আর ‘গোলাকার কক্ষপথ’ দিয়ে বোঝানো হচ্ছে মহাকাশ ভ্রমণ। বর্তমানে নাসা নিয়ে গবেষণার শেষ নেই।
ভ্রূণ জন্মাল। ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাক্ট’এ সই করলেন তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার। আনুষ্ঠানিকভাবে নাসার জন্ম হল তার আরো দু’মাস পর। অক্টোবরের ১ তারিখে। জন্ম হল মানবসভ্যতার আধুনিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের। ‘নাসা’র জন্মের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাশ হল এই বিল। বলা হল, ‘পৃথিবীর বায়ুম-লের ভেতর ও বাইরে বিমান চালনার সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে গবেষণার জন্য’ই গড়া হচ্ছে নাসা।
ভাবনাটা অনেক আগে থেকেই ছিল। মানুষ পাঠানো হবে চাঁদে। কিন্তু ধুম করে তো আর মানুষ পাঠিয়ে দেওয়া যায় না চাঁদে! তার পিঠটা (সারফেস) ঠিক কেমন, কতটা এবড়াখেবড়া, তা বুঝতে ১৯৬৪ সালে চাঁদে প্রথম একটি ‘ল্যান্ডার’ মহাকাশযান পাঠাল নাসা। এই সেই ‘ল্যান্ডার’ মহাকাশযান ‘রেঞ্জার-৭’।
এটাই প্রথম চাঁদের পিঠের ছবি। ১৯৬৪ সালে তুলেছিল নাসার ‘ল্যান্ডার’ মহাকাশযান ‘রেঞ্জার-৭’। চাঁদের মাটি ছোঁয়ার আগেই মার্কিন মহাকাশযানের পিঠে চেপে চাঁদের পিঠের মোট ৪ হাজার ৩১৬টি ছবি তুলেছিল ‘রেঞ্জার-৭’। সেই সব ছবি বিশ্লেষণ করে নাসা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল চাঁদের পিঠের কোন দিকটায় নামানো হবে মানুষ। কোন দিকে মানুষ নামালে বিপদের আশঙ্কা কম।
১৯৬৯ সাল। সেই প্রথম এই সৌরম-লে আমাদের প্রতিবেশী ‘লাল গ্রহ’ মঙ্গলের প্রায় কান ঘেঁষে চলে যায় কোনো মহাকাশযান। যার নাম, ‘মারিনার-৬’। ওই সময় খুব কাছ থেকে মঙ্গলের ২০টি ছবি তুলেছিল নাসার এই মহাকাশযান। ১৯৬৯-র ২৯ জুলাই। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার যে দিন (১৯৫৮) সই করেছিলেন ‘ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যাক্ট’-এ, ১৮ বছর পর সেই দিনেই চাঁদের মাটিতে প্রথম পা পড়ল মানুষের। নিল আর্মস্ট্রং, মাইক কলিন্সের সঙ্গে চাঁদে হাঁটলেন বাজ অলড্রিন। এখানে সেই অলড্রিনকেই দেখা যাচ্ছে।
১৯৭১। ‘অ্যাপোলো-১৫’ অভিযানে চাঁদের মাটিতে আবার নামল ‘ফ্যালকন’ মহাকাশযান। ৩ দিন ধরে ১৮ ঘণ্টা চাঁদের মাটিতে হাঁটলেন দুই মহাকাশচারী ডেভ স্কট ও জিম আরউইন। হ্যাডলি রিলে এলাকায় সেই প্রথম চাঁদের মাটিতে গাড়ি (‘মুন কার’) চালালেল মহাকাশচারীরা। সে এক ইতিহাস। এই যন্ত্রটিই প্রথম খবর দিয়েছিল, মঙ্গলে এখনও পানি রয়েছে। ২০০৮-এ। যন্ত্রটির নাম- ‘থার্মাল অ্যান্ড ইভলভড্-গ্যাস অ্যানালাইজার’ বা ‘টিইজিএ’। চাঁদ থেকে যে মাটি কুড়িয়েছিল যন্ত্রটি, তাতে তাপ দিতেই বেরিয়ে আসে জলীয় বাষ্প।
২০০৮ সালেই শনির চাঁদ ‘টাইটান’-এ প্রথম তরলে ভরা হ্রদের হদিশ পেয়েছিল নাসার মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি’। সেই তরল অবশ্য পানি নয়। ইথেনের মতো কিছু তরল হাইড্রোকার্বন। আজ থেকে ৪০০ বছর আগে, ১৬১০ সালে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে প্রথম শনি গ্রহের বলয় দেখতে পেরেছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই। তার ৩৬০ বছর পর, গত শতাব্দীর সাতের দশকের শেষাশেষি শনির সেই বলয়ের এই ছবি তুলেছিল নাসার ‘ভয়েজার’ মহাকাশযান।
মহাকাশ নিয়ে নাসার গবেষণার অন্ত নেই। এবার সূর্যের রহস্য ভেদের এক মিশন নিয়ে পার্কার সোলার প্রোব নামে একটি উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। নির্ধারিত সময়ের একদিন পর ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে নাসার নভোযানটি উৎক্ষেপণ করা হলো। এটি সূর্যের ৬০ লক্ষ কিলোমিটারের মধ্যে গিয়ে পৌঁছাবে এবং সূর্যের এত কাছাকাছি এর আগে কোনো যানই যেতে পারেনি। সূর্যের যে উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার অংশটি সূর্যগ্রহণের সময় দেখা যায় - যাকে বলে 'করোনা', এই যানটি তার ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে। বলা হচ্ছে, ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপ সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে প্রোবের।
সূর্যের চারদিকে উজ্জ্বল আভাযুক্ত যে এলাকা, যেটি 'করোনা' নামে পরিচিত, সরাসরি সেখানে গিয়ে ঢুকবে এই স্যাটেলাইট। তারপর সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে করতে বোঝার চেষ্টা করবে এই নক্ষত্রের আচরণ। সাত বছরে সূর্যের চারদিকে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করবে এই স্যাটেলাইট। সে সময় এটির গতি হবে ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬ লক্ষ ৭০ হাজার কিলোমিটার। ৬০ লাখ কিলোমিটার দূর থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকবে।
এই প্রকল্পের অন্যতম বিজ্ঞানী ড. নিকি ফক্স বলেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, ৬০ লাখ কিমি দূরত্বকে কখনই নিকট দূরত্ব বলে মনে হবে না, কিন্তু যদি ধরে নেয়া হয় ভূপৃষ্ঠ এবং সূর্যের দূরত্ব এক মিটার, তাহলে প্রোব সূর্য থেকে মাত্র ৪ সে. মি. দূরে থাকবে। প্রোব যে গতিতে চলবে তা নজিরবিহীন। ড. ফক্স বলছেন, ‘এত দ্রুতগতির কোনো কিছু আগে তৈরি হয়নি। সূর্যের চারদিকে এটি প্রতি ঘণ্টায় ৬৯০,০০০ কি. মি. পর্যন্ত গতিতে ঘুরবে। অর্থাৎ এই গতিতে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও যেতে লাগবে এক মিনিটেরও কম সময়।’
এখন থেকে ৬০ বছর আগে প্রথম সূর্যের কাছাকাছি নভোযান পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সূর্যের কাছে পাঠানোর জন্য যে ধরনের নভোযান তৈরির প্রয়োজন সেই প্রযুক্তি এতদিন পরে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন। সোলার-চালিত এই নভোযানের যন্ত্রপাতি থাকবে ৪.৫ ইঞ্চি পুরু কম্পোজিট কার্বনের আবরণ দিয়ে মোড়া। ফলে ভেতরের তাপমাত্রা সব সময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভেতরে থাকবে। রক্ষা পাবে ভেতরের যন্ত্রপাতি।
এদিকে চাঁদে পুনরায় অভিযানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে নাসা, সম্প্রতি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে নাসা’র জনসন স্পেস সেন্টারে কথা বলা সময় চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা জানিয়েছেন পেন্স। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়, নাসার এই অভিযানের লক্ষ্য চাঁদের কক্ষপথে ছোট একটি মহাকাশ কেন্দ্রে নভোচারী পাঠানো। ২০২৪ সালের শুরুর দিকেই এই মহাকাশ কেন্দ্রটি চালুর পরিকল্পা রয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির। ভবিষ্যতে চাঁদের কক্ষপথের এই মহাকাশ কেন্দ্র চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহে নভোচারী প্রেরণের জন্য ব্যবহার করা হবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পেন্স বলেন, যেহেতু আমাদের চোখ আবারও চাঁদের ওপর পড়েছে, এবার আমরা শুধু পদচিহ্ন রেখেই ফিরবো না বা কখনোই ফেলে আসবো না। পেন্স আরও নিশ্চিত করেছেন যে, এবার চাঁদের বুকে স্থায়ী অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অ্যাপোলো ১১ অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে পা রাখে মানুষ। অ্যাপোলো ১৭-এর পর চাঁদে আর কোনো মানব অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে সর্বশেষ চন্দ্রাভিযান অ্যাপোলো ১৭ পরিচালনা করা হয়। এর আগেও চাঁদের কক্ষপথে ছোট মহাকাশ কেন্দ্র স্থাপনের কথা জানিয়েছে নাসা। এবার বিষয়টি নিশ্চিত করলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
পেন্স বলেন, ২০২৪ সাল পেরোনোর আগেই চাঁদের কক্ষপথের প্ল্যাটফর্মে একজন মার্কিন নভোচারী পাঠাতে আমাদের প্রশাসন অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আগের বছর থেকেই মহাকাশ কেন্দ্রটির প্রোপালশন ব্যবস্থা তৈরি জন্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ শুরু করেছে নাসা। পুরো প্রকল্পটি শেষ করতে আরও ৫০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হবে বলে জানানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ