সোমবার ২৫ মে ২০২০
Online Edition

খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের কোনো  উদ্যোগই সফল হচ্ছে না

 

* ঋণ খেলাপির পেছনে ২৭টি সমস্যা চিহ্নিত

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: প্রতিবছরই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। সরকার পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বার বার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ ব্যাংকও খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগই সফল হচ্ছে না। ঋণখেলাপিদের দমনে সরকার, আইন, প্রশাসন সবই যেন কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। ব্যাংকের ডকুমেন্টেশন, তদারকি ব্যবস্থা সবই যেন ব্যর্থ আস্ফালন। কোনো উদ্যোগেই কমছে না খেলাপি ঋণের পরিমাণ বরং বেড়েই চলেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঋণ খেলাপিরা যেন খেলাপি হতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কিছুতেই খেলাপি ঋণের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় ঋণ খেলাপি হওয়ার পেছনে ২৭টি সমস্যা চিহ্নিত করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। বড় ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি বেশকিছু সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। চিহ্নিত সমস্যার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে সতর্কতার সাথে ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। 

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে চেক গ্রহণ করার বিরুদ্ধে অনেকেই খুব সোচ্চার। তাছাড়া ‘দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, ২০১৮’ (সংশোধিত)-এর খসড়ায় প্রচলিত আইনের ১৩৮ ধারা সংশোধন করে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে কোনো ব্যাংক চেক না রাখার বিধানসহ জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ থেকে কমিয়ে দ্বিগুণ এবং কারাদন্ডের মেয়াদ এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংশোধনী কার্যকর হলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে কঠিন ও বাধাগ্রস্ত করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলোয় জালিয়াতির মাধ্যমে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, সেগুলোই এখন খেলাপি হয়েছে। এসব জালিয়াতির সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে তারা যেসব সম্পদ অর্জন করেছেন, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করাসহ দ্রুত তাদের জেলে পাঠানো গেলে নতুন জালিয়াতি করতে অন্য কর্মকর্তারা ভয় পাবেন। জনগণের স্বার্থে চিহ্নিত প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টির খেলাপি ঋণ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে সরকারি খাতের ৮টি ব্যাংকের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি ৭টি ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ এই সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। এছাড়া বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের মধ্যে ১৫টি এবং বিদেশি ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ১টির খেলাপি ঋণ হাজার কোটি টাকার ওপরে রয়েছে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৩ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৮৩.৫ শতাংশ। অন্যদিকে বাকি ৩৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের সাড়ে ১৬ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর সঙ্গে অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ যুক্ত করা হলে খেলাপির পরিমাণ ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের বড় অভাব রয়েছে। এ কারণে জাল-জালিয়াতির প্রবণতা বেড়ে গেছে। যারা জালিয়াতি করছে, তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালাগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। এর সার্বিক প্রভাব পড়েছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া টাকা আদায় না হওয়ায় সেগুলো এখন খেলাপি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেশি আছে, তাদের ব্যাপারে বিশেষ মনিটরিং করা হচ্ছে। আদায় বাড়িয়ে খেলাপি ঋণের হার কমাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেসব তথ্য এসেছে তাতে আদায়ের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বদা ব্যবসাবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়নে বদ্ধপরিকর। সম্পদের সুষম ব্যবহার ও অপচয় রোধের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। একইসাথে প্রত্যেক ব্যাংককে তাদের খেলাপি ঋণের হার কমাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা। পাহাড়সম খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত আর্থিক খাত। খেলাপি হওয়ার পেছনে ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়াতেই গলদ দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অসৎ ঋণগ্রহীতারা একই জমি বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত রেখে ঋণ নেয়ার ঘটনা ঘটছে। অর্থ মন্ত্রণালয়  এ রকম ২৭টি সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। যার সবই ব্যাংকের ঋণ প্রস্তাব মূল্যায়ন, ঋণ প্রদান, খেলাপি ঋণ আদায়, কর্মচারী নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি এবং পর্ষদ সদস্যের নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ব্যাংকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাংকের এমডিদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, দক্ষ জনবল নিয়োগ, সামাজিক কর্মসূচির আওতায় দেওয়া সেবার বিনিময়ে ব্যাংকগুলোর জন্য মাশুলের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিধি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ- এই তিন মেয়াদি পরিকল্পনা করে এসব সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণের জালিয়াতি রোধে তথ্যকোষ গঠন, বড় ঋণ খেলাপির তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ, মামলা নিষ্পত্তিতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ ও বড় ঋণ খেলাপি তদারকির জন্য সেল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এসব সুপারিশ বাস্তাবায়ন করাটা সময় সাপেক্ষ এবং কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে আরো বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে একজন শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ঋণ দেয়ার সময় গ্রাহকের প্রেশারটা বেশি থাকে, ঋণ পাওয়ার জন্য। স্বাভাবিকভাবে যখন ঋণটা আদায় হয় না তখন মামলায় যেতে হয়। মামলায় গেলে কিন্তু বিষয়টা আর সীমাবদ্ধ থাকে না তখন নানা প্রতিষ্ঠান থেকে জড়িত হয়। ফলে নানা কারণেই ঋণ আদায়টা স্লো হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছরই ক্রমপুঞ্জীভূতভাবে তাদের এই খেলাপি ঋণটা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করাটাই একটা বড় সমস্যা।

এদিকে দেশে ঋণ খেলাপি সৃষ্টির পিছনে বরাবর ব্যাংক ও ব্যাংকাররা দায়ী বলে মন্তব্য করে আসছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ব্যাংকারদের ধারণা সৃষ্টি হয়, ব্যাটাকে (গ্রাহক) যে করেই হোক ডিফলটার বানাতেই হবে। তাই গ্রাহকদের ঋণখেলাপি বানাতে ব্যাংক এবং ব্যাংকাররাই বেশি দায়ী। একজন গ্রাহক প্রথমে যখন ঋণ নিতে আসেন তখনই তাকে নিজের কব্জায় আনতে খেলাপি করানোর চিন্তা করেন ব্যাংকাররা। আমাদের দেশের ব্যাংক খাতের জন্য এটি খুবই খারাপ সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে মেনে চলা উচিত। সেটি হলো গ্রাহককে জানা (কেওয়াইসি)। গ্রাহককে চেনা। এটি মেনে চললেই অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ