মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজশাহী অঞ্চলে বহুবিধ সংকটে আমন আবাদ ॥ দিশেহারা কৃষক  

রাজশাহী : বৃষ্টির পানির অভাবে এগুচ্ছে না রাজশাহী অঞ্চলের আমন আবাদ। গোদাগাড়ীর চব্বিশ নগরে মাঠে ব্যস্ত কৃষক -ছবি : সোহরাব হোসেন সৌরভ

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : রাজশাহী অঞ্চলে একদিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানির অভাব, অন্যদিকে শুরুতেই পোকার আক্রমণসহ এবারের আমন ধানের আবাদে বহুবিধ সংকট চলছে। পোকার আক্রমণ ঠেকাতে কীটনাশকও কাজে দিচ্ছে না বলে জানা গেছে। এই সঙ্গে চলছে শ্রমিকের সংকটও। ফলে একপ্রকার দিশেহারা অবস্থা চলছে কৃষকদের।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে। যে কারণে বৃষ্টি ঝরেছে দেরিতে। বর্ষার ঋতু আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণের শেষেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির দেখা মিলছে না। গত কয়েকদিনের কিছু পরিমাণ বৃষ্টিপাতকে ভরসা করেই আমন ধান রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তবে শ্রমিক সংকটে পড়েছেন তারা। মওসুমের শুরুতেই খানিকটা খরায় পুড়েছে রাজশাহীর আমনের মাঠ। এতদিন কোন কোন চাষি পুকুর বা খালের পানি ও গভীর নলকূপের পানি সেচ দিয়ে কোন রকম চারা রোপণ করেছেন। কিন্তু প্রধানত বৃষ্টিনির্ভর এই ফসল আবাদের জন্য কৃষকরা অপেক্ষা করছিলেন ভরা মওসুমের। শ্রাবণের শেষে এসে কিছুটা বৃষ্টির দেখা পাওয়ায় আমন চারা রোপণের হিড়িক চলছে। চাপ পড়েছে মাঠে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে রাজশাহী, নঁওগা, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন চাষাবাদ হবে সাড়ে ৩ লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে। এর জন্য জেলায় এবার বীজতলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৭ হেক্টর জমিতে। এবারে দেরিতে হলেও আমন চারা রোপণে চরম ব্যস্ততায় দিন কাটছে চাষিদের। তবে শ্রমিক সংকটে পড়েছেন তারা। হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় এবং চারা রোপণের সময় পার হতে থাকায় একসাথে চাপ পড়েছে। সরোজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কোন জমিতে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর দিয়ে কিংবা সনাতন পদ্ধতিতে মাটি চাষ এবং জাবাড়ের কাজ চলছে। কেউ বা বীজতলা থেকে আমন চারা তুলছেন। আবার কোন কোন ক্ষেতে শ্রমিকরা আমন চারা রোপণ করছে। পবা উপজেলার তেঘর গ্রামের একজন কৃষক জানান, চলতি মওসুমে তিনি ২ বিঘা জমিতে আমন চাষাবাদ করছেন। বীজতলাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে রোপণ করতে দেরি হচ্ছে। মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি গ্রামের এক কৃষক জানান, বৃষ্টি পেয়ে একসাথে ধানের চারা রোপণের হিড়িক পড়েছে। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে শ্রমিকের। এ সুযোগে শ্রমিকেরা বেশি টাকা দাবি করছেন। সময়ের মধ্যে ধান লাগানোর জন্য অনেকেই বেশি টাকা দিয়েই চারা রোপন করছেন।

পোকার আক্রমণ : এদিকে আমনের চারা রোপণের শুরুতেই পোকার আক্রমণ দেখা বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে। আমনে প্রথম সার প্রয়োগ করতে না করতেই ক্ষেতের রোপণকৃত ধান কেটে সাবার করে দিচ্ছে মাজড়া পোকা। এর ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। অগ্রিম পোকা লাগার কারণ হিসাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং স্বর্ণা জাতের ধানকে দায়ী করেছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা। সে সাথে আমনের পোকা দমনে কৃষকদের সচেতন করতে নানামুখি পরামর্শ দিয়ে মাঠে কৃষকের সাথে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে দাবি করে কৃষি বিভাগ। আর কৃষকেরা বলছেন, চলতি বছর আমনের শুরুতেই মাজরাসহ যে নানা ব্যাধি দেখা দিয়েছে তা গত ২০ বছরেও তারা দেখেনি। বাজারে অনেক রকম কীটনাশক প্রয়োগ করে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই শেষ পর্যন্ত এবছর পোকা আক্রমণে কষ্টের ধান ঘরে তুলতে পারবেন কি না- তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। গত বছরের আমন আবাদের মাঝামাঝি সময়ে এসে পাতামরা রোগ ও কারেন্ট পোকার আক্রমণের কারণে ধানে ফলন কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হয় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের। সেই লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই চলতি মওসুমেও আমন চাষে মাঠে নেমে পড়েন কৃষকরা। এমনিতেই আমনের প্রস্তুতির শুরুতেই বৃষ্টির অভাবে হোচট খেয়েছেন তারা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা শুগনা গ্রামের একজন কৃষক জানান, তিনি এবার ২৫ বিঘা জমিতে স্বর্ণা জাতের ধান চাষাবাদ করেছেন। ধান রোপণের ২৫ দিনের মাথায় তার প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে মাজরা পোকা (ব্যালকাঠি) কেটে সাবাড় করে ফেলেছে। বিভিন্ন রকম কীটনাশক ব্যবহার করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় তিনি আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তানোর উপজেলার দিঘি পাড়ার এক কৃষক জানান, গত বছর আমন আবাদে পাতা মরা রোগ ও কারেন্ট পোকার আক্রমণে ধানের ফলন অনেক কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হয়। তবুও গত বছরের লোকসান মাথায় নিয়ে এবার ১৫ বিঘা জমিতে আমন চাষাবাদ করেছেন তিনি। সবেমাত্র আমন রোপণ করে উঠেছেন তিনি। এরই মধ্যে তার ৫ বিঘা জমিতে মাজরা পোকা লেগেছে। ক্ষেতের ধান কেটে সাদা করে ফেলেছে। একজন কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর আবহাওয়ার বিরূপ আচরণ ও এলাকায় স্বর্ণা জাতের ধান বেশি আবাদ হওয়ায় মাজরা পোকাসহ নানা রোগের প্রভাব বাড়ছে। এখনো অনেক সময় আছে ঠিকমত কীটনাশক প্রয়োগ করলেই রোগ সেরে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে স্বর্ণা জাতের ধানে বেশি এ রোগ আক্রমণ করে। তাই স্বর্ণা জাতের ধান বাদ দিয়ে অন্য কোন জাতের ধান চাষাবাদ করলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে জানান এ কৃষি কর্মকর্তা। তিনি আরো জানান, আমনে পোকা দমনে কৃষকদের সচেতন করতে নানামুখি পরামর্শ দিয়ে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, লিফলেট বিতারণ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ