বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দা-বটি-চাকু-কুড়াল তৈরিতে ব্যস্ত কামার 

কামাল উদ্দিন সুমন: আগুনে পোড়ানো লাল টুকটুকে লোহা। সেই লোহা পেটানোর কর্কশ শব্দ, পোড়া গন্ধ, পোড়া লোহা থেকে বিচ্ছুরিত আগুনের স্ফুলিঙ্গ। যেন দম ফেলানোর সময় নেই। এ ব্যস্ততা লৌহজাত পণ্য তৈরির কারিগর (কামার) সুবল চন্দ্রের। রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় নিজের দোকানে কথা হলে তিনি জানান, সামনে কুরবানির ঈদ, তাই দা, বটি, চাকু, কুড়ালসহ অন্যান্য লোহার সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত তারা। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে তাদের ব্যস্ততা বাড়ছে।

সুবল চন্দ্রের সাথে আরেক কারিগর চন্দন জানালেন, কুরবানিকে কেন্দ্র করে বেশি অর্ডার আসছে চাপাতি, দা, বঁটি, ছুরি, কুড়ালসহ পশু কুরবানি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির। বছরের এ সময়টা তাদের ব্যবসার মওসুম। তাই কাজের কারণে দম ফেলানোর সময় নেই।

 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহা আসতে এক সপ্তাহ বেশী বাকি। এরই মধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে কামারদের। জমে উঠেছে দা-বটির বাজার। যাত্রাবাড়ি, কারওয়ান বাজার, খিলগাঁও, কচুক্ষেত, শান্তিনগর, মিরপুর ও গাবতলীসহ বিভিন্ন কামারপট্টির কারিগররা এজন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন। 

ঈদে কুরবানির পশু জবাই করার চাহিদার কথা মাথায় রেখে দা, চাকু, কুড়ালসহ লোহার সরঞ্জাম তৈরিতে দিন রাত ২৪ ঘন্টা ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। 

বছরে একবার কুরবানির ঈদ এলে লোহার সরঞ্জামের চাহিদা বেশি থাকায় এক মাসেই সারা বছরের উপার্জন করে নিতে চান তাঁরা। ঈদের পুরো আমেজ এখন তাদের মাঝে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ কাজের মাঝে কোন কষ্ট দেখা যায়নি তাদের মাঝে। ঈদের বাজার খুব ভালো যাওয়ার আশা করেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের বরাদ্দকৃত ১২টি দোকানসহ ৩৭টি দোকান রয়েছে কারওরান বাজারের কামারপট্টিতে। অধিকাংশ দোকানেই নিজেদের তৈরি যন্ত্রপাতি বিক্রি করা হয়। তবে কিছু মওসুমি ব্যবসায়ীও রয়েছেন, যাঁরা শুধু ঈদ সামনে রেখে এই ব্যবসা করে থাকেন। অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদুল আজহার সময় কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায় কামারপট্টিতে। কারণ ঈদুল আজহার সময় পশু কুরবানিকে কেন্দ্র করে প্রচুর পরিমাণ দা, চাকু, বটি আর চাপাতির জোগান দিতে হয় এই কর্মকারদের।

সন্তোষ কর্মকার জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে এই লোহার যন্ত্রপাতি তৈরি করছেন। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। পূর্বপুরুষের পেশা হিসেবে তিনিও যুক্ত হন এই পেশায়। প্রতিদিন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয়। তবে আমাদের মূল টার্গেট থাকে কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। পশু বেচাকেনা এখনও শুরু না হলেও প্রচুর পরিমাণে লোহার সরঞ্জাম তৈরির অর্ডার আসা শুরু হয়েছে।

প্রবীণ কর্মকার তাপস জানান, ‘কুরবানিকে কেন্দ্র করে বেশি অর্ডার আসছে চাপাতি, দা, বটি, ছুরি, কুড়ালসহ পশু কুরবানি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির। তিনি বলেন, কাজের চাপ বেশি থাকলেও যন্ত্র তৈরির জ্বালানি কয়লার দামও বাড়তি। এক বস্তা কয়লার দাম এক হাজার ৫০০ টাকা। যা একদিনেই শেষ হয়ে যায়।

কামারপট্টির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নয়াবাজার, ধোলাইখাল থেকে লোহার যন্ত্রপাতির কাঁচামাল ক্রয় করতে হয়। প্রতি কেজি মূল্য ৯০ থেকে ১০০ টাকা। আর এক কেজি লোহা থেকে তৈরি একটি দা বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কামারপট্টির কারিগরদের অভিযোগ, কারওয়ান বাজারে সিটি করপোরেশনের ১২টি বরাদ্দকৃত দোকান থাকলেও অনেক অবৈধ দোকান গড়ে উঠেছে। যাদের কোনো লাইসেন্স নেই। ক্ষমতাবলে দোকান গড়েছেন তাঁরা। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে। 

কারিগর সিরাজ জানায়, এই পেশায় (কামার) পরিশ্রমের চেয়ে বেতন কম। সারাদিন আগুনের পাশে বসে কাজ করতে হয়। দিন-রাত সারাক্ষণ আগুনের পাশেই কাটাতে হয়। এই পেশা ছাড়ছেন না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। অন্য কাজ শিখিনি। তাই এই পেশা ছাড়ার উপায় নাই।’

খিলগাঁও থেকে সোলেমান হাওলাদার এসেছেন দা-চাকু তৈরির অর্ডার দিতে। চাকু তৈরির কাঁচামাল অর্থাৎ লোহা নিয়ে এসেছেন তিনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি চাকু তৈরিতে কারিগররা ৭০০ টাকা মজুরি চাচ্ছেন। সামনে ঈদ, তাই তাঁরা এত বেশি মজুরি হাঁকাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ