বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কেন্দ্রের বাইরে কঠোর নিরাপত্তা ভেতরে নৌকায় প্রকাশ্যে সিল

ইবরাহীম খলিল/গাযী খলিলুর রহমান, টঙ্গি থেকে : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রগুলোর বাইরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা থাকায় কোন রকমের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। তবে ভোট কেন্দ্রের ভিতরে বিএনপির নেতাকর্মীদের থাকতে না দেওয়ায় প্রকাশ্যে সিল মারতে পেরেছে নৌকা মার্কার সমর্থকরা। গতকাল গাজীপুর সিটি নির্বাচনে টঙ্গি এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে। সকাল বেলায় বিভিন্ন মার্কায় ভোট দিতে পারলেও দুপুর হতেই নৌকা মার্কা ছাড়া অন্যদের ভোট কেন্দ্রে অবস্থান অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল পড়লেও দেখার কেউ ছিল না। কোন কোন কেন্দ্রে দেখা গেছে বহিরাগতদের অবস্থানও।
গতকাল সকাল ৮টায় ভোট শুরু হলে গাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ভোট কক্ষে বিএনপির কোন এজেন্ট নাই। দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার রেজাউর রহমান জানান, বেশির ভাগ এজেন্ট এসেছেন। বাকীরা আসছেন। এই কেন্দ্রে সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখে ৪৯/৫০/৫১ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী সুফিয়া কাদের অভিযোগ করেন এই ভোট কেন্দ্রে সোমবার রাতেই সিল মেরে রাখা হয়েছে। সেইসাথে কাউন্সিলরের এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এর আধ ঘন্টা পর টিডিএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলে সেখানে কাউন্সিলর প্রার্থী মজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জানান, সকাল বেলায় শুরুটা শান্তিপূর্ণ হয়েছে কিন্তু শেষতো হবে না। দুপুর বারোটার পর জানা যায়, সেই কেন্দ্রে আর বিএনপির এজেন্ট নাই। তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে।
 বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বাইরে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা থাকলেও ভিতরে একতরফা নৌকায় সিল মারা হয়েছে। এজন্য ভোটারদের আর ভোট দিতে হয়নি। এছাড়া ভোটের আগের রাতে বিএনপির এজেন্টদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গ্রেফতারের অভিযোগ করে বিএনপি নেতারা।
সকাল পৌনে নয়টার দিকে টঙ্গী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসা কেন্দ্রে গিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারকে পাওয়া যায়নি। টঙ্গি থানা ছাত্রদল সভাপতি কামরুজ্জামান বিপ্লব এবং শ্রমিক নেতা কছিম উদ্দিন জানান, সকাল বেলার শুরুটা ভাল হলেও দুপুর হলেই বোঝা যাবে কতটুকু ভাল ভোট হয়েছে। তাদের মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় কিছুক্ষণ পরই। দুপুর বারোটার পর বিএনপির কোনে এজেন্টকে ভোট কেন্দ্রে থাকতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতংক থাকায় অনেকেই ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেননি। এ কারণে ভোটারদের উপস্থিতিও কমতে থাকে। দুপুরের পর আর কাউকেই দেখা যায়নি।
কাউন্সিলর আব্দুল মোমেন বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার দত্তপাড়া, নবদিগন্ত এবং অথনীটির কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। কাউন্সিল শফিউদ্দিন শফি বলেন, এখানে কোনরকম সমস্যা হবে না। কিন্তু দুপুরের পর আর সে কথা ঠিক থাকেনি। খবর আসে কেন্দ্রে বিএনপির কোন লোক নেই। বাইরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আর ভেতরে কেবল নৌকার সমর্থকরা। তবে এই কথা স্বীকার করেননি প্রিসাইডিং অফিসার হারুন অর রশিদ। তিনি জানান, কোনরকম সমস্যা ছাড়াই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময় সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের জন্য সাংবাদিকদের সহায়তা কামনা করেন তিনি।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খবর আসে আওয়ামী লীগের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি আবদুল জলিল জাগরণি কেন্দ্রে ত্রাসের সৃষ্টি করে। সেখান থেকে বিএনপির এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের বের করে দেওয়া হয়। এরপর সেই কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমে আসে। সেই সুযোগে কেন্দ্রের ভেতর নৌকার সমর্থকরা ইচ্ছে মত সিল মেরেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর কিছুক্ষণ পর সাতাইশ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে বিএনপির এজেন্ট পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে প্রিজাইডিং অফিসার শাহ আলম বলেন, সব এজেন্ট আছে। সেখানে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
অন্যান্য কেন্দ্রে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি না দেখা গেলেও খালবিলে ঘেরা গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় মানুষের ভিড়। সকাল পৌনে দশটার দিকে গিয়ে দেখা যায় বাঁশের সাঁকো পার হয়ে দলে দলে মানুষ আসছে ভোট কেন্দ্রে। প্রিসাইডিং অফিসার আবদুল কাইয়ুম জানান, ২৮০০ ভোটের মধ্যে সকাল দশটার মধ্যে ৫ শতাধিক ভোট কাস্ট হয়ে গেছে। তবে লাইনের পেছন থেকে কয়েকজন যুবককে দেখা গেল সবাইকে বলে দিচ্ছে মেয়র পদে কেবল নৌকায় ভোট দিতে। এর বাইরে কেউ কোন তৎপরতা দেখালে তাকে সরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, ৮০ বছরের বৃদ্ধাকে নিয়ে আসে এক যুবক। তাকে ভোট কেন্দ্রের ভেতর যেতে দেয়নি কয়েকজন যুবক। তাদের কথামত বৃদ্ধার নাতিকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ।
 বেলা সোয়া ১১টার দিকে গাজীপুর-২ সংসদীয় আসনের এমপি জাহিদ আহসান রাসেলের বাড়ি সংলগ্ন ভোট কেন্দ্র নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় মানুষের ঝগড়া। সেখানে বহিরাগতরা এসে সিল মারার ঘটনায় উত্তেজনা দেখা দেয়। সেখানে বিএনপির এজেন্ট না থাকার কারণ নিয়ে কেউ কোন কথা বলতে রাজি হননি। পাওয়া যায়নি প্রিসাইডিং অফিসারকেও। দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান প্রিসাইডিং অফিসার এখন দৌড়ের ওপর আছে। পুলিশের একজন ইন্সপেক্টরের কাছে বিএনপির এজেন্টের বিষয়ে জানতে চাইলে  বলেন, কার এজেন্ট আছে কার এজেন্ট নাই সেই দায়িত্ব আমাদের না। আমার দায়িত্ব হলো- অভ্যন্তরের আইন-শৃঙ্খলার কোন অবনতি হচ্ছে কি না তা দেখা।
১১টা ৪১ মিনিটে এই প্রতিবেদক যান হাজী কছিম উদ্দিন কামাল কলেজ কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে সুনসান নীরবতা দেখা যায়। ভোটার না থাকায় কর্মকর্তাদের আরাম আয়েশ করতে দেখা যায়। দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার মাহমুদুল হাসান জানান, ভোট গ্রহণের প্রথম ঘন্টায় আড়াইশ এবং দ্বিতীয় ঘন্টায় ৫ শতাধিক ভোট কাষ্ট হয়েছে। তবে তিনি তার দায়িত্ব পালন নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এইসব দায়িত্ব থেকে যদি বাঁচা যেত !  এরপর সাফাউরি মাদরাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা হয় কাউন্সিলর প্রার্থী আতাউর রহমানের সাথে। তিনি অভিযোগ করেন, এই কেন্দ্রে বিএনপির কোন এজেন্ট নাই। বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহাড়া থাকলেও ভেতরে আওয়ামী লীগের লোকজন ফ্রিভাবে সিল মেরেছে।
বেলা ১২টা বাজতেই খবর আসে একযোগে দুই থেকে আড়াইশ কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিকাল পর্যন্ত একতরফা বিএনপিবিহীন ভোট কেন্দ্রে ইচ্ছেমত ভোট দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির।
নাম না প্রকাশের শর্তে একজন পর্যবেক্ষক এই প্রতিবেদককে জানান, বেলা আড়াইটার দিকে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাখাওয়ারি কেন্দ্রে নৌকার একজন সমর্থক জয়বাংলার স্লোগান দিয়ে কেন্দ্রের ভেতর প্রবেশ করে সহিংসতা তৈরি করে। সেখানেও নৌকা মার্কায় প্রকাশ্যে সিল মারা হয়। তিনি জানতে পেরেছেন আশপাশের কেন্দ্রগুলোতেও একইভাবে প্রকাশ্যে সিল মারা হয়েছে। এ কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকে ছিল না কোন এজেন্ট। এমনকি ভোট গণনার সময়ও কোন বিএনপির এজেন্ট দেখতে পাননি তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ