সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

দাদাম্যাচ ফ্যাক্টরী চালু করতে মামলায় বাধা

খুলনা অফিস: সাড়ে আট বছরেও ভাগ্য বদলায়নি ঐতিহ্যবাহী দাদাম্যাচ ফ্যাক্টরীর। এর সাড়ে সাতশ’ শ্রমিক আজ অন্য পেশায় গিয়ে কোনরকমে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করায় তাদের পরিবারের সদস্যদের দিন চলছে অর্ধাহারে-অনাহারে। অনেকের সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। দাদা ম্যাচ আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী কিছু শ্রমিকের বাসায় নেই পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগও। অনেকটা অসহায় অবস্থায়ই তারা সেখানে অতি কষ্টে দিনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। মিলটির সিবিএ’র মরহুম সভাপতির একমাত্র সন্তান পড়াশুনা বাদ দিয়ে একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাকে নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। সরকারের বিরুদ্ধে ভাইয়া গ্রুপের দায়েরকৃত মামলার কারণে মিলটি পুন:চালু হচ্ছে না। আবার ভাইয়া গ্রুপের নেয়া সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার দেনার দায়ও নিতে চাচ্ছে না কেউ। পক্ষান্তরে অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায়ই পড়ে আছে মিলটি। প্রতিনিয়তই চুরি হচ্ছে মিলের যন্ত্রাংশ। মেইন গেটে বসে থাকা পুলিশ ও কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ডের পক্ষেও পুরো মিলটি পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ঝোঁপ-জঙ্গলে পরিণত হয়ে মিলটি অনেকটা সাপের খামারেও পরিণত হয়েছে। মিলটি চালুর ক্ষেত্রে মামলাই এখন প্রধান বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে খুলনার এক সময়ের পূর্ণ যৌবনা এ মিলটি আজ অনেকটা মৃত। মামলা নিষ্পত্তিসহ মালিক পক্ষের সাথে দেনার জটিলতা মিটিয়ে মিলটি দ্রুত চালু অথবা সেখানে আইটি ভিলেজসহ অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠান করার দাবি খুলনাবাসীর। দাদাম্যাচের বেকার শ্রমিকরা জানান, বন্ধের পর জেলা প্রশাসক মিলটির সম্পত্তি বুঝে নেয়ার পর থেকে প্রতি বছর ঈদ-পার্বনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে কিছু সহযোগিতা দেয়া হলেও এ বছর কোন সহযোগিতাও তারা পাননি।  দাদাম্যাচ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম শাহাদাৎ বলেন, মিলটি বন্ধের সময় শ্রমিকদের আট কোটি টাকা পাওনা ছিল। যা এখনও দেয়া হয়নি। এখন বেকার শ্রমিকদের একমাত্র চাওয়া মিলটি চালু হোক আর না হোক সেটি নয়, বরং তাদের পাওনা পরিশোধই মূল দাবি। তাছাড়া শ্রমিক কলোনীতে প্রায় ৮০টি পরিবার বসবাস করছে। তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হলেও অন্তত কোনরকমে তারা সেখানে বসবাস করতে পারতেন। তা না হলে সন্ধ্যার পর সেখানে ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় মাদকাসক্তদের আড্ডাও হয়। যা শ্রমিক পরিবারগুলোর জন্য বিরক্তিকর ও নিরাপত্তাহীনও বটে।
তবে মিলটি জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয় ২০১১ সালের ২৩ মার্চ থেকে। সে অর্থে জেলা প্রশাসকই এখন মিলটির প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। খুলনার জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, সর্বশেষ মিলটির ব্যাপারে তার কাছে কোন তথ্য নেই। মিলটি পুন:চালু হবে না অন্য কোন প্রতিষ্ঠান করা হবে সে ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলতে হবে। মিলটি চালুর ব্যাপারে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান বলেন, মিলটি চালুর ব্যাপারেতো সরকার বেশ তৎপর। কিন্তু সাবেক মালিক ভাইয়া গ্রুপের দায়েরকৃত মামলায় হাইকোর্ট স্থিতিতাবস্থা বজায় রাখায় এখন কিছুই করা যাচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তি না হলে সরকারও যেমন কিছু করতে পারছে না আবার ভাইয়া গ্রুপও কিছু করতে পারছে না। এটি এখন একটা জটিল আকার ধারণ করেছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ভাইয়া গ্রুপের নেয়া সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার ঋণের বোঝা কে নেবে সেটি নিয়েই এখন মূলত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তারা এতোদিন মিলটি চালিয়েছে তাদের ঋণের দায়ভার সরকার কেন নেবে সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তার পরেও সরকার মিলটি চালুর ব্যাপারে আন্তরিক। তার পক্ষ থেকেও শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট জায়গায় আলোচনা করে যতদূর করা সম্ভব তা করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, দাদাম্যাচসহ খুলনার সব বন্ধ মিল চালু করা জরুরি। যেটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরও প্রতিশ্রুতি। সুতরাং আগামী জাতীয় বাজেটের আগেই খুলনার এসব বন্ধ মিল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। নগরীর রূপসা ষ্ট্র্যান্ড রোডস্থ দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরীর উৎপাদন ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বন্ধ হলেও ওই বছর ১৮ আগষ্ট থেকে মালিক পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বন্ধ ঘোষণা করে। ফ্যাক্টরিটি বন্ধের ফলে এখানে কর্মরত সাড়ে সাতশ’ শ্রমিকের পাশাপাশি এর সাথে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েক হাজার লোক বেকার হয়ে পড়ে। মিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের প্রায় ৯ মাসের মাথায় (২০১১ সালের ৫ মার্চ) খুলনা এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্য জনসভায় এ মিলটি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রতিশ্রুতির পর ওই বছরই ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মো. নজরুল ইসলাম খান শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে পত্র দেন। ওই পত্রে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ওই পত্র প্রাপ্তির পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. মিজানুর রহমান একই বছর ২১ মার্চ এক অফিস আদেশে দাদা ম্যাচের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের পক্ষে ইনভেন্টরী করতঃ খুলনার জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অনুরোধ জানান। খুলনার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই বছর ২৩ মার্চ মিলটির প্রধান কার্যালয় সীল করার মাধ্যমে সকল সম্পত্তি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবরের ৩৩০ নম্বর স্মারকের এক পত্রে বলা হয়, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিটি বিসিআইসি’র নিজস্ব তহবিল থেকে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু মালিক পক্ষের ২৬৩ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ ও পরিচালনা বোর্ড ভেঙ্গে দেয়ার বিষয়টিকে সামনে এনে বিসিআইসি এটি চালুর ক্ষেত্রে বাধ সাধে। এ নিয়ে দেন-দরবার চলার পর ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারী শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকেই ফ্যাক্টরীর পরিচালনা বোর্ড ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে বোর্ড গঠন ও মালিক পক্ষের নেয়া ব্যাংক ঋণের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শিল্প মন্ত্রণালয়ে পুনরায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে মিলটি চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। আর এর আগের বৈঠকে বিসিআইসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৫ কোটি টাকা দেয়ার কথা জানানো হয়। এই মোট ২৫ কোটি টাকা দিয়ে মিলটি বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণে খুব শীঘ্রই চালানো হবে এমন সিদ্ধান্তও হলেও প্রায় সাড়ে সাত বছরেও ‘শীঘ্রই’ কথাটির কার্যকারিতা হয়নি। উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে রূপসা ষ্ট্যান্ড রোডের ১৮ একর জমির ওপর স্থাপিত হয় এ ম্যাচ ফ্যাক্টরীটি। ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণের পর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ বা বিসিআইসি মিলটি চালিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। কিন্তু ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকার মিলটির সিংহভাগ সুইডিসের একটি কোম্পানীর কাছে হস্তান্তর করে। তখন বিসিআইসি’র মালিকানায় ছিল ৩০%, সুইডিস সরকারের মালিকানায় ছিল ১০% এবং বাকী ৬০% ছিল ঐ কোম্পানীর মালিকানাধীন। এভাবে চলে আসার পর ১৯৯২ সালে সুইডিস কোম্পানী মিলটি চালাতে অপারগতা প্রকাশ করায় ভাইয়া গ্রুপ আচমকা মিলের মালিক হয়ে যায়। ঐ সময় মিলটি চালুর সাথে সাথেই শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। তাছাড়া শ্রমিকদের গচ্ছিত প্রায় আড়াই কোটি পিএফ’র টাকাও খরচ করে মালিক পক্ষ। তার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে আসছে মিলটি। শেষ পর্যন্ত আর্থিক অভাবে মিলটির উৎপাদন বন্ধ হয় ২০১০ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ