মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য

অরণ্য আলভী তন্ময় : বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে থাকে চার বছর পর পর। সারাবিশ্বে এই খেলাটি নিয়ে এতটা হৈ চৈ হয় যা অন্য কোন খেলা নিয়েই হয়না। কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে রাশিয়া বিশ্বকাপ নিয়ে। এর সাথে আবার যোগ হয়েছে পবিত্র ঈদ উল ফিতর। দুই উৎসবকে একসাথে করে এবার আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল। ঈদের দিন কয়েক আগে তিন সহকর্মী নিয়ে ক্রেতা চাহিদা পূরণ করছেন রাজু আহমেদ। ক্যাশ সামলাচ্ছেন আরেকজন। একে তো জ্যৈষ্ঠের আমপাকা রোদ, প্রচন্ড গরম; তার ওপর ক্রেতাদের চাপ দুয়ের যোগফলে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে খানিক বিরক্তই হলেন রাজু আহমেদ। উল্লিখিত বর্ণনা গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে পতাকার পসরা সাজিয়ে বসা এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। বিশ্বকাপ মৌসুম ঘিরে আগে থেকেই পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন নোয়াখালী থেকে আসা রাজু। পতাকার আকাশচুম্বী চাহিদায় সুফলও তুলছেন দুহাতে! নরসিংদী থেকে কাপড় কিনে এনে নিজস্ব কারখানায় পতাকা তৈরি করছি। শুরুতে পাইকারি বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাইকারির পাশাপাশি এখন খুচরা বিক্রি শুরু করেছি’, জানান রাজু আহমেদ। বিভিন্ন সাইজের পতাকার স্তুপে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। রাজু জানালেন, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগালের পতাকার চহিদাও আছে। বিশ্বকাপ খেলা প্রতিটি দেশের পতাকাই তৈরি করা আছে। ইংল্যান্ড, নাইজেরিয়ার পতাকাও দু-একটা বিক্রি হচ্ছে, জানালেন দোকানিরা। ৮০ টাকা হতে শুরু; সাইজের ওপর নির্ভর করে পতাকার মূল্য কয়েক হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকছে। দোকানিরা জানালেন, বড় সাইজের পতাকার অর্ডার খুব কম হয়। এবার কয়েকটা ৫০ ফুট লম্বা পতাকার অর্ডার পেয়েছেন। সামনে আরো পাবে বলে আশা করছেন তারা।
পতাকার মতো জার্সির দোকানেও জায়ান্ট সেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। গুলিস্তান পাতাল সড়কের মুখ থেকে ইম্পেরিয়াল হোটেল পর্যন্ত ফুটপাতে বিশ্বকাপে ম্লান হয়ে গেছে ঈদের বাজার! ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা জানালেন, এখনো সেভাবে বেচা-বিক্রি শুরু হয়নি। অন্যান্য বছর রোজা শুরুর পর থেকেই ঈদের বেচা-কেনার চাপ বাড়ত। এবার রোজা প্রায় অর্ধেক চলে যাচ্ছে, বেচা-কেনা সেভাবে কিন্তু লাগেনি’, বলেন ফুটপাতের ব্যবসায়ী লিটন মিয়া। বিশ্বকাপ ঘিরে জার্সি-পতাকা বিক্রির ধুম লেগেছে। এটা কি আপনাদের ব্যবসা মন্দার একটা কারণ? জবাবে ওই ব্যবসায়ী বললেন, ‘আমাদের ব্যবসার মূল ক্রেতা কিন্তু পথচারীরা। চলতি পথে হাতের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য দেখেই কিন্তু কিনে নিয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ মানুষ। নির্দিষ্টভাবে আমাদের এ পণ্য কিনতে আসা মানুষের সংখ্যা কম। পতাকা ও জার্সিও কিন্তু সামনে পড়ছে বলেই কিনছে অনেকে। তাই আমাদের ব্যবসায় বিশ্বকাপের কিছুটা প্রভাব তো থাকছেই।’ কেবল ফুটপাতে নয়, হকি স্টেডিয়াম ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ক্রীড়াপণ্য বিক্রির দোকানদাররাও জানালেন, এখনো সেভাবে জমেনি ঈদের বাজার। এ অবস্থার মাঝেই অনেক দোকানি বিশ্বকাপ খেলা জনপ্রিয় দেশগুলোর উন্নতমানের জার্সি চীন ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করেছেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর স্টাইল স্পোর্টসের স্বত্বাধিকারী আমজাদ হোসেন মজনু বলেন, ‘বাজারে উন্নতমানের জার্সি সংকট আছে। এ কারণে আমি থাইল্যান্ডের পাশাপাশি চীনের কিছু জার্সি তুলেছি। আমাদের বেচা-কেনা সেভাবে শুরু হয়নি। এখন পর্যন্ত আমাদের তুলনায় ফুটপাতের জার্সি বিক্রেতারা ভালো ব্যবসা করছেন।’ যোগ করেন, ‘ঈদের বাজারে ক্রীড়াপণ্যের চাহিদা থাকে বরাবরই। এবার তেমন চাহিদা লক্ষ করা যাচ্ছে না। বিশ্বকাপ উন্মাদনা দোকানের চেয়ে ফুটপাতেই বেশি। আমার অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিশ্বকাপ শুরুর পরই দৃশ্যটা বদলে যাবে। এর রেশ থাকবে আগামী কয়েক মাস। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজিত হবে। চাহিদা বাড়বে জার্সি, বলসহ অন্যান্য ক্রীড়াপণ্যের।’ বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে বরাবরের মতো এবারও সাজসাজ রব বাংলাদেশে। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানানোর অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে জার্সি। দোকানিরাও ফুটবলপ্রেমীদের চাহিদা মেটাতে জার্সির পসরা সাজিয়ে বসেছে।
রাশিয়া বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া বিভিন্ন দেশের জার্সি নিয়ে দোকানিরা পুরোদমে তৈরি। ফুটপাত থেকে শুরু করে নামিদামি বিপণিবিতানের দোকানগুলোতেও শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন দলের জার্সি; চলছে বেচাকেনাও। তবে সব দলের জার্সি থাকলেও মূলত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জার্সি কেনার ধুম পড়েছে। রাজধানীতে খেলাধুলার সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় বাজার গুলিস্তানের মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের দোকানিরা জানান, পুরো বছর তাদের বেচাকেনা চললেও বিশ্বকাপ এলে চাহিদা বাড়ে বিভিন্ন দলের জার্সির। তারা জানালেন, মানভেদে জার্সির দামের হেরফের রয়েছে, তবে ৩০০ থেকে হাজারের মধ্যেই মিলছে প্রিয় দলের জার্সি। স্টেডিয়ামে ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলাধুলার সরঞ্জামের ব্যবসা করে আসা ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক রাসেল বলেন, বাজারে তিন মানের জার্সি বিক্রি হয়। লোকাল, চায়না ও থাইল্যান্ডের। দেশে তৈরি লোকাল জার্সির দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। চীনে তৈরি একটু ভালো মানের জার্সির দামও কিছুটা বেশি ৫০০ টাকা।
সবচেয়ে ভালো মানের জার্সি আসে থাইল্যান্ড থেকে, যার প্রতিটির দাম ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এবার প্রথম রোজা থেকেই জার্সি বিক্রি শুরু হয়েছে, এখনও সেভাবে জমে না উঠলেও বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসবে বিক্রিও তত বাড়বে বলে আশাবাদী রাসেল। সব দলের জার্সি বাজারে থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সি। সিটিজেন স্পোর্টস ফেয়ারের কর্মচারী মিনহাজ জানান, সবচেয়ে বেশি চলছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপরই চাহিদা রয়েছে জার্মানি, স্পেন ও পর্তুগালের জার্সির। তিনি বলেন, ‘আমরা থাইল্যান্ড থেকে জার্সি আমদানি করি। দেশে পাওয়া যায় এমন সবচেয়ে ভালো মানের জার্সি এটাই, দাম ৯০০ থেকে হাজারের মধ্যে। আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে বড় বড় শপিংমলে আড়াই-তিন হাজার টাকায় এই জার্সি বিক্রি হয়। তবে যারা জার্সি চেনে তারা এখান থেকেই নেয়।’ খাদেমুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘বিশ্বকাপের আগে প্রিয় দলের জার্সি কিনব না, সেটা হতেই পারে না। এখানে জার্সির দাম সাধ্যের মধ্যে, গুণগত মানও ভালো আর দরদাম করে কেনা যাচ্ছে।’ পটুয়াখালীর কাপড় ব্যবসায়ী মুবিন আলী সারা বছর কাপড় বিক্রি করলেও বিশ্বকাপের সময় চাহিদার কথা ভেবে স্টেডিয়াম মার্কেটে জার্সি কিনতে এসেছেন। তাদের সবারই টার্গেট ভাল ব্যবসা করা।
অন্য পরিচয়ে থাকবে বাংলাদেশ
অনেকের কাছেই শিরোনামটি হতচকিত হওয়ার মতোই। রাশিয়ায় বিশ্বকাপে বাংলাদেশ! চমক তো বটেই। চমকে যাওয়ার মতোই খবর। কিন্তু কীভাবে? এবার ফিফা বিশ্বকাপে মেসিদের জ্যাকেটে চেপে রাশিয়া গেছে বাংলাদেশ।   জার্মানি, স্পেন, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের একাধিক দেশের কিট স্পন্সর একটি বেসরকারি সংস্থা। সেই সংস্থা বাংলাদেশ থেকে তৈরি করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, স্পেন, জার্মানি দলের অফিসিয়াল জ্যাকেট। এই দেশগুলির ফুটবলারদের গায়ে যে জ্যাকেট থাকবে সেটি রাশিয়া থেকে অনেক দূরের দেশ বাংলাদেশে তৈরি। বাংলাদেশের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ১৯৭। ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে না পারলেও সব ফেভারিট দলের খেলোয়াড়দের গায়ে থাকছে বাংলাদেশের তৈরি জ্যাকেট।
এসব জ্যাকেট পরেই ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে বিশ্বের সেরা সেরা তারকাদের। যার গায়ে লেখা থাকবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। চট্টগ্রামে অবস্থিত কর্নফুলি শু ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি কোম্পানি তৈরি হয়েছে জ্যাকেটগুলি। ফুটবল বিশ্বকাপে এটাই বড় প্রাপ্তি বাংলাদেশের। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয়েছিল এই জ্যাকেট তৈরির কাজ। কাজ শেষ হয় নভেম্বরে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংস্থার হাতে পৌঁছে যায় সব জ্যাকেট। সেখান থেকে চলে যায় বিভিন্ন দলের কাছে। সবার জ্যাকেটই আলাদা দেখতে। আর্জেন্টিনার জ্যাকেটে রয়েছে দুইটি নক্ষত্রচিহ্ন।
কারণ দুইবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মেসির দেশ। এ বার মেসির হাত ধরে সেই লক্ষ্যে নামবে নীল-সাদা ব্রিগেড। এটাই হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তার গায়েও উঠল বাংলাদেশের তৈরি জ্যাকেট। আবার জার্মানি যেহেতু চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে তাই তাদের জ্যাকেটে রয়েছে চারটি নক্ষত্রচিহ্ন। বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের জন্য জ্যাকেট তৈরি করতে পেরে খুশি বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে না থেকেও থাকবে মেসি-মুলারদের মতো তারকাদের সঙ্গে একই মঞ্চে থাকবে বাংলাদেশ। এটা দেশের জন্য গর্বের। যে শ্রমিকরা দিন-রাত পরিশ্রম করে এই জ্যাকেট তৈরি করেছেন, তারা যখন দেখবেন মেসিদের গায়ে তাদেরেই তৈরি জ্যাকেট তখন তা দেখে কার না গর্বে বুক ভরে উঠবে। মাঠের বাইরেও তাই বাংলাদেশের প্রতিনিধি থাকবে ঠিকই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ